মির্জা আব্বাস উদ্দিন আহমেদ। প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য। ঢাকা-৮ আসনের নির্বাচিত সংসদ সদস্যও। সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হাত ধরে রাজনীতিতে নেমে সব সাফল্যই পেয়েছেন তিনি। ওয়ার্ড কমিশনার থেকে উঠেছেন রাজনীতির চূড়ায়। অতীতের বিএনপি সরকারে সামলেছেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী, অবিভক্ত ঢাকার মেয়র, ভূমিমন্ত্রী, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রীর দায়িত্ব। সান্নিধ্য পেয়েছেন জিয়া পরিবারের তিন প্রজন্মের শীর্ষ নেতৃত্বের। তবে ৫০ বছরের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে একাধিকবার জেল-জুলুমের শিকার হওয়া এই রাজনীতিবিদের হঠাৎ অসুস্থতা এলোমেলো করে দিয়েছে তার সবকিছু।
একসময়ের রাজনীতির মাঠ দাপিয়ে বেড়ানো এই দাপুটে নেতার এখন চলাফেরা করতে হয় হুইলচেয়ারে করে। দাঁড়াতে হলে নিতে হয় অন্যের সাহায্য। গত ১১ই মার্চ ইফতারের পর নিজ বাসায় হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে পড়লে সঙ্গে সঙ্গে নেয়া হয় এভারকেয়ার হাসপাতালে। পরদিনই ওই হাসপাতালে নিউরো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সমন্বয়ে মেডিকেল টিম তার মস্তিষ্কে অস্ত্রোপচার করে। ১৫ই মার্চ উন্নত চিকিৎসার জন্য মির্জা আব্বাসকে এয়ার এম্বুলেন্সে করে নেয়া হয় সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে। সেখানে টানা এক মাসের চিকিৎসায় তিনি অনেকটাই সুস্থ হয়ে ওঠেন।
পরে চিকিৎসকদের পরামর্শে ১৪ই এপ্রিল তাকে ভর্তি করা হয় মালয়েশিয়ার প্রিন্স কোর্ট হাসপাতালে। সেখানে টানা সাড়ে চার মাস নেন ফিজিওথেরাপি। সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় দীর্ঘ সাড়ে পাঁচ মাস চিকিৎসা নেয়ার পর ২রা সেপ্টেম্বর তিনি দেশে ফিরে আসেন। পরদিনই ত্রয়োদশ সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে প্রথমবারের মতো অংশ নেন তিনি। দুই দশক পর সংসদে ফিরে দেন আবেগঘন বক্তব্য। মানুষের টানে চিকিৎসার মাঝপথেই ফিরে আসার বার্তা দেন। শুধু সংসদ নয়, মাঠের রাজনীতিতে ফিরতেও ব্যাকুল মির্জা আব্বাস। চিকিৎসা ফলোআপের জন্য তিনি ফের মালয়েশিয়া গেছেন। যাওয়ার আগে প্রতিদিন নিজ আসনের সাধারণ মানুষ ও তৃণমূল নেতাকর্মীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করছেন। তাদের নানা সমস্যার সমাধান দিয়েছেন।
সম্প্রতি জাতীয় সংসদ ভবনের নিজ কার্যালয়ে তিনি মানবজমিনের সঙ্গে কথা বলেন। এ সময় তার পাশে ছিলেন একজন চিকিৎসক। তার শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করছিলেন তিনি।
কেমন আছেন জিজ্ঞাসা করতেই হেসে মির্জা আব্বাস বলেন, আগের চেয়ে একটু ভালো। তবে বিদেশ থেকে দেশে চলে আসছি তাই বলে একেবারে ভালো হয়ে গেছি বিষয়টি তেমন নয়। সংসদের উপস্থিতির বিধি-বিধানের কারণে চিকিৎসার মাঝপথেই দেশে ফিরে আসতে হয়েছে। চিকিৎসকরা আমাকে ছাড়তে চায়নি। দেশে আসার পর বাংলাদেশের চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে আছি। প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী ওষুধপত্র খাচ্ছি, তাদের বাতলে দেয়া নিয়ম মেনে চলছি। প্রতিদিন থেরাপি নিতে হচ্ছে।
