প্রায় এক দশক ধরে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের একের পর এক উদ্যোগ ব্যর্থ হওয়ার পর এই সংকট সমাধানে আবারও আঞ্চলিক কূটনীতির দিকে তাকিয়ে আছে বাংলাদেশ। চলতি মাসে ঢাকা জানিয়েছে, তারা চীন ও মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনা করতে চায়।
এনিয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির জোর দিয়ে বলেছেন, ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গার বাস্তুচ্যুতির অবসান ঘটাতে শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক সমাধানই প্রয়োজন। বাংলাদেশ বরাবরই বলে আসছে, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন হতে হবে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই।
এক্ষেত্রে চীন একটি স্বাভাবিক অংশীদার। বাংলাদেশ ও মিয়ানমার- উভয় দেশের সঙ্গেই চীনের শক্তিশালী সম্পর্ক রয়েছে। দুই দেশেই চীনের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক স্বার্থ রয়েছে এবং বঙ্গোপসাগর ঘিরে স্থিতিশীলতার প্রতিও বেইজিংয়ের সরাসরি আগ্রহ রয়েছে।
রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে কূটনৈতিক তৎপরতাতেও চীন বহু বছর ধরে যুক্ত। ২০১৯ সালে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সঙ্গে মিলে চীন একটি ত্রিপক্ষীয় ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সহায়তা করেছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন সহজ করা এবং রাখাইন রাজ্যের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সহায়তা করা।
ফলে নতুন করে শুরু হওয়া আলোচনাকে শুধু একটি মানবিক বোঝা হিসেবে না দেখে এমন একটি আঞ্চলিক সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ তৈরি হয়েছে, যেখানে চীনের কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ ক্রমেই এক জায়গায় এসে মিলিত হচ্ছে। আরও স্থিতিশীল রাখাইন রাজ্য বিভিন্নভাবে চীনের জন্য উপকারী হবে।
প্রথমত, অর্থনৈতিক দিক থেকে। আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থার উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনায় রাখাইন একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। বেইজিং ও নেপিদো চীন-মিয়ানমার ইকোনমিক করিডরের (সিএমইসি) গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলো এগিয়ে নেয়ার বিষয়ে একমত হয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে কিয়াউকফিউ গভীর সমুদ্রবন্দর। এ ছাড়া মিয়ানমারের উপকূল থেকে চীনের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনকারী তেল ও গ্যাসের পাইপলাইনগুলোও এ অঞ্চলকে যথেষ্ট কৌশলগত গুরুত্ব দিয়েছে।
গত জুনে মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট মিন অং হ্লাইং চীন সফরের সময় দুই সরকার আবারও এই করিডর ও অন্যান্য অবকাঠামো প্রকল্প এগিয়ে নেয়ার অঙ্গীকার করেছে।
ফলে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিতিশীলতা চীনের অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাই রোহিঙ্গাদের সম্পৃক্ত করে একটি অর্থবহ রাজনৈতিক সমঝোতা চীনের অর্থনৈতিক লক্ষ্যকে বাধাগ্রস্ত না করে বরং তা এগিয়ে নিতে পারে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য। বেইজিং ও ঢাকার সম্পর্ক গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে। এ বছর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরে অবকাঠামো, বিনিয়োগ, বন্দর, জ্বালানি ও বৃহত্তর অর্থনৈতিক যোগাযোগ নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
