হুতির হামলা ৪৭ বছর আগের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়

হুতির হামলা ৪৭ বছর আগের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়

ফন্ট সাইজ:

ইয়েমেনের হুতিরা পবিত্র নগরীর আশপাশে ড্রোন হামলা চালানোর পর উচ্চ সতর্কতা জারি করেছে সৌদি আরব। তারা বলেছে, পবিত্র দুই নগরী মক্কা ও মদিনা এবং তার সঙ্গে হজযাত্রী বা ওমরাহযাত্রীরা যেসব স্থানে থাকবেন, সেখানে রেড লাইন ঘোষণা করা হয়েছে। অর্থাৎ ওটা হবে শেষ সীমা। এর প্রায় ৪৭ বছর আগে ১৯৭৯ সালের ২০শে নভেম্বরে একই রকম সতর্কতা জারি করা হয়েছিল। ওইদিন ৬০০ সশস্ত্র ব্যক্তি ইসলামের পবিত্রতম স্থান অবরোধ করে। পরে গ্যাস ব্যবহার করে তাদের বের করা হয়। আধুনিক সৌদি আরবের ইতিহাসে এটি ছিল সবচেয়ে বিস্ময়কর ঘটনাগুলোর একটি। এ বিষয়ে অনলাইন এনডিটিভিতে প্রতিবেদন লিখেছেন মোহাম্মদ আসিম। তিনি লিখেছেন, ২০২৬ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার কয়েকটি উত্তেজনাপূর্ণ মুহূর্তের জন্য পবিত্র নগরী মক্কায় জরুরি সতর্কতা জারি করা হয়। ইয়েমেনের হুতিদের হামলা বাড়তে থাকায় সম্ভাব্য বিপদের বিষয়ে পবিত্র নগরীর বাসিন্দাদের সতর্ক করে সৌদি আরব। পরে সেই সতর্কতা প্রত্যাহার করা হয়। বুধবার সৌদি কর্তৃপক্ষ জানায়, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মক্কার দক্ষিণে একটি হুতি ড্রোন শনাক্ত করে ধ্বংস করেছে। ড্রোনটি পবিত্র নগরীর ওপর নির্ধারিত নিষিদ্ধ আকাশসীমায় প্রবেশের আগেই ধ্বংস করা হয়।

সৌদি কর্মকর্তারা দুই পবিত্র মসজিদ ও ওমরাহ যাত্রীদের নিরাপত্তাকে ‘রেড লাইন’ বা চূড়ান্ত সীমারেখা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে হুতিরা মক্কাকে লক্ষ্যবস্তু করার কথা অস্বীকার করেছে। প্রায় ৪৭ বছর আগে ১৯৭৯ সালের ২০শে নভেম্বর সশস্ত্র একটি গোষ্ঠী গ্র্যান্ড মসজিদ দখল করে নেয়। মসজিদুল হারামে ফজরের নামাজের পরপরই ঘটনাটি ঘটে। কাবাকে ঘিরে থাকা গ্র্যান্ড মসজিদে তখন হাজার হাজার মুসল্লি সকালের নামাজ আদায় করতে জড়ো হন। হঠাৎ সেখানে হট্টগোল শুরু হয়। এরপর শোনা যায় প্রথম গুলির শব্দ। সৌদি ন্যাশনাল গার্ডের ৪০ বছর বয়সী সাবেক করপোরাল ও ধর্মীয় প্রচারক জুহাইমান আল-উতাইবি ইমামকে সরিয়ে দিয়ে মাইক্রোফোনের নিয়ন্ত্রণ নেন। বেশিরভাগ মুসল্লিই বুঝতে পারেননি কী ঘটছে। জুহাইমান ও তার অনুসারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৬০০। তারা দ্রুত বিশাল মসজিদ কমপ্লেক্সের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়ে।

তারা কফিনের ভেতর করে মসজিদে অস্ত্র পাচার করে। মৃতদের জন্য দোয়া ও আশীর্বাদ চাওয়ার প্রচলিত জানাজার রীতির অংশ হিসেবে কফিনগুলো আনা হয়েছে, এমনটাই দেখানো হয়েছিল। কিন্তু কফিন খোলার পর দেখা যায়, সেগুলোর ভেতরে আগ্নেয়াস্ত্র। এসব অস্ত্র পরে বিদ্রোহীদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। গ্র্যান্ড মসজিদ দখল হয়ে যায়। বিদ্রোহীদের একজন প্রস্তুত করা একটি বিবৃতি পড়তে শুরু করেন। এতে ইসলামী ঐতিহ্যে আগমনের ভবিষ্যদ্বাণী করা ঐশীভাবে পরিচালিত ব্যক্তি- ‘মাহদি’র আগমনের ঘোষণা দেয়া হয়। তিনি ঘোষণা করেন, ‘মাহদি এসে গেছেন।’

