কিন্তু স্থানীয় আরাওয়াক জনগোষ্ঠীর জন্য এ ছিল এক অসম্ভব দায়িত্ব, কেননা জলের স্রোতের মধ্যে সামান্য স্বর্ণগুঁড়া ছাড়া ঐ অঞ্চলে স্বর্ণের কোনো উৎস ছিল না। ফলে, আরাওয়াকরা নিজেদের অঞ্চল ছেড়ে পালাতে থাকে, পলায়নরত অবস্থায় শিকারী কুকুর দিয়ে তাড়া করে তাদের ধরে আনা হতে থাকে, আর এভাবে ধৃত আরওয়াকদের হত্যা করা হতে থাকে।
এহেন নিপীড়নমূলক পরিস্থিতিতে সংঘবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে উঠতে বাধ্য। গড়েও উঠেছিল। কিন্তু ঘোড়ার শক্তিতে বলিয়ান তুলনামূলকভাবে উন্নত অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত কলম্বাসের স্পেনীয় সঙ্গীদের সাথে তারা পেরে ওঠেন নি, বরং দলে দলে তারা বন্দি হতে থাকেন, আর স্পেনীয় দখলদার বাহিনী এই ‘বন্দিদের ফাঁসি দিয়ে কিংবা পুড়িয়ে হত্যা করতে থাকে’। এমতাবস্থায়, স্পেনীয়দের হাতে নির্মমভাবে মৃত্যুবরণের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য, আরাওয়াকরা কাসাভা বিষপানে গণহারে আত্মহত্যা শুরু করে।
তাছাড়া, তাদের শিশুদের নির্মম হত্যাকাণ্ড থেকে বাঁচানোর জন্য নিজেরাই তাদের সহজভাবে হত্যা করতে শুরু করে। এভাবে, ‘হত্যা, আত্মহত্যা ও অঙ্গছেদের মাধ্যমে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের ভেতর দিয়ে, পরবর্তী দু’বছরের মধ্যে, আড়াই লক্ষ জনসংখ্যা অধ্যুষিত হাইতির অর্ধেক মানুষই মৃত্যুর মুখে পতিত হয়’।১৫
কলম্বাসের দল এক সময় অনুধাবন করে যে, ওই অঞ্চলে স্বর্ণের আর অবশিষ্ট নেই। তখন স্পেনীয়রা স্থানীয় আরাওয়াকদের ইতিমধ্যে দখলিকৃত জমিতে নির্মিত বড় বড় ইউরোপীয় খামারে শ্রমদাস হিসেবে নিয়োগ করতে থাকে, তাদের দিয়ে এত দীর্ঘ সময় ধরে এত দুঃসহ পরিশ্রমের কাজ করানো হতে থাকে যে, তারা হাজারে হাজারে মৃত্যু বরণ করতে থাকে। হাওয়ার্ড জিন লিখেছেন, হাইতিতে ‘১৫১৫ সালের দিকে মাত্র ৫০ হাজার আরাওয়াক বেঁচে ছিলেন, ১৫৫০ সালে মাত্র পাঁচশত, আর ১৬৫০ সালে সে অঞ্চলে কোনো আওয়াক বা তাদের বংশধরের অস্তিত্ব ছিল না।’ ইতিপূর্বে বাহামা ও হাইতি স্পেনের পূর্ণাঙ্গ উপনিবেশে পরিণত হয়েছিল।
কলম্বাসের নেতৃত্বে বাহামার উপনিবেশনযানের পর, গোটা ক্যারিবীয় অঞ্চল ও দক্ষিণ আমেরিকা জুড়ে স্পেনের উপনিবেশ প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়ায়, স্পেনের আগ্রাসী আক্রমণে এ অঞ্চলে ইতিপূর্বে বিকশিত তিন তিনটি উন্নত সভ্যতা- আজটেক, ইন্কা ও মায়া- নির্মমভাবে ধ্বংস হয়ে যায়।
