ক্রসফায়ারের পর জিয়াউল আহসান

দুশ্চিন্তার কিছু নাই, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় অবগত

ফন্ট সাইজ:

ক্রসফায়ারে হত্যার পর গলায়-পায়ে সিমেন্টের বস্তা বেঁধে ও পেট কেটে নদীতে ফেলার পর তৎকালীন র‌্যাব গোয়েন্দা শাখার প্রধান লে. কর্নেল জিয়াউল আহসান বলেছিলেন, মন খারাপ কিংবা দুশ্চিন্তা করার কিছু নেই, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় বিষয়টি সম্পর্কে অবগত আছেন। এদিন অভিযান শেষে ফেরার পথে গাড়ির অস্বাভাবিক নীরবতা ভাঙতে গিয়ে জিয়াউল উপস্থিত কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে বলেন, এরা রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর। এদের না থাকাই ভালো। এভাবেই এদের গলফ করতে হবে। কর্মকর্তাদের অস্বস্তি দেখে তিনি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় এই বিষয়টি সম্পর্কে অবগত আছেন বলে স্বস্তি ফেরানোর চেষ্টা করেন। এ ছাড়া, র‌্যাবের ‘এনকাউন্টার’ বা বন্দুকযুদ্ধগুলো ছিল পুরোপুরি পূর্বপরিকল্পিত ও সাজানো নাটক। জিয়াউল আহসানের সরাসরি নির্দেশ ও উপস্থিতিতে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, নদীতে ফেলে লাশ গুম (‘গলফ অপারেশন’) এবং সুন্দরবনে সাজানো বন্দুকযুদ্ধের লোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছেন র‌্যাব-৮ এর সাবেক উপ-অধিনায়ক অবসরপ্রাপ্ত মেজর মো. সাব্বির রহমান ওসমানী।

গতকাল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ জবানবন্দিতে মেজর সাব্বির এসব কথা বলেন। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় শতাধিক ব্যক্তিকে গুম করে হত্যার ঘটনায় মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাব্বির রহমান ১৩তম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ আর্মি ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, খুলনাতে ডেপুটি এঙাম কন্ট্রোলার হিসেবে কর্মরত রয়েছেন।

জবানবন্দিতে সাব্বির রহমান বলেন, তিনি ১৯৯৩ সালের ১৮ই জুন ২৮তম বিএমএ লংকোর্সের সঙ্গে সাঁজোয়া কোরে কমিশন লাভ করেন। ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তাকে র‌্যাবে বদলি করা হয়। তখন তিনি মেজর ছিলেন। ২০০৯ সালের অক্টোবরে তিনি র‌্যাব-৮-এ বরিশালে উপ-অধিনায়ক হিসেবে যোগ দেন। তখন র‌্যাবের ডিজি ছিলেন হাসান মাহমুদ খন্দকার। এডিজি (অপস) ছিলেন কর্নেল মতিউর রহমান। র‌্যাবের গোয়েন্দা শাখার পরিচালক ছিলেন লে. কর্নেল জিয়াউল আহসান। মেজর (অব.) সাব্বির বলেন, সুন্দরবনে বনদস্যুদের কাছে অটোমেটিক অস্ত্র থাকার কথা নয়, অথচ বনের ভেতর থেকে আগেই অটোমেটিক অস্ত্রের গুলির আওয়াজ পাওয়া যেতো। এ ছাড়া, প্রচণ্ড গোলাগুলির মাঝেও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কোনো বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট বা হেলমেট ছাড়াই সাধারণ পোশাকে নিরাপদে ঘুরে বেড়াতেন; যা স্পষ্টতই প্রমাণ করে অভিযানগুলো পুরোপুরি সাজানো বা স্টেজড ছিল। জবানবন্দির শেষাংশে তিনি জানান, তার জানামতে জিয়াউল আহসান বরিশাল অঞ্চল ব্যবহার করে অন্তত ১৫ থেকে ২০ বার এ ধরনের ‘গলফ অপারেশন’ পরিচালনা করেছেন। আটক ব্যক্তিদের পরিচয় কেবল জিয়াই জানতেন। তাদের জম টুপি পরিয়ে, খালি পায়ে এমনভাবে আনা হতো যাতে চেহারা বা শারীরিক গঠন বোঝা না যায়। এসব কর্মকাণ্ডে মানসিক যন্ত্রণায় ভুগে প্রতিকার না পেয়ে তিনি শেষ পর্যন্ত সেনাবাহিনী থেকে স্বেচ্ছায় অবসরের আবেদন করেন এবং পরবর্তীতে অবসর গ্রহণ করেন বলে আদালতকে অবহিত করেন।

