ক্ষমা না চাইলেও পরোক্ষভাবে একাত্তরের অবস্থান মেনে নিয়েছে জামায়াত: আইনমন্ত্রী

ক্ষমা না চাইলেও পরোক্ষভাবে একাত্তরের অবস্থান মেনে নিয়েছে জামায়াত: আইনমন্ত্রী

ফন্ট সাইজ:

ক্ষমা না চাইলেও পরোক্ষভাবে একাত্তরের অবস্থান মেনে নিয়েছে জামায়াতে ইসলামী বলে মন্তব্য করেছেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান।  শুক্রবার সকালে রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে প্রয়াত ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাকের ‘বাংলাদেশ জামায়াত-ই-ইসলামী: ইটস হিস্ট্রি অ্যান্ড পলিটিকস’ শীর্ষক বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠান হয়। বইটির প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড (ইউপিএল) আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে আইনমন্ত্রী এ কথা বলেন। 

প্রসঙ্গত জামায়াতের সাবেক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক দলটিকে ১৯৭১ সালের অপরাধের জন্য জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। এই তথ্য তিনি তার বইয়ে উল্লেখ করেছেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে আইনমন্ত্রী এ কথা বলেন।

মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ইসলামিক শাসন কায়েম করে চাপিয়ে দেবো, সেটা একটা ভ্রান্ত নীতি, ফ্যালাসি; বরং সমাজ থেকে ইসলামিক মূল্যবোধের আলোকে একটি রাষ্ট্র গঠিত হোক, রাষ্ট্র পরিচালিত হোক— সেটাই হবে প্রকৃত ইসলামিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা কায়েমের সঠিক পথ। ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাকের বইয়ে ঠিক এইভাবে বিষয়টা এসেছে, আমি দেখলাম। আমি রাজ্জাক সাহেবের ইসলামিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা কায়েমের চিন্তার সাথে দ্বিমত পোষণ করতে পারি, কিন্তু একটা মূল্যবোধের জায়গা থেকে, একটা রাষ্ট্রব্যবস্থার জায়গা থেকে আমার ধারণা, দিস ইজ দ্য প্রোস ফর জুরিস্ট। এই বইটা আমার কাছে সাহিত্য মনে হয়নি, গবেষণাধর্মীও মনে হয়নি, এটা একটা জীবন্ত একজন মানুষের এনসাইক্লোপিডিয়ার মতো মনে হয়েছে। রাজ্জাক সাহেব একটা সমাজকে তার জীবন দিয়ে যেভাবে দেখেছেন, তার জীবন দর্শন যেভাবে ছিল— এই বইটা তার একটা রিফ্লেকশন।
তিনি বলেন, এখানে জামায়াতের কথা বলা হয়েছে। আজকে জামায়াতের যারা মেইনস্ট্রিমের আইনজীবী হিসেবে সুপ্রিম কোর্ট বা আমাদের এই অঙ্গনে পরিচিত, জামাতের যারা লিডারশিপে আছেন— আমার প্রত্যাশা ছিল আজকের আলোচনায় তারা থাকবেন। তারা কেউ উপস্থিত হতে পারেনি। এটা তাদের দীনতা, এটা তাদের ব্যর্থতা, এটা তাদের সংকীর্ণতা ও সীমাবদ্ধতা। তারা উপস্থিত হয়ে বইয়ের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করতে পারতেন, কারণ দিস ইজ ডেমোক্রেসি। আপনি রাজ্জাক সাহেবের সব কথার সঙ্গে একমত হবেন— এটা যেমন সত্যি না, আবার তার সমালোচনা গ্রহণ করতে পারবেন না— এটাও সঠিক না। এই বইয়ের মধ্যে বিএনপি সম্পর্কে সমালোচনা করা হয়েছে; ফাইন, উই হ্যাভ টু অ্যাকসেপ্ট। আমরা যদি এটা ধারণ করতে না পারি, সমাজ ব্যবস্থা নিয়ে আমরা এগিয়ে যেতে পারবো না।
আইনমন্ত্রী বলেন, রাজ্জাক সাহেব ৭১ নিয়ে উনার যে মূল্যায়ন করেছেন, উনি যে জাতির কাছে একটি স্টেটমেন্ট করার কথা বলেছেন, রাজ্জাক সাহেবের এই স্টেটমেন্টটা ২০১৬ সালে যদি সাইন করতো, জামায়াতের অনেক প্রশ্নের সমাধান হতো। জামায়াত কিন্তু এই প্রশ্নটাই এখন মেনে নিয়েছে। এই স্টেটমেন্টের আলোকেই জামায়াতের আজকের পজিশন। জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল আইন ২০২২ এ মুক্তিযোদ্ধাদের একটা সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে। সেই সংজ্ঞার মধ্যে ১৯৭১ সালে জামায়াতে ইসলামী যে বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী মানুষের বিরোধিতা করেছিল, সেই কথাটি ইনকর্পোরেট করা আছে। এটাতে ২০২৫ সালের অ্যামেন্ডমেন্টে কিছু সংশোধনী আনা হলো। আমরা ২০২৬ সালে এটা অ্যাক্ট অফ পার্লামেন্ট করতে গেলে বিশেষ কমিটিতে এই বিষয়টি আনা হয়। তখন দলটির পক্ষ থেকে বলা হলো, জামায়াতের নামটা এখান থেকে বাদ দেয়া যাবে কিনা।
তিনি আরও বলেন, সেখানে অ্যামেন্ডমেন্টে বলা হলো যে, ‘মুক্তিযোদ্ধা কারা?’ সংজ্ঞায় বলছে, যারা ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী, রাজাকার, আল বদর, জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগ ও নেজামে ইসলামী পার্টির বিরোধিতা করেছেন, সংগ্রাম করেছেন দেশ স্বাধীনের জন্য— তারা হলেন মুক্তিযোদ্ধা। জামায়াতের দাবি ছিল, জামায়াতের নামটা ওখান থেকে বাদ দিয়ে দেয়ার জন্য। আমরা বললাম, ঐতিহাসিক সত্যটাকে আমরা তো অস্বীকার করতে পারি না। আলোচনার এক পর্যায়ে এসে ওখানে শুধু লেখা হলো ‘তৎকালীন জামায়াতে ইসলামী’, ‘তৎকালীন মুসলিম লীগ’, ‘তৎকালীন নেজামে ইসলাম’। পরে পার্লামেন্টে এই আইনটা প্লেস হলো। আপনারা জানেন যে পার্লামেন্টে আইন পাস করতে গেলে ‘হ্যাঁ’ এবং ‘না’ ভোট দেয়া যায়। জামায়াতে ইসলামীর কোনো সদস্য এতে ‘না’ ভোট দেননি। এটা রেকর্ডেড, জামায়াত ‘না’ ভোট দেয়নি।
তিনি আরও বলেন, ২০১৬ সালে ব্যারিস্টার রাজ্জাক যে রাজনৈতিক দর্শন এবং নীতি অনুসরণ করে একটি স্টেটমেন্ট ড্রাফট করেছিলেন। যেখানে তিনি একাত্তরে জামায়াতের ভূমিকাকে জাতির সামনে আনার চেষ্টা করেছেন। জামায়াত ইনডাইরেক্টলি ‘না’ ভোট না দেয়ার মধ্য দিয়ে একাত্তরের সেই ভূমিকাকে মেনে নিলো, বাই পার্টিসিপেটিং ইন দ্য পার্লামেন্টারি প্রসেস। এখানেই রাজ্জাক সাহেবের দূরদর্শিতা প্রকাশ পায়।

