গণতান্ত্রিক সমাজে কোনো ব্যক্তি বা দলের সব বক্তব্যের সঙ্গে একমত হওয়া জরুরি নয়। একইভাবে কোনো সমালোচনা পছন্দ না হলেই তা প্রত্যাখ্যান করাও সঠিক নয়। অন্যের মত ও সমালোচনা গ্রহণ করার মানসিকতা গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেছেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান।
শুক্রবার রাজধানীর লেকশোর গ্র্যান্ড হোটেলে ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক রচিত ‘বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী; ইটস হিস্ট্রি অ্যান্ড পলিটিক্স’ শীর্ষক বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে সম্মানিত প্যানেলিস্ট হিসেবে বক্তব্য প্রদানকালে তিনি এসব কথা বলেন।
আবদুর রাজ্জাকের বইটি তাঁর কাছে শুধু সাহিত্য বা গবেষণাধর্মী গ্রন্থ নয় উল্লেখ করে আইনমন্ত্রী বলেন, এটি একজন মানুষের জীবনদর্শন, চিন্তা, চেতনা এবং একটি সমাজকে দেখার অভিজ্ঞতার প্রতিফলন। বইটিতে আবদুর রাজ্জাকের চিন্তা ও দর্শনের প্রতিফলন ঘটেছে। বইটির আলোচনায় উঠে আসা আবদুর রাজ্জাকের রাষ্ট্র ও সমাজচিন্তার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ওপর থেকে কোনো ইসলামিক শাসনব্যবস্থা চাপিয়ে দেওয়া নয়; বরং সমাজ থেকে ইসলামিক মূল্যবোধের আলোকে একটি রাষ্ট্র গড়ে তোলা এবং রাষ্ট্র পরিচালনা করাই ইসলামিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সঠিক পথ।
নতুন প্রজন্মের প্রসঙ্গে মো. আসাদুজ্জামান বলেন, সামনে এগিয়ে যেতে হলে সমাজকে পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে। জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান একটি প্রজন্মের পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষাকে সামনে এনেছে। আবদুর রাজ্জাকের বইয়েও পরিবর্তন ও রাজনৈতিক চিন্তার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন রয়েছে।
বইটিতে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ এবং সে সময়ের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট সম্পর্কে আবদুর রাজ্জাকের মূল্যায়নের প্রসঙ্গ তুলে ধরে আইনমন্ত্রী বলেন, এ বিষয়ে তাঁর অবস্থান এবং জাতির কাছে দেওয়া বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর সেই অবস্থান আরও আগে স্পষ্টভাবে সামনে এলে এ বিষয়ে অনেক প্রশ্নের অবসান হতে পারত বলে তিনি উল্লেখ করেন।
আবদুর রাজ্জাকের সাংগঠনিক ভূমিকা প্রসঙ্গে মো. আসাদুজ্জামান বলেন, তিনি জামায়াতে ইসলামীর অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি জেনারেল পদে দায়িত্ব পালন করলেও তাঁর কর্ম, চিন্তা, দর্শন ও আদর্শের কারণে তিনি নিজস্ব একটি অবস্থান তৈরি করেছিলেন। সমাজ ও আন্তর্জাতিক পরিসরে তাঁর প্রতি যে শ্রদ্ধা ছিল, তা তাঁর সাংগঠনিক পদমর্যাদার চেয়েও বড় ছিল।
আবদুর রাজ্জাক মানবাধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক প্রচারণা চালানোর জন্য উৎসাহিত করতেন উল্লেখ করে মো. আসাদুজ্জামান বলেন, আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক পরিসরে মানবাধিকারের বিষয়কে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে কথা বলার একটি মাধ্যম হিসেবে তিনি বিবেচনা করেছিলেন।
আবদুর রাজ্জাকের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত ও পেশাগত স্মৃতিচারণ করে আইনমন্ত্রী বলেন, লন্ডনে গেলে কখনো তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে চা পান করেছেন, কখনো টেলিফোনে কথা বলেছেন। জীবনের শেষ দিকে হাসপাতালে থাকা অবস্থায় আবদুর রাজ্জাক বাংলাদেশের মাটিতে দাফন হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। তাঁর সেই ইচ্ছা পূরণ হয়েছে উল্লেখ করে তিনি মরহুমের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন।
অনুষ্ঠানে বইটির গুরুত্ব তুলে ধরে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী; ইটস হিস্ট্রি অ্যান্ড পলিটিক্স’ বিশেষ করে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের পাঠ করা উচিত।
অনুষ্ঠানে প্যানেলিস্ট হিসেবে আরও উপস্থিত ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির ডিপার্টমেন্ট অব পলিটিক্স অ্যান্ড গভর্নমেন্টের ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর আলী রিয়াজ, ওয়াশিংটন ডিসিভিত্তিক রাইট টু ফ্রিডম এর প্রেসিডেন্ট ও সাবেক মার্কিন কূটনীতিক জন ড্যানিলোভিচ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী এবং দ্য ডেইলি স্টার-এর কনসালটিং এডিটর ও বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে গঠিত মিডিয়া রিফর্ম কমিশনের চেয়ারম্যান কামাল আহমেদ।
