অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ের আইন কর্মকর্তাদের পেশাগত নৈতিকতা ও দায়িত্বশীলতা জোরদারে ঢাকায় শুরু হয়েছে দুই দিনব্যাপী এক বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মশালা।
শুক্রবার সকালে রাজধানীর একটি হোটেলে ‘অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ের আইন কর্মকর্তাদের প্রসিকিউটরিয়াল নৈতিকতার নীতি ও অনুশীলন জোরদারকরণ’ শীর্ষক এ কর্মশালার উদ্বোধন করা হয়। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তর (ইউএনওডিসি) দক্ষিণ এশিয়া আঞ্চলিক কার্যালয়ের আয়োজনে এবং ইউএনডিপি বাংলাদেশের সহায়তায় ১৮ ও ১৯ সেপ্টেম্বর এই প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এতে অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজলসহ কার্যালয়ের ১৬০ জন আইন কর্মকর্তা অংশ নিচ্ছেন। কর্মশালায় প্রশিক্ষক ও বিশেষজ্ঞ প্যানেলে রয়েছেন বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার সারা হোসেন, থাইল্যান্ডের প্রসিকিউটর ওয়ারানথর্ন ওয়ানিচথাওয়ার্ন এবং মালদ্বীপের প্রসিকিউটর মারিয়াম সিমহা মুস্তফা রাশিদ।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, রাষ্ট্রের আইন কর্মকর্তাদের কাজ শুধু সরকারের পক্ষে মামলা জেতা বা সাজা নিশ্চিত করা নয়; সংবিধান, আদালত ও বৃহত্তর জনস্বার্থের প্রতি তাদের দায়িত্বশীল থাকতে হবে।
তিনি বলেন, “রাষ্ট্রের আইন কর্মকর্তা প্রথমত জনস্বার্থের আইনজীবী।”
প্রতিটি রিট, জামিন আবেদন ও পিটিশনের সঙ্গে মানুষের জীবন, স্বাধীনতা ও মর্যাদার বিষয় জড়িত উল্লেখ করে কাজল অপ্রয়োজনীয় হয়রানি বন্ধ করা এবং প্রক্রিয়াগত বিলম্ব এড়িয়ে নাগরিকবান্ধবভাবে মামলা পরিচালনার ওপর গুরুত্ব দেন।
একটি ফৌজদারি মামলার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, এক ব্যক্তি তার কাছে আসামির জামিন স্থগিত করতে আপিল বিভাগে যাওয়ার অনুরোধ করেছিলেন। ফাইল পর্যালোচনা করে মামলাটি ভিত্তিহীন মনে হওয়ায় তিনি সংশ্লিষ্ট আইন কর্মকর্তাকে বিষয়টি তদন্ত কর্মকর্তাকে জানাতে বলেন।
পরে ওই ব্যক্তি আবার তার কাছে এসে আপিল বিভাগে যাওয়ার প্রয়োজন নেই এবং বাদীর সঙ্গে আপস করবেন বলে জানান।
এ প্রসঙ্গে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, “এ ধরনের অনুরোধ আমরা কখনো কখনো পাই। কিন্তু সবাই যা চান, তা করা আমাদের কাজ নয়। আমাদের দায়িত্ব ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা।”
নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলার উদাহরণ দিয়ে কাজল বলেন, বিচারিক আদালতে ১৬ জনের মৃত্যুদণ্ড হলেও উচ্চ আদালতে আপিল শুনানির সময় রাষ্ট্রপক্ষের দায়িত্ব শুধু সাজা নিশ্চিত করা ছিল না; নিরপরাধ নাগরিকদের সুরক্ষার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হয়েছে।
“দেশের প্রতিটি নাগরিকই আমাদের মক্কেল। শুধু রাষ্ট্রের পক্ষে সাজা নিশ্চিত করাই আমাদের দায়িত্ব নয়; নিরপরাধ নাগরিকদেরও আমরা রক্ষা করছি,” বলেন তিনি।
অনুষ্ঠানে ইউএনওডিসি দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক প্রতিনিধি ক্রিশ্চিয়ান ভলজ বলেন, ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় প্রসিকিউটরদের দায়িত্ব অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ। তাদের একই সঙ্গে দৃঢ় ও সংযতভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। জনমত, গণমাধ্যম বা রাজনৈতিক চাপের ঊর্ধ্বে উঠে জনস্বার্থ নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, “জনপ্রিয় কাজটি করা সহজ, কিন্তু সঠিক কাজটি করাই প্রসিকিউটরদের আসল দায়িত্ব।”
জাতিসংঘের নির্দেশিকা উল্লেখ করে ভলজ আরও বলেন, নিরপেক্ষ তদন্তে অভিযোগ ভিত্তিহীন প্রমাণিত হলে মামলা পরিচালনা সমীচীন নয়। একই সঙ্গে আসামির পক্ষে যাওয়া প্রমাণ বিবেচনা এবং বেআইনিভাবে সংগৃহীত প্রমাণ বর্জনের ওপর তিনি জোর দেন।
ইউএনডিপি বাংলাদেশের আবাসিক প্রতিনিধি স্টেফান লিলার বলেন, বিচারব্যবস্থার কেন্দ্রে মানুষকে রাখতে হবে। ন্যায়বিচার শুধু আইন বা সাজার বিষয় নয়, মানুষের জীবন ও মর্যাদার সঙ্গে এটি সরাসরি যুক্ত। সততার গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, “সততা কোনো খণ্ডকালীন বিষয় নয়; প্রতিটি দিন ও প্রতিটি সিদ্ধান্তে এর প্রতিফলন থাকতে হবে।” এ সময় তিনি বিচার বিভাগ ডিজিটালাইজেশন ও মামলাজট কমাতে ইউএনডিপির নানা সহায়তার কথা উল্লেখ করেন।
উদ্বোধনী বক্তব্যে অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনীক আর হক আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, এই কর্মশালা অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ের কাজের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ নৈতিক মান বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
দুই দিনের এই কর্মশালায় প্রসিকিউটরদের নৈতিকতা, গ্রেপ্তার ও রিমান্ড সংক্রান্ত আইনি সুরক্ষা, সাক্ষ্য-প্রমাণের নির্ভরযোগ্যতা, ভুক্তভোগী ও সাক্ষীর সুরক্ষা এবং পুলিশ-প্রসিকিউশন সমন্বয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হচ্ছে।
