কানাডার ইউরোপমুখী ঝুঁকিপূর্ণ অভিযান

ওয়াশিংটন পোস্টের মতামত

কানাডার ইউরোপমুখী ঝুঁকিপূর্ণ অভিযান

ফন্ট সাইজ:

কানাডার ৫১তম মার্কিন অঙ্গরাজ্য হওয়ার কোনো আগ্রহ নেই, এটি স্বাভাবিক। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) অনানুষ্ঠানিক ২৮তম সদস্য হওয়ার চেষ্টা করাও দেশটির জন্য হঠকারী সিদ্ধান্ত হতে পারে।

বুধবার ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লেয়েন ব্যাপক আনুষ্ঠানিকতার সঙ্গে কানাডাকে ইইউর প্রথম ‘সহযোগী সদস্য’ হওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। এর মাধ্যমে উৎপাদন, প্রযুক্তি, নিরাপত্তা ও জ্বালানি খাতকে সমন্বয়ের মাধ্যমে কানাডাকে ওয়াশিংটনের বদলে ব্রাসেলসের দিকে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। আগামী মাসে অনুষ্ঠেয় এক শীর্ষ সম্মেলনে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা ও সমঝোতা হওয়ার কথা রয়েছে।

কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ‘মধ্যম শক্তিগুলোকে’ একজোট হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি অসন্তোষ থেকে কার্নি উত্তর আমেরিকার এমন একটি বাণিজ্যিক জোট থেকে দূরত্ব বাড়াচ্ছেন, যা অঞ্চলটির জন্য বিপুল অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি বয়ে এনেছে। এই বিচ্ছিন্নতার ফলে কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকো তিন দেশের জনগণই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

ইইউ নিজেদের যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় আরও বন্ধুত্বপূর্ণ বিকল্প হিসেবে তুলে ধরছে। তবে মুক্ত বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও ইইউর সম্পর্ক বেশ জটিল। জোটের অভ্যন্তরীণ একক বাজার ২৭ সদস্যদেশকে সুবিধা দেয় এবং পণ্য পরিবহন ও বাণিজ্যকে সহজ করে। কিন্তু জোটের বাইরের দেশগুলোর ক্ষেত্রে ইইউর মধ্যে সংরক্ষণবাদী প্রবণতা রয়েছে। বাণিজ্যে বিভিন্ন বাধা আরোপের পাশাপাশি সদস্যদেশগুলোর বাণিজ্য চুক্তিও ব্রাসেলসের মাধ্যমে আলোচনা করতে হয়।

কানাডা কি ভেবে দেখেছে, জাপান বা অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে তার সম্পর্কের ভবিষ্যৎ যদি আটলান্টিক মহাসাগরের ওপারে বসে থাকা আমলাদের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে পরিস্থিতি কী দাঁড়াবে? ইইউতে কানাডার মনোনীত রাষ্ট্রদূত জোনাথন উইলকিনসন বলেছেন, সার্বভৌমত্ব বিসর্জন দিতে হয় এমন কোনো চুক্তিতে কানাডা সম্মত হবে না। তবে জোটে যোগদানের সঙ্গে সবসময়ই কিছু মূল্য দিতে হয়।

ফন ডার লেয়েন বুধবার যে ‘প্রযুক্তি জোটের’ প্রস্তাব দিয়েছেন, তার অর্থ কি কানাডাকে ইইউর কঠোর জেনারেল ডেটা প্রোটেকশন রেগুলেশন বা জিডিপিআর গ্রহণ করতে হবে? কিংবা ডিজিটাল সার্ভিসেস ট্যাক্স চালু করতে হবে? দায়িত্ব নেওয়ার তিন মাস পরই কার্নি এমন একটি কর আরোপের পরিকল্পনা স্থগিত করেছিলেন।

গত মাসে আইসল্যান্ডের ভোটাররা ইইউতে যোগদানের বিষয়ে আলোচনা শুরু করতে সরকারের উদ্যোগের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। এর প্রধান উদ্বেগের একটি ছিল, ইউরোজোনভুক্ত দেশগুলোর মাছ ধরার কোটা আইসল্যান্ডের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হতে পারে। দেশটির রপ্তানি আয়ের প্রায় ৪০ শতাংশ আসে এই খাত থেকে।

ইইউ নিজেকে একটি ‘নিয়ন্ত্রক পরাশক্তি’ হিসেবে বিবেচনা করে। জননীতির প্রায় কোনো ক্ষেত্রই নেই, যেখানে জোটটি কঠোর বিধিনিষেধ আরোপের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে না। সমালোচকদের মতে, এর ফলে প্রায়ই জাতীয় সার্বভৌমত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ ধরনের প্রবণতার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াও দেখা গেছে, যার অন্যতম উদাহরণ ২০১৬ সালের ব্রেক্সিট গণভোট।

কার্নির সঙ্গে ফন ডার লেয়েনের ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার আগ্রহ দেখিয়ে দেয়, ট্রাম্প কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহ্যগত মিত্রদের দূরে সরিয়ে দিয়েছেন। তবে সময়ের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্কের তিক্ততা কমে আসতে পারে। এ ক্ষেত্রে কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কেও মাত্র দুই বছরের কিছু বেশি সময়ের মধ্যে পরিবর্তনের সুযোগ রয়েছে।

২০২৯ সালের জানুয়ারিতে নতুন মার্কিন প্রেসিডেন্ট দায়িত্ব নেবেন। ততদিনে পাল্টাপাল্টি শুল্ক আরোপের ফলে যে ক্ষতিকর প্রভাব তৈরি হচ্ছে, তা অব্যাহত থাকলে দুই দেশের সীমান্তের উভয় পাশেই আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে। তবে ততদিনে কানাডা হয়তো ব্রাসেলসের আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আরও গভীরভাবে আটকে যেতে পারে।