বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় চার লাখ শিশু ও কিশোর ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছে। বাংলাদেশে শিশু ক্যান্সারের প্রকৃত সংখ্যা জানা না গেলেও প্রতিবছর হাজার হাজার শিশু নতুন করে ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছে। উন্নত চিকিৎসাব্যবস্থা ও সময়মতো রোগ শনাক্ত করা সম্ভব হলে অধিকাংশ শিশুকেই সুস্থ করে তোলা সম্ভব। কিন্তু নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার সুযোগ সীমিত হওয়ায় অনেক শিশুই সময়মতো প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পায় না। তাই সচেতনতাই পারে বাঁচাতে একটি শিশুর জীবন। শনিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে শিশু ক্যান্সার সচেতনতা মাস উপলক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ল বক্তৃতারা এসব কথা বলেন।
পেডিয়াট্রিক হেমাটোলজি এন্ড অনকোলজি সোসাইটি অব বাংলাদেশের মেডিকেল ইউনিভাসিটির পেডিয়াট্রিক হেমাটোলজি এন্ড অনকোলজি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান ও পেডিয়াট্রিক হেমাটোলজি এন্ড অনকোলজি সোসাইটি অব বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট
অধ্যাপক ডা: রফিকুল ইসলামের সভাপতিত্বে সংবাদ সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভাসিটির সাবেক প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর সভাপতি অধ্যাপক ডা: এম.এ মান্নান। এছাড়া সঞ্চালনা ও মূল প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন পেডিয়াট্রিক হেমাটোলজি এন্ড অনকোলজি সোসাইটি অব বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক ডা: চৌধুরী সামছুল হক কিবরীয়া।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে শিশু ক্যান্সারের প্রকৃত সংখ্যা এখনো সম্পূর্ণভাবে জানা যায় না। কারণ দেশে এখনো একটি পূর্ণাঙ্গ জাতীয় শিশু ক্যান্সার নিবন্ধন ব্যবস্থা নেই। বিভিন্ন গবেষণা ও হিসাব অনুযায়ী, প্রতিবছর হাজার হাজার শিশু নতুন করে ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছে। কিন্তু অনেক শিশুর রোগ সময়মতো শনাক্ত হয় না এবং অনেকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসার আওতায়ও আসতে পারে না।
তিনি আরও বলেন, দেরিতে রোগ শনাক্ত হওয়া, চিকিৎসার উচ্চ ব্যয়, চিকিৎসাকেন্দ্রে পৌঁছানোর অসুবিধা, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও সহায়ক চিকিৎসার সীমাবদ্ধতা এবং চিকিৎসা অসম্পূর্ণ রেখে দেওয়া-এসব বাংলাদেশের শিশু ক্যান্সার চিকিৎসার বড় চ্যালেঞ্জ। তবে বাংলাদেশে শিশু ক্যান্সারের চিকিৎসাসেবা ধীরে ধীরে বিস্তৃত হচ্ছে। ঢাকায় বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতাল এবং বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে শিশু ক্যান্সার ও রক্তরোগের চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে।
ঢাকার বাইরেও চট্টগ্রাম, রংপুর ও খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শিশু ক্যান্সার চিকিৎসা ও পরামর্শের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এর ফলে রাজধানীকেন্দ্রিক চিকিৎসার ওপর নির্ভরতা ধীরে ধীরে কমানোর সুযোগ তৈরি হচ্ছে এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের শিশুরা চিকিৎসার আওতায় আসতে পারছে।
শিশু ক্যান্সার সচেতনতা মাসের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, এই মাসের মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষ জানতে পারেন-শিশু ক্যান্সার মানেই মৃত্যু নয়।দীর্ঘদিনের জ্বর, অস্বাভাবিক ফ্যাকাশে ভাব, শরীরে অকারণ গুটি বা পেট ফুলে যাওয়া, অস্বাভাবিক রক্তপাত, হাড়ে দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা, চোখের অস্বাভাবিক পরিবর্তন, অকারণে ওজন কমে যাওয়া বা শিশুর আচরণ ও শারীরিক অবস্থায় অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। সচেতনতা বাড়লে বাবা-মা উপসর্গকে সাধারণ অসুস্থতা ভেবে দীর্ঘদিন অপেক্ষা না করে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যেতে পারবেন। ফলে রোগ দ্রুত শনাক্ত হবে, দ্রুত চিকিৎসা শুরু হবে এবং সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে।
এই সচেতনতা চিকিৎসকদের মধ্যেও শিশু ক্যান্সারের প্রাথমিক লক্ষণ সম্পর্কে সন্দেহ ও দ্রুত রোগ নির্ণয়ের প্রবণতা বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে এটি সমাজকে আক্রান্ত পরিবারের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে, চিকিৎসার ব্যয় ও মানসিক চাপ মোকাবিলায় তাদের পাশে দাঁড়াতে এবং শিশুদের চিকিৎসা অসম্পূর্ণ রেখে দেওয়া কমাতে সাহায্য করতে পারে।বাংলাদেশে তাই এই মাসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হওয়া উচিত-দেশব্যাপী শিশু ক্যান্সারের তথ্য সংরক্ষণ ও নিবন্ধন ব্যবস্থা গড়ে তোলা, চিকিৎসার সুযোগ আরও বিস্তৃত করা এবং প্রতিটি শিশুর জন্য সাশ্রয়ী ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করা। আমাদের মনে রাখতে হবে- শিশু ক্যান্সার মানেই মৃত্যু নয়।
সময়ে রোগ শনাক্ত হলে এবং যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে অনেক শিশুই সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে পারে। তারা আবার স্কুলে যেতে পারে, খেলতে পারে, স্বপ্ন দেখতে পারে এবং ভবিষ্যতে দেশের জন্য অবদান রাখতে পারে।
