তিনদিনের ঢাকা সফরের শেষ দিনে ব্যস্ত সময় কাটিয়েছেন দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পল কাপুর। গতকাল বিএনপি ও জামায়াতের প্রতিনিধিদলের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টার সঙ্গে আলাদা বৈঠক করেছেন মার্কিন মন্ত্রী। এসব বৈঠক শেষে মার্কিন মন্ত্রী গণমাধ্যমের মুুখোমুখি হননি। তবে বিএনপি ও জামায়াতের তরফ থেকে আলোচনার বিষয় নিয়ে গণমাধ্যমকে অবহিত করা হয়। বিএনপি’র প্রতিনিধিদলের প্রধান জানিয়েছেন, বৈঠকে মূলত কূটনৈতিক, বৈদেশিক এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক এই তিন ইস্যুতে আলোচনা হয়েছে।
ওদিকে জামায়াতের প্রতিনিধিদলের প্রধান জানিয়েছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পাদিত বাণিজ্যচুক্তি পর্যালোচনা করে দেখার পাশাপাশি বাংলাদেশে বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানানো হয়েছে। গতকাল সকাল ১১টায় বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খানের নেতৃত্বে ৫ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল গুলশানে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের বাসভবনে যান। প্রায় এক ঘণ্টাব্যাপী বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিনিধিদলে অন্য সদস্য ছিলেন- ব্যারিস্টার নওশাদ জমির, ডা. মাহবুবুর রহমান, নায়েবা ইউসুফ, ঢাকা জেলা বিএনপি সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট নিপুণ রায় চৌধুরী।
বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের মঈন খান বলেন, বৈঠকে মূলত কূটনৈতিক, বৈদেশিক এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক এই তিন ইস্যুতে আলোচনা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের একজন অত্যন্ত শুভাকাঙ্ক্ষী রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের বিভিন্নভাবে অতীতে সহযোগিতা করেছে। আজকে নতুন সরকার এসেছে, কাজেই তারা স্বাভাবিকভাবেই এদেশে আসবে, বাংলাদেশে কী হচ্ছে, আমাদের নীতিমালাগুলো কী, আমাদের ভবিষ্যৎ যে কর্মপন্থা- সেগুলো কী এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আমাদের যে পারস্পরিক সম্পর্ক, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের যে সম্পর্ক- সেসব বিষয় নিয়ে তারা সার্বিক আলোচনায় অংশগ্রহণ করার জন্যই এ দেশে এসেছেন।
আজকে আমরা যে বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করেছি- সেগুলো মূলত দু’টি দেশের জনগণের মধ্যে পারস্পরিক যে সম্পর্ক, সেই সম্পর্কের বিষয়গুলো এবং সরকারের যে নীতিমালার বিষয়গুলো এবং আজকের বিশ্বে বিভিন্ন ধরনের যে ঘটনা প্রবাহ, সে সমস্ত সার্বিক বিষয় নিয়ে আমাদের আলোচনা হয়েছে।
এক প্রশ্নের জবাবে মঈন খান বলেন, বিরোধী দলের বিষয় নিয়ে সরাসরি আমাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়নি। সেটা হয়তো তারা বিরোধী দলের সঙ্গে করে থাকতে পারে। সেটা আমাদের বিবেচ্য বিষয় নয়। আমাদের সঙ্গে বিবেচ্য বিষয় হচ্ছে যে, আমাদের যে ডিপ্লোম্যাটিক রিলেশন সেটা, দ্বিতীয়ত আমাদের যে বৈদেশিক সম্পর্ক সেটা এবং তৃতীয়ত আমাদের সঙ্গে তাদের যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক সেটা- এই তিনটি বিষয় আমাদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎ: এদিকে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন পল কাপুর। তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এই সৌজন্য সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়। সাক্ষাৎকালে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার বিদ্যমান দ্বিপাক্ষীয় সম্পর্ক, আঞ্চলিক সহযোগিতা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি, উন্নয়ন অংশীদারিত্ব এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয় বলে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং থেকে জানানো হয়।
যুক্তরাষ্ট্রকে বাংলাদেশে বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জামায়াতের: প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে বৈঠক করেন ঢাকা সফররত যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পল কাপুর। বৈঠকে জামায়াতের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে বাংলাদেশে বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানানো হয়। সেইসঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পাদিত বাণিজ্যচুক্তি পর্যালোচনা করে দেখার কথাও জানান জামায়াত নেতারা।
বৃহস্পতিবার সকালে পল কাপুরের সঙ্গে আলোচনা শেষে নায়েবে আমীর ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের সাংবাদিকদের বলেন, পল কাপুরের সঙ্গে বেশ কিছু বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এই মুহূর্তে রাজনৈতিক অবস্থান সহায়ক রয়েছে। যা বিনিয়োগের জন্য ইতিবাচক। জামায়াত নেতা তাহের আরও জানান, সংসদে সরকারদলীয় ও বিরোধীদলীয় দলের অংশগ্রহণ নিয়ে জানতে চেয়েছেন পল কাপুর। এ বিষয়ে জামায়াত বলেছে, সংসদে দলটি গতিশীল ভূমিকা রাখতে চায়। জনগণের স্বার্থ রক্ষা হয় এমন বিষয়ে জামায়াত সংসদে কথা বলবে। এ ছাড়া ইতিবাচক সব বিষয়ে সরকারকে সহায়তা করবে।
সকাল ৯টার দিকে ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেনের বাসায় পল কাপুরের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামী প্রতিনিধিদল সৌজন্য সাক্ষাৎ করে। বিরোধী দল বা জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে ডেপুটি স্পিকার দেয়া হবে কিনা, এ বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। জামায়াত বিষয়টিকে ইতিবাচক বলেছে। পল কাপুরের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর আলোচনায় আরও উপস্থিত ছিলেন- দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য সাইফুল আলম খান এবং জামায়াত আমীরের পররাষ্ট্র বিষয়ক বিশেষ উপদেষ্টা মীর আহমেদ বিন কাসেম।
জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার কবরে পল কাপুরের শ্রদ্ধা: এদিকে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কবরে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পল কাপুর। বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর জিয়া উদ্যানে জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার সমাধিস্থলে যান পল কাপুর। সঙ্গে ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন।
জিয়াউর রহমানের সমাধিস্থলে সংস্কার কাজ চলায় তারা কবরের গেটের সামনে পুষ্পস্তবক অপর্ণ করেন এবং কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন।