মাঠের রাজনীতিতে ফেরার বিষয়ে অবিভক্ত ঢাকার সাবেক এই মেয়র বলেন, মাছ যেমন পানিতে বসবাস করে আমিও তেমনি রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের সঙ্গে একসঙ্গে থাকতাম, একসঙ্গে চলাফেরা করতাম। মাঠের রাজনীতিতে ফিরতে মনটা ব্যাকুল হয়ে আছে। কিন্তু ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও শারীরিক অসুস্থতার কারণে মাঠে যেতে পারছি না। চরমভাবে মিস করছি তৃণমূলের নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষদের। তবে প্রতিদিনই আমার বাসায় নেতাকর্মীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। তাদের জন্য আমি এক থেকে দুই ঘণ্টা সময় রাখি। তারা প্রতিদিনই আসেন, রাজনৈতিক, সামাজিক ও পারিবারিক নানা সমস্যার কথা বলেন। এগুলোর সমাধান করার চেষ্টা করি। কোথাও ফোন করার প্রয়োজন হলে বলে দেই।
অসুস্থতার কারণে এলাকার উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ব্যাহত হচ্ছে কিনা- জবাবে মির্জা আব্বাস বলেন, ঢাকা-৮ আসনটি (মতিঝিল-শাহজাহানপুর, শাহবাগ, রমনা, পল্টন) বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ। এই আসনেই আন্দোলন-সংগ্রাম, মিছিল-মিটিং হয়, এই আসনেই প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র, সচিবালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বড় বড় হাসপাতাল। তবে আমার অসুস্থতার কারণে এই আসনে সেভাবে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড হচ্ছে না। প্রতিটি বিষয়ে আমার মতামত প্রয়োজন হয়। আমি চেষ্টা করছি সবকিছু চালিয়ে নেয়ার।
৫ই আগস্টের পর রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন কেমন দেখছেন- বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির এই সদস্য বলেন, খুব একটা পরিবর্তন দেখছি না। আগে আওয়ামী লীগ ছিল, এখন আওয়ামী লীগ নেই, পালিয়ে গেছে। এ ছাড়া, আর কোনো পরিবর্তন দেখছি না।
সম্প্রতি এক বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সতর্ক হয়ে চলাফেরা করার বার্তা দেয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপি’র বর্ষীয়ান এই নেতা বলেন, রাজনীতিবিদদের জন্য তো বাংলাদেশ শঙ্কামুক্ত দেশ নয়। এজন্য সব রাজনৈতিক নেতাদের সব সময় সতর্ক থাকতে হয়।
সরকারের ছয় মাসের মূল্যায়ন সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা বলেন, প্রধানমন্ত্রী এখনো সবাইকে পর্যবেক্ষণ করছেন। আমাদের রাজনৈতিক নেতাদের দেখছেন, আমলাদের দেখছেন। উনি খুব কেয়ারফুলি স্টেপ নিচ্ছেন। দেখা যাক সামনে কী হয়। তবে বিএনপি ক্ষমতায় এলো মাত্র ছয় মাস পেরিয়েছে। কিন্তু সব রাজনৈতিক দল আদা-জল খেয়ে নেমেছে, কাঠখড় পোড়াচ্ছে বিএনপিকে সরানোর জন্য। ক্ষমতায় আসার ছয় মাস যেতে না যেতেই আন্দোলন করতে হবে। আমি তো বিএনপি’র মতো আর কোনো রাজনৈতিক দল আছে তার প্রমাণ দেখছি না। ভালো-মন্দ যাই আছে বিএনপিই আছে। জিয়া পরিবারের সঙ্গে কাজ করার অনুভূতি জানিয়ে তিনি আরও বলেন, ভাবতেই ভালো লাগে আমি জিয়া পরিবারের তিন প্রজন্মের সঙ্গেই কাজ করেছি। সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, বেগম খালেদা জিয়া ও তার সুযোগ্য সন্তান তারেক রহমান। জিয়াউর রহমানের সময় ছিল একরকম ধারা, ম্যাডামের (বেগম খালেদা জিয়া) সময় ছিল একধারা আর তারেক রহমানের সময়কাল কেমন হবে- তা ভবিষ্যৎই বলে দেবে। তবে আমি বিশ্বাস করি- দু’জন দেশপ্রেমিকের সন্তান তারেক রহমান। উনাদের কাছ থেকে অনেক কিছু শিক্ষা পেয়েছেন তিনি।
