আবারো অপরাধ জগতে ফিরে যাচ্ছে এক সময়ের সন্ত্রাসের জনপদখ্যাত জেলা ফেনী। প্রতিদিনই জেলার কোনো না কোনো এলাকায় অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। চুরি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, ডাকাতি, খুন, ধর্ষণ ও মাদকসহ নানা ধরনের অপরাধ থামাতে হিমশিম খাচ্ছে প্রশাসনও। জেলা পুলিশের পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত প্রথম আট মাসেই জেলায় বিভিন্ন অপরাধ ও ঘটনায় নথিভুক্ত হয়েছে এক হাজার ১৯১টি মামলা। আর বেসরকারি হিসেবে এসব ঘটনার সংখ্যা অন্তত দেড় হাজার। সবচেয়ে বেশি ঘটনা ফেনী সদর উপজেলায়। অভিযোগ করেও কাঙ্ক্ষিত প্রতিকার না পাওয়ার অভিযোগে পুলিশের কাছে যেতে আগ্রহ হারাচ্ছেন অনেক ভুক্তভোগী। এতে অপরাধীরা আরও উৎসাহিত হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। সবশেষ ১৩ই সেপ্টেম্বর দুপুরে ফেনী শহরের পুলিশ কোয়ার্টার এলাকায় একটি বাসায় চুরির ঘটনা ঘটেছে। এতে চার ভরি সোনা ও ৭০ হাজার টাকা নিয়ে গেছে দুর্বৃত্তরা।
এর আগে ১২ই সেপ্টেম্বর রাতভর ফেনী সদর উপজেলার মধ্য ধলিয়া গ্রামে ৫ বাড়িতে গণডাকাতি হয়েছে। এ সময় দুল নিতে এক গৃহবধূর কান কেটে নিয়ে গেছে ডাকাতরা। গত ৫ই সেপ্টেম্বর রাতে দাগনভূঞায় স্বামীকে আটক রেখে নারীকে বিবস্ত্র করে শ্লীলতাহানি করেছে দুর্বৃত্তরা। একইদিন পুলিশ পরিচয়ে সাধারণ মানুষের মোবাইল ফোন তল্লাশি ও হয়রানির অভিযোগে তিন যুবককে আটক করে পুলিশ। ছাগলনাইয়ায় উপজেলার মহামায়া ইউনিয়নের উত্তর যশপুর গ্রাম থেকে স্থানীয়দের সহায়তায় তাদের আটক করা হয়। ১৯শে আগস্ট সকালে ফেনী শহরতলির মহিপালে আজিজ আহমদ সড়কের রেহান ম্যানশনের দ্বিতীয় তলায় প্রবাসী মোহাম্মদ নুরুজ্জামানের বাসায় দুর্ধর্ষ ডাকাতি হয়। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, বাসায় ঢোকার পর দুই ব্যক্তি অস্ত্রের মুখে গৃহবধূকে জিম্মি করে নগদ ১০ লাখ ৬০ হাজার টাকা ও ১৪ ভরি স্বর্ণালঙ্কার নিয়ে পালিয়ে যায়। ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে একজনকে গ্রেপ্তার করা হলেও, লুট হওয়া টাকা ও স্বর্ণালঙ্কার উদ্ধার না হওয়ায় ক্ষোভ জানিয়েছেন ভুক্তভোগীর পরিবার। শুধু এই ডাকাতির ঘটনাই নয়, ফেনী শহর থেকে উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকাতেও চাঁদাবাজি, চুরি, ছিনতাই, মাদক ও সহিংস অপরাধ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে।
ভুক্তভোগীদের অনেকের অভিযোগ, ঘটনার পর থানায় অভিযোগ করেও দ্রুত ও দৃশ্যমান প্রতিকার মিলছে না। পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের অপরাধ শাখার মাসিক পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে জেলা সদরসহ ছয় উপজেলায় অপরাধ ও ঘটনায় নথিভুক্ত হয়েছে মোট এক হাজার ১৯১টি ঘটনা। এর মধ্যে মাদক সংক্রান্ত ঘটনা ৩০০টি। নারী ও শিশু নির্যাতন ১৪০টি, চুরি ১১৪টি, সড়ক দুর্ঘটনা ৫৫টি, খুন ১৮টি। চোরাচালান ১৮টি, দস্যুতা ১৬টি, অস্ত্র ৫টি। আর ডাকাতির ঘটনায় নথিভুক্ত হয়েছে ৩টি। এ ছাড়া, অন্যান্য অপরাধ ও ঘটনায় নথিভুক্ত হয়েছে আরও ৫২২টি। উপজেলাভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি ঘটনা ঘটেছে ফেনী সদরে ৫৫৬টি। এরপর ছাগলনাইয়ায় ১৯৩, দাগনভূঞায় ১৬৩, সোনাগাজীতে ১৫৫, ফুলগাজীতে ৭৮ এবং পরশুরামে ৪৬টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এদিকে, জেলা জুড়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত পুলিশের বিশেষ অভিযানে ১লা সেপ্টেম্বর থেকে ১০ দিনে ১৯৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। জেলা জজ আদালতের আইনজীবী মেজবাহ উদ্দিন ভূঁঞা বলেন, পুলিশের কার্যকর ভূমিকার ঘাটতি এবং দীর্ঘদিন স্থানীয় পর্যায়ে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি না থাকায় অপরাধীরা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। এদিকে, জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) সাইফুল ইসলাম বলেন, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত অভিযান ও নজরদারি অব্যাহত রয়েছে।