বিদ্রোহীরা জুহাইমানের ভগ্নিপতি মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল-কাহতানিকে মাহদি হিসেবে ঘোষণা করে। সৌদি আরবে ব্যাপক পরিবর্তনের এক গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এই বিদ্রোহের ঘটনা ঘটে। তেলসম্পদ দেশটির অর্থনীতিকে আমূল বদলে দিয়েছিল। দ্রুত আধুনিকায়ন, নতুন অবকাঠামো এবং পশ্চিমা প্রভাবও বাড়ছিল। জুহাইমান ও তার অনুসারীরা সৌদি রাজপরিবারের বিরুদ্ধে ইসলামী নীতি পরিত্যাগের অভিযোগ আনেন। তারা রাজপরিবারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও ধর্মীয় বিচ্যুতির অভিযোগও করেন। তাদের বক্তব্য এবং পরবর্তী বিভিন্ন বিবরণ অনুযায়ী, তাদের লক্ষ্য ছিল সৌদি রাজতন্ত্রকে চ্যালেঞ্জ করা এবং তারা যে ‘আরও বিশুদ্ধ’ ইসলামী ব্যবস্থা মনে করতেন, তা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। সৌদি কর্তৃপক্ষ এই হামলার জন্য প্রস্তুত ছিল না।

কাবা মুক্ত করার লড়াই

গ্র্যান্ড মসজিদের ভেতরে সশস্ত্র দখলদারির ধারণাটিই ছিল প্রায় অকল্পনীয়। পবিত্র এলাকায় অস্ত্র বহন নিষিদ্ধ ছিল এবং মসজিদ কমপ্লেক্সে মোতায়েন নিরাপত্তাকর্মীরা ছিলেন হালকা অস্ত্রে সজ্জিত। বিদ্রোহীরা দ্রুত কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানগুলো দখল করে নেয়। এর মধ্যে ছিল মসজিদের মিনার, বিভিন্ন কক্ষ, করিডর এবং ভূগর্ভস্থ এলাকা। এসব অবস্থান থেকে তারা মসজিদ পুনর্দখলের প্রথম দফার সৌদি নিরাপত্তা বাহিনীর প্রচেষ্টা প্রতিহত করতে সক্ষম হয়। মসজিদের চারপাশে নিরাপত্তাবেষ্টনী গড়ে তোলা হয়। বিশেষ বাহিনী ও সামরিক ইউনিট মোতায়েন করা হয়।

কিন্তু বড় একটি বাধা ছিল। ইসলামী আইনে মক্কার পবিত্র এলাকায় লড়াইয়ের ওপর বিশেষ বিধিনিষেধ রয়েছে। অবশেষে সৌদি আরবের শীর্ষ ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ বিদ্রোহীদের উৎখাতে শক্তি প্রয়োগের অনুমতি দিয়ে ধর্মীয় ফতোয়া জারি করে। এরপর লড়াই আরও তীব্র হয়। সৌদি বাহিনী মসজিদ কমপ্লেক্সের ভেতরে ঢুকে একের পর এক অংশ পুনর্দখল করতে থাকে। কিন্তু বিদ্রোহীরা মসজিদের নিচে থাকা বিস্তৃত কক্ষ, সেল ও ভূগর্ভস্থ পথের নেটওয়ার্কে আশ্রয় নেয়।

অবরোধ প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে চলে। অবশেষে সৌদি আরব বাইরের সহায়তা চায়। ফ্রান্স গোপনে বিশেষজ্ঞদের একটি ছোট দল পাঠায়। তারা ভূগর্ভস্থ এলাকাগুলো কীভাবে খালি করা যায়, সে বিষয়ে পরিকল্পনা তৈরিতে সহায়তা করে। চূড়ান্ত অভিযানে বিদ্রোহীরা যে ভূগর্ভস্থ এলাকায় লুকিয়ে ছিল, সেখানে গ্যাস প্রবেশ করানো হয়। ভূগর্ভস্থ কমপ্লেক্সে ছিদ্র করে সেসব পথ দিয়ে গ্যাস ঢোকানো হয়েছিল। অবশেষে এই অভিযান বিদ্রোহীদের প্রতিরোধ ভেঙে দেয়।

১৯৭৯ সালের ৫ ডিসেম্বর ভোররাতের দিকে জুহাইমান ও বাকি বিদ্রোহীরা আত্মসমর্পণ করে। প্রায় ৬০০ সদস্য নিয়ে শুরু হওয়া বাহিনীটি তখন ১০০ জনের কিছু বেশি সদস্যে নেমে এসেছিল। জুহাইমানকে জীবিত অবস্থায় আটক করা হয়। ১৯৮০ সালের ৯ জানুয়ারি তাকে এবং আটক করা আরও ৬২ জন বিদ্রোহীকে মক্কা ও মদিনাসহ সৌদি আরবের বিভিন্ন শহরে প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় একই সময়ে এসব মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।