নির্বাচন কমিশন (ইসি) ও স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীর পরস্পরবিরোধী মন্তব্যে সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। পরস্পরবিরোধী মন্তব্যের কারণে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতাহীন ও নতজানু ভূমিকার তীব্র প্রতিবাদ, ক্ষোভ ও নিন্দা জানিয়েছে এনসিপি। একই সঙ্গে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়েও উদ্বেগ ও শঙ্কা প্রকাশ করেছে দলটি। মঙ্গলবার এক যৌথ বিবৃতিতে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও সদস্য সচিব আখতার হোসেন উদ্বেগের বিষয়টি জানান।
যৌথ বিবৃতিতে তারা বলেন, নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সাতটি ধাপের সম্ভাব্য তারিখ ঘোষণার পরপরই স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেছেন, ‘এ ব্যাপারে সরকার কিছু জানে না এবং সরকারের সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়নি।’
তদুপরি, সরকারের এই বক্তব্যের পর নির্বাচন কমিশন সচিব আখতার আহমেদ গণমাধ্যমে প্রকাশ্যে বলেন, ‘প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য শিরোধার্য, এ বিষয়ে পাল্টা মন্তব্য করার ধৃষ্টতা দেখাবো না।’ এই বক্তব্য নির্বাচন কমিশনের চরম মেরুদণ্ডহীনতা ও পরাধীনতাকেই উন্মোচিত করেছে বলে মন্তব্য করেন এনসিপি নেতারা।
নেতৃবৃন্দ বলেন, একটি স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব সিদ্ধান্ত ও অবস্থান থাকবে-এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যকে ‘শিরোধার্য’ মেনে ইসি সচিবের চুপসে যাওয়া প্রমাণ করে, কমিশন আজ সংবিধান প্রদত্ত স্বাধীন ভূমিকা প্রয়োগ করতে পারছে না এবং এটি পুরোপুরি সরকারের আজ্ঞাবহ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।
তারা বলেন, সরকারের প্রভাবে ও চাপে পড়ে নির্বাচন কমিশন একেক সময় একেক রকম কথা বলে চরম খামখেয়ালিপনা প্রদর্শন করছে, যা নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের ন্যূনতম গ্যারান্টিও ধ্বংস করে দিচ্ছে।
বিবৃতিতে এনসিপি নেতৃবৃন্দ তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, নির্বাচিত হয়ে এসে বর্তমান সরকার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার বদলে উল্টো দলীয়করণের দিকে মনোযোগ দিয়েছে। ইসিকে পকেটে পুরে ও নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে নির্বাচন পরিচালনার এই অপচেষ্টা মূলত ফ্যাসিবাদী কায়দায় ক্ষমতার লালসা ও অগণতান্ত্রিক চর্চারই স্পষ্ট বহিঃপ্রকাশ।
এর মধ্যে সরকার তাদের দলের নির্বাচনী কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিকে কমিশনের অতিরিক্ত সচিব হিসেবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়ে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে দলীয় আজ্ঞাবহ প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে উদ্যত হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন এনসিপি নেতারা।
এনসিপি জানায়, নির্বাচন কমিশনকে অবিলম্বে সরকারি প্রভাব ও হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীন ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। সরকারি নির্বাহী বিভাগের সামনে নতি স্বীকার করে ইসির মর্যাদা ক্ষুণ্ন করার অপরাধে কমিশনের এমন অপেশাদার অবস্থানের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দেশবাসীর সামনে তুলে ধরতে হবে।
ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে নির্বাচন কমিশনসহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নির্বাহী বিভাগের অবৈধ প্রভাব বিস্তার ও অগণতান্ত্রিক হস্তক্ষেপ অবিলম্বে বন্ধ করারও দাবি জানিয়েছে দলটি।
নেতৃবৃন্দ হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর নতুনভাবে গণতান্ত্রিক যাত্রা শুরু হওয়া রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় কোনো মেরুদণ্ডহীন ও সরকারি ক্যাডারতন্ত্রের আজ্ঞাবহ নির্বাচন কমিশনকে জনগণ মেনে নেবে না।
সরকার যদি নির্বাচন কমিশনকে নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে না দেয় এবং প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজের ইচ্ছামতো পরিচালিত করতে অগণতান্ত্রিক পথে হাঁটে, তাহলে এনসিপি দেশের আপামর জনগণকে সঙ্গে নিয়ে রাজপথে কঠোর প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তুলবে।
