র‌্যাবের লোগো বদলাতেই যদি কষ্ট লাগে, আচরণ বদলাবে কীভাবে?

র‌্যাবের লোগো বদলাতেই যদি কষ্ট লাগে, আচরণ বদলাবে কীভাবে?

ফন্ট সাইজ:

‘র‌্যাব থেকে এসআরবি-নামটা বদলেছে, কালার-লোগো সবই আগের মতো!’ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন মন্তব্য ঘুরছে। কেউ এটিকে রসিকতা হিসেবে দেখছেন, কেউ দেখছেন একটি গুরুতর প্রশ্নের প্রতীক হিসেবে। নাম বদলেছে, কিন্তু প্রথম দিনের দৃশ্যমান পরিচয়ে পুরোনো ছাপ রয়ে গেছে, তাহলে কি বদলটা শুধু নামেই?

প্রশ্নটি ছোট। কিন্তু এর ভেতরে লুকিয়ে আছে রাষ্ট্রীয় বাহিনী সংস্কারের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। একটি বাহিনীর নাম বদলানো যায় গেজেটে। কিন্তু তার আচরণ বদলাতে লাগে আইন, সংস্কার, জবাবদিহি এবং সময়।

১৫ সেপ্টেম্বর ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন আইন, ২০২৬’ গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়েছে। এর পরদিন, ১৬ সেপ্টেম্বর থেকে র‌্যাবের পরিবর্তে এসআরবি নামে কার্যক্রম শুরু হয়েছে। বাহিনী প্রধান আহসান হাবীব পলাশ জানিয়েছেন, নতুন নামেই সব কার্যক্রম শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে লোগো, পতাকা, মনোগ্রাম ও ইউনিফর্ম পরিবর্তনের প্রক্রিয়া চলছে; অনুমোদনের পর সেগুলো পরিবর্তন করা হবে। অর্থাৎ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে পুরোনো নকশা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, সেটিই যে এসআরবির চূড়ান্ত পরিচয়, তা বলা যাচ্ছে না। কিন্তু এখানেই আসল প্রশ্ন আরও বড় হয়ে ওঠে। লোগো বদলাবে। কিন্তু প্রতিষ্ঠান কতটা বদলাবে?

র‌্যাবের বিলুপ্তি কোনো হঠাৎ সিদ্ধান্ত নয়। প্রায় দুই দশকের কর্মকাণ্ড, সাফল্য, বিতর্ক এবং গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের দীর্ঘ ইতিহাসের পর বাহিনীটির বিলুপ্তির দাবি উঠেছে। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক দপ্তরের ২০২৫ সালের অনুসন্ধানেও র‌্যাব বিলুপ্ত করে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনে জড়িত নন এমন সদস্যদের নিজ নিজ বাহিনীতে ফেরত পাঠানোর সুপারিশ করা হয়েছিল। গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনও র‌্যাব বিলুপ্তির সুপারিশ করেছিল।

২০২১ সালের ১০ ডিসেম্বর গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্র র‌্যাবের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। সেই নিষেধাজ্ঞা শুধু একটি বাহিনীর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ ছিল না; বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থায় ক্ষমতা প্রয়োগ ও জবাবদিহি নিয়ে বড় প্রশ্নও সামনে এনেছিল।

এখন সেই ইতিহাসের জায়গায় এসআরবি। সরকারের বক্তব্য, র‌্যাব বিলুপ্ত হয়েছে এবং নতুন আইনি কাঠামোর অধীনে এসআরবি গঠিত হয়েছে। নতুন বাহিনী বাংলাদেশ পুলিশের অধীনে বিশেষায়িত ইউনিট হিসেবে কাজ করবে। সন্ত্রাসবাদ, জঙ্গিবাদ, সংঘবদ্ধ অপরাধসহ গুরুতর অপরাধ মোকাবিলায় এমন একটি বিশেষায়িত সক্ষমতা প্রয়োজনÑএমন যুক্তিও রয়েছে।

অন্যদিকে আপত্তির জায়গাটিও স্পষ্ট। নতুন আইনে র‌্যাবের জনবল, ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব, তহবিল, সম্পদ, স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি, চুক্তি, নথিপত্র, হিসাব ও দায়দায়িত্ব এসআরবিতে হস্তান্তরের বিধান রাখা হয়েছে। এমনকি র‌্যাবের অধীনে চলমান বিভাগীয় ব্যবস্থা ও আদালতের কার্যক্রমও ধারাবাহিকভাবে চলবে। অর্থাৎ পুরোনো প্রতিষ্ঠানের আইনি নাম ও কাঠামো বিলুপ্ত হলেও তার বহু সাংগঠনিক উপাদান নতুন বাহিনীর মধ্যে প্রবেশ করছে।

এই জায়গাটিই সবচেয়ে বেশি আলোচনার দাবি রাখে। কারণ একটি প্রতিষ্ঠান ভেঙে তার জনবল, সম্পদ, নথি, অবকাঠামো ও দায়দায়িত্ব অন্য প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তর করলে প্রশ্ন উঠবেই পরিবর্তনটি ঠিক কোথায়? এ প্রশ্নের উত্তর সরকারকে কাজের মাধ্যমে দিতে হবে। শুধু নতুন নাম দিয়ে নয়।

এখানে অবশ্যই একটি ভারসাম্য দরকার। একই জনবল বা অবকাঠামো নতুন প্রতিষ্ঠানে থাকলেই প্রতিষ্ঠানটি অপরিবর্তিত, এমন সিদ্ধান্তও এখনই দেওয়া যায় না। কোনো বিশেষায়িত বাহিনীর অভিজ্ঞ জনবল, প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ ও সক্ষমতা একদিনে বাতিল করে দেওয়া বাস্তবসম্মত নাও হতে পারে। আসল বিষয় হলো, সেই সক্ষমতা কোন নিয়মে ব্যবহার করা হচ্ছে। এটাই এসআরবির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

