গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে অন্ধকারে বাংলাদেশ, ধাক্কা পোশাকশিল্পেও

রয়টার্সের প্রতিবেদন

গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে অন্ধকারে বাংলাদেশ, ধাক্কা পোশাকশিল্পেও

ফন্ট সাইজ:

উপসাগরীয় অঞ্চলের চলমান সংকটে এলএনজি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় বাংলাদেশে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট তীব্র হয়েছে। এতে রান্না থেকে শিল্প উৎপাদন, এমনকি হাসপাতালের কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে।
ঢাকায় পারভিন আক্তার এখন পাড়ায় পাইপলাইনে গ্যাস কখন আসছে, তা দেখে রান্নার সময় ঠিক করেন। গ্যাস সরবরাহ অনিয়মিত হয়ে পড়ায় অনেক সময় রাত ১২টা পর্যন্ত অপেক্ষা করে তাকে রাতের খাবার রান্না করতে হয়। ইন্ডাকশন চুলায় রান্নার চেষ্টা করেও লাভ হচ্ছে না, কারণ বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় খাবার আধসেদ্ধ অবস্থায় থেকে যায়।

ছয় মাসেরও বেশি আগে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার পর হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল ও গ্যাস রপ্তানি ব্যাহত শুরু হয়। এখন সৌদি সমর্থিত ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী ও ইরান-সমর্থিত হুতিদের মধ্যে সংঘাত লোহিত সাগর দিয়ে বাণিজ্য চলাচলকেও ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।
এই দুই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে সংকটের কারণে এশিয়ার স্পট বাজারে এলএনজির দাম চলতি সপ্তাহে প্রতি মিলিয়ন বৃটিশ থার্মাল ইউনিটে (এমএমবিটিইউ) প্রায় ৩০ ডলারে উঠেছে। যুদ্ধের আগে এই দাম ছিল প্রায় ১০ ডলার।

শেল-এর হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছর এ পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিশ্ববাজারে প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ টন এলএনজি সরবরাহ কমেছে।

গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে বাংলাদেশ

বাংলাদেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৪০ শতাংশের বেশি আমদানি করা এলএনজি থেকে আসে। এসব এলএনজি আমদানির প্রায় ৯৫ শতাংশই একসময় কাতার থেকে আসত। কাতার থেকে সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় এখন বাংলাদেশকে স্পট মার্কেট থেকে তুলনামূলক বেশি দামে এলএনজি কিনতে হচ্ছে।
চলতি সপ্তাহে বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, শিল্পের প্রবৃদ্ধি ধীর হয়ে যাচ্ছে এবং উৎপাদন কমে যাচ্ছে।

এমন পরিস্থিতিতে দেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পেও প্রভাব পড়েছে।
পোশাকশিল্পের সংগঠন বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ)- এর এক জরিপে দেখা গেছে, আগস্টের শেষ দিক থেকে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে ৫৫ শতাংশ নিট পোশাক কারখানার ক্রেতারা অর্ডার বাতিল বা কমিয়ে দিয়েছেন। আর ৭৮ শতাংশ কারখানা আংশিকভাবে উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে।

একটি কারখানায় গ্যাসের চাপ কম থাকায় উৎপাদনের মাঝপথে বয়লার নষ্ট হয়ে যায়। এই কারখানার মালিক আলভি ইসলামকে চীন থেকে কাপড় সংগ্রহ করতে হয়। উৎপাদনে দেরি হওয়ায় এক ক্রেতা ৫০ হাজার পিসের অর্ডার কমিয়ে ৪০ হাজার পিস করেন।

জ্বালানি সংকটের কারণে উৎপাদনে দেরি হওয়ায় সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে অতিরিক্ত অর্থ খরচ করে বিমানপথে পণ্য পাঠাতে হয়েছে।

পোশাকশিল্পের নির্বাহী ফজলে শামীম এহসান জানান, ফ্রান্সের এক ক্রেতার কাছে হুডি জ্যাকেট পাঠাতে তাদের বিমান পরিবহনে ৫০ হাজার ডলার খরচ হয়েছে।

ফতুল্লা অ্যাপারেলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এহসান বলেন, এর ওপর কারখানা চালু রাখতে শুধু ডিজেলের পেছনেও আমাদের অতিরিক্ত অর্থ খরচ করতে হয়েছে।
টাঙ্গাইল শহরের পোলট্রি খামারি সায়েদুল ইসলাম জানান, বিদ্যুৎ না থাকায় খামারের বৈদ্যুতিক ফ্যান চালাতে পারছেন না। ফলে প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০টি মুরগি মারা যাচ্ছে।

হাসপাতালও এই সংকটের বাইরে নয়। সিলেটের একটি হাসপাতালে প্রায় প্রতি ঘণ্টায় বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। জেনারেটরের সাহায্যে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) চালু রাখা গেলেও ওয়ার্ডে পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা সবসময় করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে গরমের মধ্যে ঘিঞ্জি কক্ষে রোগীদের থাকতে হচ্ছে।

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা সংকট সমাধানের চেষ্টা করছে। ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) ফজলুল হক জানান, একটি অচল এলএনজি টার্মিনাল মেরামতের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এটি সচল হলে আরও বেশি এলএনজি ট্যাংকার থেকে গ্যাস খালাস করা সম্ভব হবে।

তবে ব্যবসায়ী এহসানসহ কেউ কেউ জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে গ্যাস সরবরাহ কিছুটা বাড়ায় পরিস্থিতির সামান্য উন্নতি তারা লক্ষ্য করেছেন।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের মতো পাকিস্তানেও গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।