অদ্ভুত এক সমস্যায় ভুগছে বিশ্ববাসী। স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট সহজলভ্য হওয়ার পর প্রায় সকলের হাতেই রয়েছে ডিভাইস। আর এই ডিভাইসেই বুঁদ হয়েছে শিশু-যুবা-বৃদ্ধা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা তারা কাটাচ্ছে স্মার্টফোনের পর্দায় অর্থহীন স্ক্রল বা ডুমস্ক্রলিং করে।
তাই নাগরিকদের অতিরিক্ত অনলাইন কনটেন্টে আসক্ত হয়ে পড়া থেকে দূরে রাখা এবং পড়ার সংস্কৃতি আরও জোরদার করতে সিঙ্গাপুর সরকার চালু করেছে ‘রিডএসজি ক্যাম্পেইন’।
পাঁচ বছর মেয়াদি এই জাতীয় কর্মসূচিতে খেলাধুলার মতো বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ ও পুরস্কারের মাধ্যমে বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলার পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। ধনী এই নগর রাষ্ট্রের আশা, এই প্রকল্পের মাধ্যমে নাগরিকদের মনোযোগ, সমালোচনামূলক চিন্তা এবং কল্পনাশক্তির বিকাশ ঘটবে।
গত ৬ই সেপ্টেম্বর দেশটিতে এই কর্মসূচি শুরু হয়েছে। একই দিন ছিল সিঙ্গাপুরের প্রথম ন্যাশনাল রিডিং মান্থ বা জাতীয় পাঠ মাসের প্রথম দিন। সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল লাইব্রেরি বোর্ড (এনএলবি) জানিয়েছে, এই কর্মসূচির লক্ষ্য হলো সিঙ্গাপুরবাসীকে প্রতিদিন মাত্র ১৫ মিনিট দিয়ে বই পড়াকে দৈনন্দিন জীবনের অংশ করে তুলতে উৎসাহিত করা।
এনিয়ে এনএলবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এক পোস্টে লিখেছে, প্রতিদিন মাত্র ১৫ মিনিট দিয়েই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা সম্ভব।
রিডএসজি ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, প্রতিদিন ১৫ মিনিটই একটি পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে যথেষ্ট। তিনটি এমআরটি স্টেশনের মধ্যবর্তী যাত্রা, বাসের জন্য অপেক্ষা করা কিংবা সকালে এক কাপ কফি উপভোগ করার সময়টুকুই এর জন্য যথেষ্ট। ছোট ছোট মুহূর্ত জমে তৈরি হয় বড় বড় গল্প। এনএলবি’র প্রধান মেলিসা ট্যান বলেন, এই কর্মসূচির অন্যতম লক্ষ্য হলো দীর্ঘ সময় ধরে বই পড়ার মাধ্যমে অর্জিত বিভিন্ন দক্ষতা মানুষের মধ্যে গড়ে তোলা। তার ভাষায়, স্বল্পদৈর্ঘ্যের কনটেন্ট আমাদের তথ্য সম্পর্কে অবহিত থাকতে সাহায্য করে। কিন্তু দীর্ঘপাঠ মনোযোগ, সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা এবং কল্পনাশক্তিকে শক্তিশালী করে। তিনি আরও বলেন, শেষ পর্যন্ত আমরা এমন একটি পাঠকসমাজ দেখতে চাই, যারা কৌতূহলী, চিন্তাশীল ও বিচক্ষণ এবং ক্রমবর্ধমান জটিল একটি পৃথিবীর সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার জন্য প্রয়োজনীয় সক্ষমতা রাখে।
কে অংশ নিতে পারবেন?
