ইউক্রেন সংঘাত শুরুর পর প্রথমবারের মতো রাশিয়ায় অনুষ্ঠিত হচ্ছে জাতীয় সংসদ বা স্টেট দুমার সাধারণ নির্বাচন। শুক্রবার থেকে শুরু হওয়া তিন দিনব্যাপী এ নির্বাচনে প্রায় ১১ কোটি ১০ লাখ ভোটারের রায় নেয়ার আনুষ্ঠানিকতা চলছে। তবে অঘোষিতভাবে ফলাফলের সমীকরণ আগে থেকেই নির্ধারিত। অর্থনৈতিক মন্দা, ক্রমবর্ধমান যুদ্ধব্যয় এবং দেশের ভেতরে দফায় দফায় ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলার পটভূমিতে আয়োজিত এ নির্বাচনের একমাত্র লক্ষ্য হলো প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের যুদ্ধনীতি ও ক্ষমতার ওপর জনগণের সমর্থনের বৈধতা দেয়া।
দখলকৃত অঞ্চলেও নির্বাচন, ভোটার বাড়ানোর কৌশল: রুশ পার্লামেন্টের ৪৫০টি আসনের অর্ধেক দলভিত্তিক আনুপাতিক হারে এবং বাকি অর্ধেক একক আসনভিত্তিক প্রত্যক্ষ ভোটে নির্ধারিত হয়। এবার আন্তর্জাতিক আইন ও কিয়েভের প্রতিবাদকে উপেক্ষা করে ২০২২ সালের পর দখল করা ইউক্রেনের চারটি অঞ্চল এবং ২০১৪ সালে অন্তর্ভুক্ত ক্রিমিয়াকেও ভোট প্রক্রিয়ায় যুক্ত করেছে মস্কো। নির্বাচন সংশ্লিষ্টদের মতে, তিন দিনব্যাপী ভোটগ্রহণ এবং ব্যাপক ইলেকট্রনিক ভোটিং ব্যবস্থার উদ্দেশ্য মূলত ভোটার উপস্থিতি বাড়িয়ে রাজনৈতিক আধিপত্যকে আরও নিখুঁতভাবে তুলে ধরা।
ইউনাইটেড রাশিয়ার একাধিপত্য ও নতুন মুখ: রাশিয়ার বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থার শীর্ষে রয়েছে ক্রেমলিন সমর্থিত দল ইউনাইটেড রাশিয়া। সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখা এ দলটির প্রতীক ভাল্লুক। দলের তালিকায় সবার ওপরে রাখা হয়েছে দীর্ঘ ২২ বছর ধরে শীর্ষ কূটনীতিকের দায়িত্ব পালন করা ৭৬ বছর বয়সী পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ এবং প্রভাবশালী মস্কোর মেয়র সের্গেই সোবিয়ানিনকে। আমলাতান্ত্রিক ভাবমূর্তি দূর করতে যুদ্ধক্ষেত্রে ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলায় আহত সাংবাদিক ইয়েভগেনি পদদুবনিকে যুক্ত করা হয়েছে তালিকার তৃতীয় স্থানে। ইউক্রেন যুদ্ধের লক্ষ্য অর্জনে দলটি সম্পূর্ণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হলেও মেয়র সোবিয়ানিনের মতো বাস্তববাদীরা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ভেঙে পড়ার আশঙ্কায় গণহারে সেনা মোতায়েনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন।
নিয়ন্ত্রিত বিরোধী দল ও ক্রেমলিনের প্রতি আনুগত্য: রুশ রাজনীতিতে বিরোধী দল হিসেবে পরিচিত দলগুলো মূলত তথাকথিত ‘সিস্টেমিক অপজিশন’ বা নিয়ন্ত্রিত বিরোধী দল, যারা ক্রেমলিনের প্রতি সম্পূর্ণ অনুগত। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে ৮২ বছর বয়সী গেন্নাদি জিউগানোভের নেতৃত্বে থাকা কমিউনিস্ট পার্টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তরুণদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করলেও তারা পুতিনের প্রতিটি নির্দেশ পুরোপুরি মেনে চলে। কট্টর জাতীয়তাবাদী লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি অব রাশিয়া (এলডিপিআর) তাদের প্রতিষ্ঠাতা ভ্লাদিমির ঝিরিনোভস্কির মৃত্যুর পর বর্তমানে লিওনিদ স্লুটস্কির নেতৃত্বে পরিচালিত হচ্ছে। এ দলটি যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘ কারাদণ্ড ভোগ করে বন্দিবিনিময়ে মুক্তি পাওয়া সাবেক অস্ত্র ব্যবসায়ী ভিক্টর বাউটকে প্রার্থী করেছে। এছাড়া সমাজতান্ত্রিক ধাঁচের আ জাস্ট রাশিয়া এবং তরুণ ভোটারদের লক্ষ্য করে গড়ে ওঠা নিউ পিপল পার্টি আপাতদৃষ্টিতে বিকল্প দাবি করলেও চূড়ান্ত পর্যায়ে পুতিনের যুদ্ধনীতির সঙ্গেই একাত্মতা প্রকাশ করেছে।
যুদ্ধবিরোধী মত দমন ও চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ: রুশ রাজনীতির অন্দরমহলে বিরোধীদের ওপর দমন-পীড়ন খুবই সাধারণ ঘটনা। ইউক্রেন যুদ্ধের বিরোধিতাকারী একমাত্র নিবন্ধিত উদারপন্থি রাজনৈতিক দল ইয়াবলোকোকে আগেই জাতীয় ব্যালট তালিকা থেকে বাদ দিয়েছে দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। দলটির অবস্থানকে দেশের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ণ করার প্রচেষ্টা হিসেবে আখ্যা দিয়ে জাতীয়তাবাদী মাদারল্যান্ড পার্টির মামলার পরিপ্রেক্ষিতে এ রায় দেয়া হয়। এর ফলে যুদ্ধের পক্ষে-বিপক্ষে কোনো সত্যিকারের রাজনৈতিক বিতর্ক সৃষ্টির সুযোগ শুরুতেই বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। স্বতন্ত্র পর্যবেক্ষণ সংস্থার অনুপস্থিতি ও বিরোধী মতকে স্তব্ধ করে পুতিনের অনুগত বলয়ই শেষ পর্যন্ত রাশিয়ার রাজনীতি ও আইনসভাকে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখছে।
সূত্র: এপি