র‌্যাবের সময় যে অভিযোগগুলো উঠেছে, এসআরবি কি সেগুলো থেকে শিক্ষা নেবে? একজন নাগরিককে গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে তার অধিকার কতটা নিশ্চিত হবে? অভিযানে বলপ্রয়োগের সীমা কীভাবে নির্ধারিত হবে? কোনো অভিযানে মৃত্যু বা গুরুতর আহতের ঘটনা ঘটলে তদন্ত করবে কে? বাহিনীর কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠলে তদন্ত কতটা স্বাধীন হবে? অভিযোগকারী কি প্রতিশোধের ভয় ছাড়াই অভিযোগ করতে পারবেন? এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি? এসব প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে এসআরবি আসলে কতটা নতুন।

নতুন আইনে অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থার কথা রাখা হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকেও স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, সততা ও পেশাদারিত্বের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এগুলো গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। কিন্তু কোনো প্রতিষ্ঠানে অভিযোগ কমিটি থাকলেই জবাবদিহি প্রতিষ্ঠিত হয় না।

জবাবদিহির আসল পরীক্ষা হয় যখন অভিযোগটি নিজের লোকের বিরুদ্ধে ওঠে। সেই পরীক্ষায় তদন্ত কতটা স্বাধীন, সিদ্ধান্ত কতটা কার্যকর এবং শাস্তি কতটা নিশ্চিত, সেটিই দেখতে হবে।

একই কথা মানবাধিকার প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। সদস্যদের প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন। কিন্তু প্রশিক্ষণের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো কমান্ড সংস্কৃতি। একজন সদস্য যদি জানেন যে আইন ভাঙলে তার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা হবে, তাহলে নিয়ম মানার প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশ তৈরি হয়। আর যদি তিনি মনে করেন ক্ষমতার কারণে জবাবদিহি এড়ানো সম্ভব, তাহলে সবচেয়ে ভালো প্রশিক্ষণও অকার্যকর হয়ে যেতে পারে।

তাই এসআরবির সংস্কারকে শুধু পোশাক, লোগো বা নাম পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। সংস্কার মানে ক্ষমতার সঙ্গে নিয়ন্ত্রণের ভারসাম্য তৈরি করা।

রাষ্ট্রের একটি দক্ষ বিশেষায়িত বাহিনী দরকার হতে পারে। সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ ও সংঘবদ্ধ অপরাধ মোকাবিলায় দ্রুত ও পেশাদার সক্ষমতার প্রয়োজনও অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু সেই প্রয়োজনের সঙ্গে নাগরিক অধিকারও সমান গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রের হাতে শক্তি থাকবে, কিন্তু সেই শক্তি আইনের অধীন থাকবে। এটাই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মৌলিক শর্ত। এসআরবি তাই শুধু একটি নতুন বাহিনী নয়; এটি পুরোনো অভিজ্ঞতা থেকে নতুন শিক্ষা নেওয়ার সুযোগও। র‌্যাবের যে সক্ষমতা কার্যকর ছিল, তা ধরে রেখে যে জায়গাগুলোতে গুরুতর অভিযোগ ও আস্থার সংকট তৈরি হয়েছিল, সেখানে নতুন মানদণ্ড তৈরি করা সম্ভব।

প্রশ্ন হলো, সেই কাজটি কতটা করা হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ‘কালার-লোগো সবই আগের মতো’ মন্তব্যটি তাই নিছক হাসির বিষয় হিসেবে উড়িয়ে দেওয়া ঠিক হবে না। কারণ এর মধ্যে জনগণের প্রত্যাশার একটি প্রতিফলন আছে।

মানুষ শুধু নতুন সাইনবোর্ড দেখতে চায় না। মানুষ দেখতে চায় নতুন আচরণ। তবে একই সঙ্গে এটিও মনে রাখা দরকার এসআরবি যাত্রা শুরুর প্রথম দিনেই তাকে র‌্যাবেরই পুনরাবৃত্তি বলে চূড়ান্ত রায় দেওয়া যেমন তাড়াহুড়া হবে, তেমনি নতুন নাম এসেছে বলে অতীতের সব প্রশ্ন মুছে গেছে, এমন ধারণাও বাস্তবসম্মত নয়।

প্রমাণ আসবে সময়ের সঙ্গে। প্রথম বড় অভিযানে। প্রথম বড় অভিযোগে। প্রথম বিতর্কিত গ্রেপ্তারে। প্রথম গুরুতর মানবাধিকার অভিযোগে।আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, বাহিনীর কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠলে প্রতিষ্ঠানটি কী করে সেখানেই। কারণ লোগো মানুষের চোখে পড়ে। আচরণ মানুষের মনে থাকে।

র‌্যাবের জায়গায় এসআরবি লেখা হয়েছে। নতুন লোগোও আসবে। নতুন ইউনিফর্ম আসবে। নতুন পরিচয় তৈরি হবে। কিন্তু একটি বাহিনীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় কোনো প্রতীকে নয়। একজন সাধারণ নাগরিকের সঙ্গে তার আচরণেই সেই পরিচয় লেখা থাকে।

তাই আজকের সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন র‌্যাবের নাম বদলে এসআরবি হয়েছে। এবার কি ক্ষমতা প্রয়োগের সংস্কৃতিও বদলাবে? নাম বদলাতে গেজেট লাগে। লোগো বদলাতে নকশা লাগে।কিন্তু আচরণ বদলাতে লাগে সংস্কার। আর জনগণের আস্থা ফেরাতে লাগে সেই সংস্কারের প্রমাণ।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট
E-mail: [email protected]