স্পেনের হেরনেন কোর্তেজ (১৪৮৫-১৫৪৭) ৫০০ সৈন্যভর্তি একাধিক জাহাজ নিয়ে যখন, ১৫১৯ সালের এপ্রিল, আজটেকদের ভেরাক্রুজ অঞ্চলে- সমকালীন মেক্সিকোর একটি প্রদেশ- অবতরণ করে, আজটেক সভ্যতা তখন বিগত দু’শবছর ধরে বিকশিত হয়েছে। আপন রাজ্যে এই ‘স্পেনীয় দলটির অবতরণের সংবাদ পেয়ে আজটেক সম্রাট দ্বিতীয় মোকটেজুমা কোনো প্রতিরোধ গড়ে তোলেন নি- কোনো শত্রুতা গড়ে তোলার ইচ্ছেই তার ছিল না, বরং নানা উপহার সামগ্রীসহ দূত পাঠিয়ে এই স্পেনীয় দলটিকে সংবর্ধনা দিয়েছিলেন’।১৬ তারপর, এই কোর্তেজের দল আজটেক সম্রাটেরই আমন্ত্রণে তার সাম্রাজ্যের রাজধানী চতুর্দশ শতকে নির্মিত বিশাল ও সমৃদ্ধ টেনোকটিলান নগরীতে পৌঁছানোর পথে, আজটেকদের নিয়ন্ত্রিত চৌলুলা নামক একটি ধর্ম-নগরীতে, ‘আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কায়’ স্থানীয় জনগণের ওপর নিজেরাই এক ভয়াবহ ‘আগাম আক্রমণ’ শুরু করলে সংঘাতের সৃষ্টি হয়। বিনা উস্কানিতে পরিচালিত এই সংঘাতে, ইতিহাসবিদ বিলি ওয়েলম্যানের বর্ণনানুসারে, “কোর্তেজের বাহিনী স্থানীয়দের ওপর বর্বরোচিত আক্রমণ চালিয়ে তাদের পবিত্র মন্দিরগুলো গুঁড়িয়ে দেয়, পিরামিডসমূহ ধ্বংস করে ফেলে এবং নগরীর অভিজাতদের গ্রেপ্তার ও বন্দি করে। তাছাড়াও, হাজার হাজার স্থানীয় মানুষকে হত্যা করা হয়, চৌলুলা নগরী পুরো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় এবং নগরীর সমূহ ধন-সম্পদ লুণ্ঠিত হয়। সবশেষে, গুঁড়িয়ে দেয়া নগরীর সবচেয়ে বড় পিরামিডটির ধ্বংসস্তূপের ওপর খ্রীষ্টধর্মের প্রতীক একটি ক্রস স্থাপন করে এই বিজয়কে খ্রীষ্টধর্মের বিজয় হিসেবে ঘোষণা করে।”১৭
তারপর, অনেকগুলো স্বপ্রণোদিত প্রতারণামূলক যুদ্ধ-বিগ্রহের পথ বেয়ে, কোর্তেজ বাহিনী, পেড্রো দ্য আলভারডো নামক আরেকজন স্পেনীয় ভাগ্যান্বেষীর নেতৃত্বাধীন বাহিনীর সহায়তায়, ১৫২১ সালের আগস্টে, বর্তমান মেক্সিকোর বৃহদাংশসহ গুয়েতেমালা, হন্ডুরাস ও এল-সালভেদর রাষ্ট্রের বিভিন্ন অংশ নিয়ে গঠিত গোটা আজটেক সাম্রাজ্য দখল করে নিতে সমর্থ হয়। এইসব যুদ্ধে আজটেক সাম্রাজ্যের শিল্প, সংস্কৃতি, ভাস্কর্যসহ এক সমৃদ্ধ সভ্যতা ধ্বংস হয়, এই অঞ্চলের লক্ষ লক্ষ মানুষ নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হন ও তাদের ধনসম্পদ লুণ্ঠিত হয়। এই আজটেক সাম্রাজ্যের পতনের মধ্যদিয়েই গোটা দক্ষিণ আমেরিকায় স্পেনের উপনিবেশায়ন প্রক্রিয়া শুরু হয়, যা পরবর্তী তিনশ’ বছর পর্যন্ত টিকে থাকে।
আজটেকের পর, ‘কয়েক হাজার বছর ধরে বিকশিত মায়া সভ্যতার’ লীলাভূমি মেক্সিকো, গুয়েতেমালা, বেলিজ, হন্ডুরাস ও এল সালভেদর প্রত্যেকটির কিয়দাংশ জুড়ে বিস্তৃত অঞ্চলটি স্পেনীয় ভাগ্যান্বেষী নানা সশস্ত্র দলের প্রায় ৩০ বছর ব্যাপী অসংখ্য খণ্ড খণ্ড আক্রমণ, স্থানীয় জনগণের প্রতিরোধ যুদ্ধ, তাদের বিরুদ্ধে পরিচালিত হত্যাকাণ্ড ও লুণ্ঠন প্রক্রিয়ায় দুর্বল হয়ে, শেষ পর্যন্ত, ১৫৪৭ সালে, স্পেনের উপনিবেশে পরিণত হয়।