বইটির আলোচনায় উঠে আসা আবদুর রাজ্জাকের রাষ্ট্র ও সমাজচিন্তার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ওপর থেকে কোনো ইসলামিক শাসনব্যবস্থা চাপিয়ে দেওয়া নয়; বরং সমাজ থেকে ইসলামিক মূল্যবোধের আলোকে একটি রাষ্ট্র গড়ে তোলা এবং রাষ্ট্র পরিচালনা করাই ইসলামিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সঠিক পথ।

নতুন প্রজন্মের প্রসঙ্গে মো. আসাদুজ্জামান বলেন, সামনে এগিয়ে যেতে হলে সমাজকে পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে। জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান একটি প্রজন্মের পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষাকে সামনে এনেছে। আবদুর রাজ্জাকের বইয়েও পরিবর্তন ও রাজনৈতিক চিন্তার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন রয়েছে।
অনুষ্ঠানে প্যানেলিস্ট হিসেবে আরও উপস্থিত ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির ডিপার্টমেন্ট অব পলিটিক্স অ্যান্ড গভর্নমেন্টের ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর আলী রীয়াজ, ওয়াশিংটন ডিসিভিত্তিক Right to Freedom-এর প্রেসিডেন্ট ও সাবেক মার্কিন কূটনীতিক জন ড্যানিলোভিচ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী এবং দ্য ডেইলি স্টার-এর কনসালটিং এডিটর ও বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে গঠিত মিডিয়া রিফর্ম কমিশনের চেয়ারম্যান কামাল আহমেদ।