পাথরঘাটায় মধ্যরাতে ‘গলফ অপারেশন’: জবানবন্দিতে মেজর (অব.) সাব্বির উল্লেখ করেন, ২০০৯ সালের অক্টোবর থেকে তিনি বরিশালে র‌্যাব-৮ এর উপ-অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১০ সালের জানুয়ারি মাসে একদিন রাতে তৎকালীন র‌্যাবের গোয়েন্দা শাখার প্রধান লে. কর্নেল জিয়াউল আহসান ব্যাটালিয়ন সদরে আসেন। সেখান থেকে অধিনায়ক ও তাকে সঙ্গে নিয়ে কোনো আভিযানিক দল ছাড়াই বরগুনার পাথরঘাটার চরদুয়ানী ঘাটে যান। সেখানে আগে থেকেই প্রস্তুত রাখা ফিশিং ট্রলারে ঢাকা থেকে আনা এক ব্যক্তিকে হাত ও মুখ বাঁধা অবস্থায় তোলা হয়। তিনি জানান, ট্রলারটি মোহনার দিকে নেয়ার পর জিয়াউল আহসানের নির্দেশে পানির গভীরতা মাপা হয়। এরপর র‌্যাব ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের সদস্যরা আটক ব্যক্তির গলায় ও পায়ে সিমেন্টভর্তি বস্তা বাঁধে। মাথায় বালিশ ঠেকিয়ে পিস্তল দিয়ে এক রাউন্ড গুলি করার পর পেটে ছুরি চালিয়ে নাড়িভুঁড়ি কেটে মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়। এরপর লাশটি নদীতে ফেলে দেয়া হয়। এ ধরনের অভিযানকে জিয়াউল আহসান ‘গলফ অপারেশন’ নামে অভিহিত করতেন এবং এটি ‘রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় অবগত আছে’ বলে মন্তব্য করতেন।

একই কায়দায় ৪ জনকে হত্যা ও বিডিআর সদস্য নজরুলের লাশ উদ্ধার: ২০১০ সালের মে মাসে একই প্রক্রিয়ায় ঢাকা থেকে আনা আরও চারজন ব্যক্তিকে চরদুয়ানী ঘাটের ট্রলারে তুলে মোহনায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেও একে একে গলায়-পায়ে সিমেন্টের বস্তা বেঁধে মাথায় গুলি ও পেট কেটে চারজনের লাশ নদীতে ফেলে দেয়া হয়। মেজর (অব.) সাব্বির জানান, এর দুই-তিন দিন পর সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের বলেশ্বর নদীতে মুখ ঢাকা ও পেট কাটা অবস্থায় একটি লাশ ভেসে ওঠে। পরবর্তীতে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে জানা যায়, নিহত ব্যক্তি ছিলেন সাবেক বিডিআর সদস্য নজরুল।

তথ্য ফাঁসের আশঙ্কায় মাঝিকে ‘এলিমিনেট’: জবানবন্দিতে বলা হয়, ‘গলফ অপারেশন’-এ ট্রলার চালাতেন আলকাছ মাঝি নামের এক ব্যক্তি। ২০১১ সালের জুন মাসে জিয়াউল আহসান টেলিফোনে জানান, আলকাছ মাঝি এসব তথ্য বাজারে প্রকাশ করে দিচ্ছে, তাই তাকে ‘এলিমিনেট’ করতে হবে। এ নির্দেশ শুনে সাব্বির রহমান শারীরিক অসুস্থতার অজুহাত দেখিয়ে অপারগতা প্রকাশ করেন। এর কিছুদিন পরই নিখোঁজ হন আলকাছ মাঝি। পরে তার পরিবার র‌্যাব-৮ কার্যালয়ে এসে জানায়, জিয়াউল আহসানের নাম বলে ডেকে নেয়ার পর থেকেই তিনি নিখোঁজ।

সুন্দরবনে ‘সাজানো এনকাউন্টার’: জবানবন্দিতে সুন্দরবনের তিনটি বড় অভিযানের বিশদ তুলে ধরা হয়: নিশানখালী খাল (নভেম্বর ২০১১): বনদস্যু রাজু বাহিনীর বিরুদ্ধে কথিত যৌথ অভিযানের আগের রাতেই ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের অগ্রগামী দল ঘটনাস্থলে যায়। ভোরে তাদের দেয়া হুইসেলের সিগন্যাল পেয়েই ফাঁকা বনে গুলি চালানো হয়। পরে দেখা যায়, ঘটনাস্থলে দু’টি লাশ থাকলেও মামলায় ছয়টি দেখানো হয়। অনুসন্ধানে জানা যায়, বাকি চারটি লাশ আগেই নিয়ে এসে সাজিয়ে রাখা হয়েছিল। কটকা অভিযান (ফেব্রুয়ারি ২০১২): মূল অভিযানের আগে ট্রলারে করে চারজনকে একই কায়দায় হত্যা করে পানিতে ফেলা হয়। পরে পঞ্চম ব্যক্তিকে ট্রলার থেকে নামিয়ে বনের ভেতর নিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয় এবং সেটিকে ‘বন্দুকযুদ্ধ’ হিসেবে চালানো হয়। মরা ভোলা ত্রিমাত্রিক অভিযান (মার্চ ২০১২): হেলিকপ্টার ও বিপুলসংখ্যক গণমাধ্যমকর্মীকে সঙ্গে নিয়ে সাজানো অভিযান চালানো হয়। সেখানেও পাঁচজনের মৃত্যু দেখানো হয়।