রাথীকে নিয়ে বাবার আবেগঘন বার্তা

রাথীকে নিয়ে বাবার আবেগঘন বার্তা

ফন্ট সাইজ:

কারাগারে জন্ম। কারাগারের চার দেয়ালের ভেতরেই কেটে গেছে শৈশবের সাড়ে সাত বছর। মুক্তির পর রাথীর চোখে এখন খোলা আকাশ, যে বয়সে হৈ চৈ আর খেলাধুলায় সময় কাটার কথা। দলবেঁধে বিদ্যালয়ে যাওয়া আর বন্ধু তৈরির কথা। কারাগারই সব কেড়ে নিয়েছে রাথীর। সহপাঠী তো দূরে থাক মা ছাড়া আপনজন কাউকে চেনেই না। ফেনীর সোনাগাজীর বহুল আলোচিত মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় ফাঁসির দণ্ড থেকে সাড়ে সাত বছর পর মুক্তি পাওয়া আরেক ছাত্রী কামরুন নাহার মনির গর্ভে জন্ম নেয়া মোবাশ্বেরা খানম রাথী। মা কারাগারে থাকায় রাথীর জন্ম ও শৈশব কাটে কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগারে। মঙ্গলবার দুপুরে গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মা-মেয়েসহ আটজন মুক্তি পান। পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় ২০১৯ সালে নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় কামরুন্নাহার মনি গ্রেপ্তার হন।

এ সময় শুরুতে ৬ মাস স্ত্রীর মুক্তির জন্য স্বামী রাশেদ দৌড়াদৌড়ি করেছিল, সেটা সত্য। কিন্তু যখনই আদালত ফাঁসির রায় দিল- ঠিক তখনই স্ত্রীর হাতটা শক্ত করে ধরে রাখার বদলে মনিকে তালাক দিয়ে নতুন করে সংসার সাজিয়ে তোলেন। সন্তানের মুক্তির খবরে বাবার বুকভরা একটাই প্রশ্ন- এতদিন যে শৈশবটা হারিয়ে গেল, সেটি ফিরবে কীভাবে। মেয়েকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যখন একের পর এক ভিডিও, ছবি, কবিতা ও গজল ছড়িয়ে পড়ছে, তখন নীরবতা ভেঙে আবেগঘন এক ফেসবুক পোস্ট দিয়েছেন রাথীর বাবা রাশেদুল আলম খান। লিখেছেন, ‘রাথীর প্রতি আপনাদের দায়িত্ব শেষ হলে আমাকে জানাবেন প্লিজ। কারণ আপনারাই তো ওর সব!’ মেয়েকে নিয়ে ভাইরাল হওয়ার প্রবণতায় আক্ষেপ প্রকাশ করে তিনি জানান, রাথীর মুক্তির দিন ঢাকায় যাওয়ার প্রবল ইচ্ছা থাকলেও মেয়েটিকে যেন অতিরিক্ত প্রচারের কেন্দ্রে না আনা হয়, সে কারণে তিনি যাননি। কিন্তু এখন রাথীকে নিয়ে ভিডিও, কবিতা ও গজল দেখে বাবার প্রশ্ন- ‘আমি তো ওর বাবা নাকি? তবে এই প্রশ্নের পরই যেন বাবার বুকের গভীর ভালোবাসা প্রকাশ পেয়েছে।

রাশেদুল লিখেছেন, তিনি রাথীর কাছে যাবেন না ভিডিও বানাতে কিংবা কবিতা-গান করাতে। তিনি যাবেন মেয়ের হারিয়ে যাওয়া শৈশব ফিরিয়ে দিতে। ‘তাকে নিয়ে আমি ঘুরবো, তাকে জগৎ দেখাবো। সে কিছুই দেখেনি।’ রাথীর জন্য পুতুল দেয়ার প্রয়োজন নেই বলেও জানিয়ে তিনি লিখেছেন, তার বাবা মারা যায়নি এখনো। এতদিন খেলনার দোকানের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় মেয়ের জন্য কী কিনবেন, তা ভেবেছেন। এখন মেয়ের জন্য সবচেয়ে সুন্দর জামা, সবচেয়ে প্রিয় পুতুলটি তিনিই কিনবেন। কারণ তার কাছে রাথী শুধু সন্তান নয়, তার রাজকন্যা। বাবার ভাষায়, তার দায়িত্ব দুইদিনের নয়, সারা জীবনের। পোস্টের শেষদিকে রাথীর এই করুণ শৈশবের জন্য রাষ্ট্র ও সমাজের বিবেকের কাছে প্রশ্ন রাখেন তিনি। পাশাপাশি রাথীর মা কামরুন নাহার মনির জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে ক্ষতিপূরণের উদ্যোগ নেয়ার আহ্বান জানান। রাথীর বাবা রাশেদুল আলম খান কামরুন নাহার মনির সাবেক স্বামী। তার দাবি, কারাবন্দি অবস্থায় কামরুন নাহার মনির কোলেই জন্ম নেয় রাথী এবং মায়ের সঙ্গে দীর্ঘ সাত বছর কারাগারে কাটায়। সম্প্রতি কামরুন নাহার মনি মুক্তি পাওয়ার পর রাথীও কারাগার থেকে বের হয়েছে। সাত বছর পর রাথী মুক্ত- এবার তার বাবার লড়াই ক্যামেরার সামনে নয়; মেয়ের হারিয়ে যাওয়া শৈশবের জন্য। হয়তো রাথীর সবচেয়ে বড় উপহার কোনো পুতুল নয়- বাবার হাত ধরে প্রথমবারের মতো মুক্ত আকাশের নিচে হাঁটা।