এই চ্যালেঞ্জে অংশ নেয়ার সুযোগ রয়েছে ‘সিংপাস’ অ্যাকাউন্টধারী যেকোনো ব্যক্তির। সিংপাস হলো সিঙ্গাপুরের নাগরিক ও স্থায়ী বাসিন্দাদের ডিজিটাল পরিচয়ব্যবস্থা। অংশগ্রহণকারীরা শুরুতেই একটি ছোট ব্যক্তিত্বভিত্তিক কুইজে অংশ নেন। সেই কুইজের ফলের ভিত্তিতে তাদের জন্য উপযুক্ত একটি ‘রিডিং ফ্লেভার’ বা পড়ার ধরন নির্ধারণ করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে ‘কুয়ে লাপিস’- যার বৈশিষ্ট্য ‘স্তরযুক্ত, উদ্দেশ্যপূর্ণ এবং অন্যরা যা খেয়াল করে না, তা লক্ষ্য করে’; ‘কুলফি’- ‘স্বাদপূর্ণ, উচ্চাকাঙ্ক্ষী এবং কখনো কখনো বিশৃঙ্খল হয়ে উঠতে পারে’; এবং ‘টাং ইউয়ান’- ‘সাদাসিধে, উষ্ণ এবং নিজের সিদ্ধান্তেই অটল’- এমন আরও কয়েকটি ধরন।
প্রতিদিন ১৫ মিনিট পড়লেই কয়েন
প্রতিদিন ১৫ মিনিট বই পড়ার মাধ্যমে একটি রিডিং স্ট্রিক বা ধারাবাহিক পড়ার হিসাব শুরু হয়। অংশগ্রহণকারীদের রিডএসজি চ্যালেঞ্জ পেজে প্রতিদিনের পড়ার সেশন নথিভুক্ত করতে হবে। এই পেজটি ‘ক্রাউডটাস্কএসজি’ প্ল্যাটফরমে রয়েছে। এটি সিঙ্গাপুর সরকারের নাগরিক ও স্থায়ী বাসিন্দাদের জন্য পরিচালিত একটি প্ল্যাটফরম। প্রতিদিনের ১৫ মিনিটের একটি পড়ার সেশন নথিভুক্ত করলে পাওয়া যায় ২০টি ভার্চ্যুয়াল কয়েন।
১,০০০ ভার্চ্যুয়াল কয়েনের মূল্য ১ সিঙ্গাপুর ডলার। অর্থাৎ, ১ ডলার সমমূল্যের ভার্চ্যুয়াল কয়েন অর্জন করতে একজন অংশগ্রহণকারীকে ৫০ দিন পড়ার সেশন নথিভুক্ত করতে হবে। তবে দিনে একটির বেশি সেশন নথিভুক্ত করার সুযোগ নেই।
অবশ্য এই হিসাব থেকেই বোঝা যায়, মানুষকে ধনী করে তোলা এই কর্মসূচির উদ্দেশ্য নয়। বরং নিয়মিত বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলাই এনএলবি’র মূল লক্ষ্য।
পড়ার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দাতব্য উদ্যোগও
পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলার পাশাপাশি কর্মসূচিতে যুক্ত করা হয়েছে একটি দাতব্য উদ্যোগ। ৬ই সেপ্টেম্বর থেকে ৭ই অক্টোবর পর্যন্ত রিডএসজি চ্যালেঞ্জে নথিভুক্ত প্রতিটি পড়ার সেশন এনএলবি’র অন্যতম প্রধান দাতব্য কর্মসূচি ‘রিড ফর গুড’ এ অবদান রাখবে।
অর্থাৎ, অংশগ্রহণকারীরা বই পড়ার মাধ্যমে নিজেদের অভ্যাস গড়ে তোলার পাশাপাশি একটি দাতব্য উদ্যোগেও অবদান রাখার সুযোগ পাচ্ছেন।
পড়াকে ‘গেমে’ পরিণত করার উদ্যোগ
সিঙ্গাপুরের এই উদ্যোগে বই পড়াকে অনেকটা খেলাধুলার মতো করে তোলা হয়েছে- যেখানে প্রতিদিনের পড়া, ধারাবাহিকতা ও অংশগ্রহণের জন্য ভার্চ্যুয়াল কয়েন এবং বিভিন্ন ধরনের স্বীকৃতি রয়েছে।
এমন সময়ে সিঙ্গাপুরের এই উদ্যোগটি সামনে এসেছে, যখন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের পড়ার সক্ষমতা নিয়েও নতুন করে আলোচনা চলছে। ২০২৫ সালের প্রোগ্রাম ফর ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্ট অ্যাসেসমেন্ট (পিআইএসএ)-এর ফলাফলে দেখা গেছে, বিশেষ করে সিঙ্গাপুর, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও চীনের উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা পড়ার ক্ষেত্রে পশ্চিমা দেশগুলোর সমবয়সী শিক্ষার্থীদের তুলনায় এগিয়ে রয়েছে। সিএনএনের এক প্রতিবেদনে এমন তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
সিঙ্গাপুরের নতুন উদ্যোগের লক্ষ্য তাই শুধু মানুষকে আরও বেশি বই পড়ানো নয়; বরং প্রতিদিনের জীবনে দীর্ঘপাঠের অভ্যাস, মনোযোগ, চিন্তাশক্তি ও কল্পনাশক্তি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা।