বাংলাদেশ ও চীন-মিয়ানমারকে যুক্ত করে একটি অর্থনৈতিক করিডর গড়ার বিষয়েও দুই দেশ আলোচনা করছে। চলতি মাসেও ঢাকা ও বেইজিংয়ের কর্মকর্তারা প্রস্তাবটি নিয়ে আবার আলোচনা করেছেন।
এখানেই রোহিঙ্গা সংকট সরাসরি অর্থনৈতিক ভূগোলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়।
বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও চীনকে যুক্ত করা একটি করিডর এমন একটি অঞ্চলের মধ্য দিয়ে যাবে, যার অর্থনৈতিক সম্ভাবনা নিরাপত্তাহীনতা ও রাজনৈতিক বিভক্তির কারণে বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
তাই রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান আঞ্চলিক উন্নয়ন থেকে আলাদা কোনো বিষয় নয়। বরং এটি গভীরতর আঞ্চলিক অর্থনৈতিক একীভূতকরণের ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাও রয়েছে। মানবিক সংকট ও অর্থনৈতিক উন্নয়নকে প্রায়ই আলাদা নীতিগত বিষয় হিসেবে দেখা হয়। বাস্তবে দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতি পুরো অঞ্চলের ওপর বড় ধরনের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যয় তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশ বিপুল চাপের মধ্যেও ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে আসছে। এর ফলে সরকারি সেবা, স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও পরিবেশের ওপর ব্যাপক চাপ পড়ছে।
চীন এর আগেও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের মধ্যকার সম্পর্ককে স্বীকৃতি দিয়েছে। শুধু সীমান্ত পার করে শরণার্থীদের ফিরিয়ে দিলেই প্রত্যাবাসন টেকসই হবে না। মানুষের প্রয়োজন জীবিকার সুযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, অবকাঠামো ও নিরাপত্তা যাতে প্রত্যাবাসনের পর তাদের সম্প্রদায়গুলো টিকে থাকতে পারে।
এক্ষেত্রে চীনের বিশেষ কিছু সক্ষমতা রয়েছে। মিয়ানমারের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ, বাংলাদেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং বড় আকারের অবকাঠামো ও উন্নয়ন বিনিয়োগের সক্ষমতা- এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে কাজে লাগাতে পারে এমন দেশের সংখ্যা খুবই কম। এর ফলে কেবল কূটনৈতিক চাপ বা মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল অন্য পক্ষগুলোর তুলনায় চীনের সামনে ভিন্ন ধরনের সম্ভাবনা রয়েছে।
চীনের আরেকটি সুবিধা হলো, তাদের প্রবেশাধিকার রয়েছে। নিষেধাজ্ঞা ও রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতার কারণে মিয়ানমারে পশ্চিমা দেশগুলোর সম্পৃক্ততা সীমিত হয়েছে। অন্যদিকে বেইজিং মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক বজায় রেখেছে এবং একই সময়ে বাংলাদেশের সঙ্গেও ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে কূটনৈতিক সাফল্য নিশ্চিত। মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে অনেক বেশি জটিল করে তুলেছে।
২০১৯ সালে যখন ত্রিপক্ষীয় ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল, তখনকার পরিস্থিতির তুলনায় এখন বাস্তবতা অনেক বেশি কঠিন।
বেইজিংয়ের জন্য সফলভাবে এ সংকটে যুক্ত হওয়া তাদের বৃহত্তর কূটনৈতিক লক্ষ্যকেও শক্তিশালী করতে পারে। চীন ক্রমবর্ধমানভাবে অর্থনৈতিক উন্নয়ন, আঞ্চলিক যোগাযোগ এবং রাজনৈতিক সংলাপকে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পরস্পর-সম্পূরক উপায় হিসেবে তুলে ধরছে। রোহিঙ্গা সংকট বাস্তবে এই মডেল কতটা কার্যকর হতে পারে, তা দেখানোর একটি সুযোগ তৈরি করেছে।