দক্ষিণ আমেরিকার এই বিস্তৃত অঞ্চলটি দখল করে উপনিবেশ তৈরির জন্য তিন দশক ধরে অনেক স্পেনীয় সশস্ত্র দল প্রয়াস চালালেও, ১৫২৭ সালে চারটি জাহাজ ভর্তি চারশ’ সৈন্য ও গোলাবারুদ নিয়ে আক্রমণ শুরু করে। শেষ পর্যন্ত, ১৫৪৭ সালে, ফ্রান্সিসকো ড্য মনটেজো (১৪৭৯-১৫৫৩), তার পুত্র কনিষ্ঠ মনটেজো ও কোর্তেজের পুরনো সঙ্গী পেড্রো দ্য আলভারাডো সম্মিলিতভাবে মায়া সভ্যতা সমৃদ্ধ এই বিস্তীর্ণ অঞ্চল দখল করতে সমর্থ হয়। তবে, আজটেকের মতো, মায়া সাম্রাজ্য দখলের প্রক্রিয়াতেও স্পেনীয়রা অতিথিপরায়ণ স্থানীয় শাসকদের সাথে চরম বিশ্বাসঘাতকতার পথ অবলম্বন করে। মায়া দখলের প্রক্রিয়ায় মনটেজোদের দৃষ্টি প্রথম থেকেই সাম্রাজ্যটির সর্ববৃহৎ ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রদেশ কুপুল, বিশেষত বড় স্থাপত্যর্ শিল্পের নানা নিদর্শন, বড় বড় পিরামিড ও বেশ কয়েকটি ধর্মীয় কেন্দ্র সমৃদ্ধ কুপুলের ঐশ্বর্যময় রাজধানী শহর ‘চিচেন হট্জার’ ওপর নিবন্ধ ছিল। মনটেজু বাহিনী অনেকগুলো আগ্রাসী অভিযানের পর, ১৫৩১ সালের শেষের দিকে, অনেকটা বিনা প্রতিরোধে কুপুলের চিচেন ইট্জা নগরীতে পৌঁছুতে সক্ষম হয় এবং কুপুলের প্রধান অধিকর্তা বদান্যতাবশত নির্দিষ্ট কিছু দিনের জন্য নগরীর নিকটবর্তী একটি অঞ্চলে অবস্থানের জন্য অনুমতিও প্রদান করেন।১৮ কিন্তু সেই নির্দিষ্ট সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পরও মনটেজোর বাহিনী নির্দিষ্ট স্থান ত্যাগ না করায় এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে প্রায়শই দুর্ব্যবহার করার কারণে, ঐ অঞ্চলে অবস্থানের ছয় মাস পর, স্থানীয় জনগোষ্ঠী তাদের ওপর আক্রমণ করলে, স্পেনীয়রা চিচেন ইট্জা নগরীর দিকে পিছু হটতে বাধ্য হয় এবং সেখানেও ফের সংঘাত বাধে। সেই সংঘর্ষের সুযোগ নিয়ে দ্বিতীয় মনটেজুর বাহিনী কুপুলের প্রধান অধিকর্তাকে, যিনি ইতিপূর্বে বদান্যতাবশত এই স্পেনীয়দের সাময়িকভাবে তার এলাকায় অবস্থানের সুযোগ দিয়েছিলেন, তাকে নির্মমভাবে হত্যা করে বিশ্বাসঘাতকতার চরম নিদর্শন প্রদর্শন করে।১৯ তারপর থেকে এমন অসংখ্য যুদ্ধ বিগ্রহে, নানা জয়-পরাজয়ের ভেতর দিয়ে মনটেজু বাহিনী, ১৫৪৭ সালে গোটা মায়া সাম্রাজ্য দখল করে নেয়। এই অঞ্চলে স্পেনের উপনিবেশায়ন প্রয়াসকে প্রতিহত করতে গিয়ে হাজার হাজার ‘স্থানীয় মানুষ হত্যাকাণ্ডের শিকার হন’, তাদের ততোধিক সংখ্যক আত্মীয়-পরিজন বাস্তুচ্যুত হয়ে পড়েন, অনেকে দাসত্ববরণ করতে বাধ্য হন এবং স্থানীয় জনসাধারণের একটি বিরাট অংশ স্পেনীয় আক্রমণকারীদের বয়ে আনা এক অজানা রোগ [গুটি বসন্ত] মহামারির আকার ধারণ করলে, তার অসহায় শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করেন’।২০
ওদিকে, ত্রয়োদশ শতাব্দীর শুরুতে বর্তমান পেরুর একটি অঞ্চলে নগর রাষ্ট্র হিসেবে ‘কাসকু রাজ্যের’ পত্তন থেকে শুরু করে, ষোড়শ শতাব্দীর তৃতীয় দশক পর্যন্ত সময়কালে দক্ষিণ আমেরিকার ইকুয়েডর, চিলি, বলিভিয়া, আর্জেন্টিনা ও কলাম্বিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে বিকশিত ইনকা সাম্রাজ্য ও তার ঐতিহাসিক সভ্যতা, ষোড়শ শতাব্দীর শুরু থেকে স্পেনের বিভিন্ন ভাগ্যান্বেষী সশস্ত্র দলের থেকে পরিচালিত অভিযান, বিশ্বাসঘাতকতাপূর্ণ আক্রমণ আর স্থানীয় রাজনৈতিক শক্তি ও জনগণের প্রতিরোধ যুদ্ধ ও পরাজয় প্রভৃতির মধ্যদিয়ে, শেষ পর্যন্ত, ১৫৩৩ সালের নভেম্বরে, স্পেনের উপনিবেশে পরিণত হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। ফ্রান্সিকো পিজারো (১৪৭৮-১৫৫১) নামক এক ভাগ্যান্বেষী স্পেনীয় অভিযাত্রী তৎকালে উন্নত কৃষিব্যবস্থা এবং নির্মাণ ও স্থাপত্যশৈলীতে সমৃদ্ধ সভ্যতাসহ এই ইনকা সাম্রাজ্য নিজেদের উপনিবেশে পরিণত করতে সবচেয়ে নির্ধারক ভূমিকা পালন করেন; তবে গোটা অঞ্চলটি স্পেনের বশীভূত হওয়ার জন্য, একদিকে ইনকা সাম্রাজ্যের নানা অঞ্চলে স্পেনীয়দের আরও অনেকগুলো প্রতিরোধ যুদ্ধ, অন্যদিকে আপন আপন আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য একাধিক স্পেনীয় বাহিনীর ভেতরকার সশস্ত্র যুদ্ধ মোকাবেলা করতে হয় এবং শেষ পর্যন্ত ১৫৭২ সালে স্পেনীয়দের হাতে ইনকা সাম্রাজ্য ও সভ্যতার পুরোপুরি পতন ঘটে।
উল্লেখ্য যে, ইনকা সাম্রাজ্য দখল করার ক্ষেত্রেও স্পেনীয় সশস্ত্র দলটি স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ভয়াবহ ধরনের প্রতারণা ও বিশ্বাসঘাতকতার ব্যবহার করেছে। পিজারো ও তার সশস্ত্র দলটি ইনকা সাম্রাজ্যের বিখ্যাত কাসকো নগরীর দিকে অগ্রসর হওয়ার পথে, ১৫২৩ সালের নভেম্বরে, খবর পায় যে, ইনকা সম্রাট আতাহুয়ালপা (১৫০২-১৫৩৩) নিকটবর্তী কাজামারকা নগরে অবস্থান করছেন। এমতাবস্থায়, সম্রাটের সাথে ‘সৌজন্য সাক্ষাতের’ জন্য, একজন দূত পাঠিয়ে, পিজারো ঐ নগরে প্রবেশ করার অনুমতি প্রার্থনার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।
পিজারোর দূত হেরনান্দো ড্য সোটো (১৫০০-১৫৪২), একটি তাজা ঘোড়ায় চড়ে, নানা উপহার সামগ্রীসহ ইনকা সম্রাটের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গিয়ে, নিজেদের ‘আসল’ ঈশ্বরের দূত হিসেবে দাবি করেন এবং পুরো দলটিকে কাজামারকা নগরে প্রবেশ করে সম্রাটের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার বিনীত অনুমতি প্রার্থনা করেন।
তথ্যসূত্র:
১৫. প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ৫
১৬. Billy Wellman, The Spanish Conquest of the Americas, 2023, p. 27
১৭. প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ২৯
১৮. প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ৫৯
১৯. প্রাগুক্ত
২০. প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ৭১
