কূটনৈতিক টানাপড়েন: পরবর্তী হাইকমিশনার ইস্যু ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে আরেকটি জটিলতা

কূটনৈতিক টানাপড়েন: পরবর্তী হাইকমিশনার ইস্যু ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে আরেকটি জটিলতা

ফন্ট সাইজ:

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে নানা বিষয়ে টানাপড়েন চলছে। তার ওপর যুক্ত হয়েছে নয়া দিল্লিতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়ামকে বাংলাদেশের পরবর্তী হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেয়ার ইস্যু। ভারত তাকে অনুমোদন দেয়নি। ফলে এরই মধ্যে টানাপড়েনের সম্পর্কে এই ইস্যু আরেকটি জটিলতা সৃষ্টি করেছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন এনডিটিভি। এতে বলা হয়, এক মাসেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। কিন্তু বাংলাদেশের পরবর্তী হাইকমিশনার হিসেবে ঢাকার মনোনীত প্রার্থীকে এখনও অনুমোদন দেয়নি ভারত। সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের সম্পর্ক যখন নানা টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন এটি সেই সম্পর্কে নতুন করে দেখা দেয়া আরেকটি জটিলতা।

বাংলাদেশ তার পরবর্তী হাইকমিশনার হিসেবে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়ামকে পাঠাতে চায়। তবে তাকে নিয়োগ দেওয়ার আগে ভারতের কাছ থেকে ‘অ্যাগ্রিমো’ নিতে হবে। অর্থাৎ, স্বাগতিক দেশ হিসেবে ভারতকে আনুষ্ঠানিকভাবে ওই নিয়োগে সম্মতি দিতে হবে। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত সেই অনুমোদন পাওয়া যায়নি।

উল্লেখ্য, সিয়াম একজন পেশাদার কূটনীতিক হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছেন। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গত বছর তিনি পররাষ্ট্র সচিবের দায়িত্ব নেন। এর আগে তিনি ওয়াশিংটনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ছিলেন। তবে ভারতের অনুমোদন ছাড়া নয়াদিল্লিতে নতুন দায়িত্বে তার নিয়োগ আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর করতে পারবে না ঢাকা।

এর মধ্যে সময়টিও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের বর্তমান হাইকমিশনার এম. রিয়াজ হামিদুল্লাহর মেয়াদ শেষ হওয়ার পথে। অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে জেনেভায় যাওয়ার কথা রয়েছে তার। সেখানে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে নতুন দায়িত্ব নেবেন তিনি। ফলে নয়াদিল্লিতে তার জায়গায় নতুন হাইকমিশনার নিয়োগ করা প্রয়োজন এবং সেটি দ্রুতই করতে হবে।

কূটনৈতিক সম্পর্কবিষয়ক ভিয়েনা কনভেনশন অনুযায়ী, কোনো দেশ নিজের পছন্দের রাষ্ট্রদূত বা হাইকমিশনারকে অন্য দেশে সরাসরি নিয়োগ দিতে পারে না। যে দেশে তাকে পাঠানো হবে, সেই দেশকে আগে তার নিয়োগ অনুমোদন করতে হয়। তবে বিষয়টি হলো, স্বাগতিক দেশ কোনো প্রার্থীকে অনুমোদন না করলে এর কারণ জানানো বাধ্যতামূলক নয়। এমনকি কোনো দেশ চাইলে এ বিষয়ে নীরবও থাকতে পারে। বেশির ভাগ দেশই পুরো প্রক্রিয়াটি নীরবে সম্পন্ন করে। কারণ কোনো ব্যক্তিগত কূটনৈতিক জটিলতা প্রকাশ্যে এনে দুই দেশের মধ্যে নতুন বিরোধ তৈরি করতে চায় না কেউই।