এমন একটি প্রক্রিয়া যদি ধীরে ধীরে স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসন, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন ও রাখাইনে বৃহত্তর স্থিতিশীলতার পরিবেশ তৈরি করতে পারে, তাহলে এর সুফল শুধু রোহিঙ্গাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না।
দীর্ঘদিন শরণার্থীদের আশ্রয় দেয়ার কারণে বাংলাদেশের ওপর যে চাপ তৈরি হয়েছে, তা কমবে।
মিয়ানমার তাদের অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি অঞ্চলে বৃহত্তর স্থিতিশীলতা পাবে। চীন আরও নিরাপদ অবকাঠামো, শক্তিশালী আঞ্চলিক যোগাযোগ এবং বাংলাদেশ ও মিয়ানমার- উভয় দেশের সঙ্গে গভীরতর অর্থনৈতিক সম্পর্ক থেকে লাভবান হবে। আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্প্রসারিত হতে পারে।
একই সঙ্গে বঙ্গোপসাগর এশিয়ার বাকি অংশের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে অর্থনৈতিকভাবে যুক্ত হতে পারে।
এর সঙ্গে নিরাপত্তাগত সুফলও রয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী শরণার্থী সংকট সাধারণত শুধু মানবিক শিবিরের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। দারিদ্র্য, শিক্ষার অভাব, মানবপাচার নেটওয়ার্ক, অনিয়মিত অভিবাসন এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীতে নিয়োগের মতো বিষয়গুলো ধীরে ধীরে বাস্তুচ্যুতিকে বৃহত্তর আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংকটে পরিণত করতে পারে। তাই এসব চাপ কমানো অঞ্চলের প্রতিটি বড় শক্তির স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
তবে এর অর্থ এই নয় যে কূটনীতি সহজ হবে।
রাখাইনের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি এখনও কঠিন এবং মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধের কারণে ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণেও বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। এসব সমস্যা কোনো একক দেশ সমাধান করতে পারবে না। তবে চীনের অবস্থান তাকে প্রয়োজনীয় পক্ষগুলোকে একটি প্রক্রিয়ার মধ্যে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের সুযোগ দেয় যে প্রক্রিয়ার লক্ষ্য হবে বাস্তবসম্মত ফলাফল অর্জন।
মূল বিষয় হলো, চীনের সম্পৃক্ততাকে মানবিক দায়িত্ব ও জাতীয় স্বার্থের মধ্যে যেকোনো একটি বেছে নেয়ার বিষয় হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই। এই দুই স্বার্থ একে অপরকে শক্তিশালী করতে পারে।
স্থিতিশীল রাখাইন চীনের অর্থনৈতিক স্বার্থকে এগিয়ে নেয়। আরও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় অংশীদারত্বকে শক্তিশালী করে। নিরাপদ আঞ্চলিক করিডর বাণিজ্যকে সহায়তা করে। বাস্তুচ্যুতি কমলে অস্থিতিশীলতাও কমে। আর সফল কূটনীতি চীনের বৃহত্তর প্রতিবেশে শান্তিপূর্ণ উন্নয়নে অবদান রাখার সক্ষমতাকে আরও বাড়ায়।
নয় বছর পর রোহিঙ্গা সংকটের জন্য বাস্তুচ্যুত পরিস্থিতি সামাল দেয়ার আরেকটি উদ্যোগের চেয়েও বেশি কিছু প্রয়োজন। প্রয়োজন এমন একটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো, যা একটি টেকসই সমাধানকে বাস্তবে সম্ভব করে তুলতে পারে। এ ধরনের কাঠামোতে অবদান রাখার জন্য প্রয়োজনীয় সম্পর্ক ও অর্থনৈতিক উপকরণের অনেকটাই চীনের হাতে রয়েছে।
বেইজিংয়ের জন্য রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে সহায়তা করা শুধু এশিয়ার দীর্ঘস্থায়ী মানবিক সংকটগুলোর একটি সমাধানে অবদান রাখা নয়। এর মাধ্যমে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, যোগাযোগব্যবস্থা ও উন্নয়ন-চীনের গুরুত্বপূর্ণ কিছু স্বার্থও এগিয়ে নেয়া সম্ভব হতে পারে।
ড. আজিম ইব্রাহিম ওয়াশিংটনভিত্তিক নিউ লাইনস ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড পলিসির বিশেষ উদ্যোগবিষয়ক পরিচালক।