সুতরাং কারও নিয়োগের অনুমোদন না দেয়া মানেই আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাখ্যান করা নয়। কিন্তু বর্তমানে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে চলমান অন্যান্য ঘটনাপ্রবাহের পরিপ্রেক্ষিতে নয়াদিল্লির এই নীরবতা নিয়ে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব নেয়ার পর দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন করে মোড় পরিবর্তনের আশা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে সেই আশাবাদ দ্রুতই ম্লান হয়ে গেছে। আগস্টে তারেক রহমানের নয়াদিল্লি সফরে যাওয়ার কথা ছিল। শেষ মুহূর্তে সেই সফর বাতিল হয়ে যায়। এ ছাড়া বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক আঞ্চলিক জোট বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস নেতাদের সম্মেলনে যোগ দেয়ার জন্যও তাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল ভারত। তিনিও সেই সম্মেলনে যোগ দেননি। তার পরিবর্তে বাংলাদেশ থেকেও কাউকে পাঠানো হয়নি।
এমনকি দিল্লিতে বাংলাদেশের দায়িত্বপ্রাপ্ত বর্তমান হাইকমিশনার হামিদুল্লাহও ওই সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন না। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ঘিরে নতুন করে তৈরি হওয়া উত্তেজনা। ২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর শেখ হাসিনা ভারতে চলে যান এবং এরপর থেকে সেখানেই অবস্থান করছেন।

তবে দুই দেশের সম্পর্ক পুরোপুরি স্থবির হয়ে যায়নি। শীর্ষ রাজনৈতিক পর্যায়ে টানাপড়েন থাকলেও নিচের স্তরে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে। গত সপ্তাহেই দুই দেশের কর্মকর্তারা ঢাকায় বৈঠক করেছেন। দুই দিনব্যাপী ওই বৈঠকে রেল যোগাযোগ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে সীমান্তপারের ট্রেন চলাচলের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন কর্মকর্তারা। গত সাত মাসের মতো সময়ে দুই দেশের বেশ কয়েকটি কারিগরি ওয়ার্কিং গ্রুপও আবার সক্রিয় হয়েছে এবং কাজ শুরু করেছে। এ থেকে বোঝা যায়, রাজনৈতিক পর্যায়ে যা-ই ঘটুক না কেন, দুই সরকারই দৈনন্দিন সহযোগিতার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো সচল রাখতে আগ্রহী।

চলতি বছরের শুরুতে সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী দীনেশ ত্রিবেদীকে ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেয় নয়াদিল্লি। জুনের শেষ দিকে তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তার বর্তমান পদমর্যাদা মন্ত্রিসভার সমমর্যাদার করা হয়েছে। অন্তত আনুষ্ঠানিকভাবে এটি বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে ভারত কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে, তার একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

২০২৪ সালে শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বড় ধরনের অবনতি ঘটে। এরপর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের দিকে আরও বেশি ঝুঁকে পড়ে। বিষয়টি নয়াদিল্লিতে ভালোভাবে নেয়া হয়নি। তারেক রহমান ক্ষমতায় আসার পর দুই দেশের সম্পর্ক নতুন করে স্বাভাবিক করার বিষয়ে আশাবাদ তৈরি হয়েছিল। কিছু অগ্রগতিও হয়েছিল। কিন্তু পুরোনো উত্তেজনা ও রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা দুই দেশের সম্পর্ককে স্থিতিশীলতার দিকে এগিয়ে নেয়ার পথে এখনও বাধা হয়ে আছে।

শুধু গত এক মাসেই ভারত তারেক রহমানকে দুটি পৃথক আমন্ত্রণ জানিয়েছে। একটি ছিল রাষ্ট্রীয় সফরের জন্য, অন্যটি ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দেয়ার জন্য। কিন্তু কোনোটিই বাস্তবায়িত হয়নি। এর মধ্যে বাংলাদেশের মনোনীত পরবর্তী হাইকমিশনার আসাদ আলম সিয়ামের নিয়োগে ভারতের অনুমোদন ঝুলে থাকায় দুই দেশের সম্পর্কের জটিলতায় আরও একটি নতুন প্রশ্ন যুক্ত হলো। দুই দেশ এখনও কারিগরি বৈঠক ও বিভিন্ন ওয়ার্কিং গ্রুপের মাধ্যমে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছে। কিন্তু বাংলাদেশের মনোনীত শীর্ষ কূটনৈতিক প্রতিনিধিকে নয়াদিল্লি এখনও অনুমোদন না দেয়ার বিষয়টি দুই দেশের সম্পর্কের বর্তমান দূরত্ব নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে।