সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ একটি তেল পাইপলাইন বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ নিয়ে নির্ধারিত বৈঠক স্থগিত হওয়ায় সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বড় ধরনের লাফ দিয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে জ্বালানি বাজারেও।
এনবিসি নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দাম পৌঁছেছে সর্বকালের সর্বোচ্চ পর্যায়ে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের দাম সোমবার একপর্যায়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৮ ডলারে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেলের দামও ১০৩ ডলার ছাড়িয়ে গেছে।
সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনে হামলার পর সেটি বন্ধ করে দেয়ায় তেলের বাজারে নতুন করে সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সৌদি জ্বালানি মন্ত্রণালয় শুক্রবার জানায়, সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে পাইপলাইনটি বন্ধ করা হয়েছে। তবে এটি কবে আবার চালু হবে, সে বিষয়ে কোনো সময়সীমা জানায়নি দেশটি।
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়ায় পাইপলাইনটির গুরুত্ব আরও বেড়েছে। গত কয়েক দিনে এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে জাহাজ চলাচল দুই অঙ্কে পৌঁছালেও তা স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় খুবই কম।
এরই মধ্যে ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুতিদের দ্রুত অগ্রযাত্রা বাব এল-মান্দেব প্রণালির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত করেছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ দুটি নৌপথ ঘিরেই নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
লয়েডস ব্যাংকের বিশ্লেষকেরা বলেছেন, পাইপলাইনটি কতদিন বন্ধ থাকবে- এটাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ দীর্ঘ সময় এটি বন্ধ থাকলে বৈশ্বিক তেল সরবরাহ ও জ্বালানির দামে এর বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
বাজারে উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরান ও উপসাগরীয় দেশগুলোর বৈঠক স্থগিত হওয়া। সোমবারের জন্য নির্ধারিত বৈঠকটি রোববার বিকেলে স্থগিত করা হয়।
ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এক্সে জানান, ঐকমত্যের স্বার্থে বৈঠকটি পিছিয়ে দেয়া হয়েছে। তেহরান অবশ্য বলেছে, রিয়াদের অনুরোধেই বৈঠকটি স্থগিত করা হয়েছে।
এদিকে সোমবার সৌদি রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, জেদ্দায় মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপারের সঙ্গে বৈঠক করেছেন সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলও এখনো যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় সামান্যই। মেরিনট্রাফিকের তথ্য অনুযায়ী, রোববার মাত্র ১৪টি জাহাজ প্রণালিটি অতিক্রম করেছে। শনিবার এ সংখ্যা ছিল ১২, শুক্রবার ১১ এবং বৃহস্পতিবার মাত্র ৯টি।
তেলের সরবরাহ নিয়ে এই অস্থিরতার প্রভাব সরাসরি পড়ছে পেট্রোলের দামেও। যুক্তরাষ্ট্রে সোমবার প্রতি গ্যালন সাধারণ আনলেডেড পেট্রোলের জাতীয় গড় দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৩১ ডলারে।
এএএ-এর তথ্য অনুযায়ী, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে দেশটিতে পেট্রোলের গড় দাম ৪৫ শতাংশের বেশি বেড়েছে।
তবে সবচেয়ে বেশি চাপ তৈরি করছে ডিজেলের দাম। সোমবার যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের জাতীয় গড় দাম বেড়ে প্রতি গ্যালন ৬ দশমিক ২৩ ডলারে পৌঁছেছে, যা সর্বকালের সর্বোচ্চ।
ট্রাক, নৌযান ও ট্রেনসহ পণ্য পরিবহনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হওয়ায় ডিজেলের দাম বাড়াকে বিশেষভাবে উদ্বেগজনক হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদেরা। কারণ পরিবহন ব্যয় বাড়লে খাদ্যসহ প্রায় সব ধরনের পণ্যের দামই বেড়ে যেতে পারে।
কেপিএমজির প্রধান অর্থনীতিবিদ ডায়ান সোয়ঙ্ক বলেন, ডিজেলের খরচ প্রায় সবকিছুর মধ্যেই ঢুকে পড়ে। কৃষিকাজ থেকে শুরু করে খাদ্য উৎপাদন এবং দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পণ্য পরিবহন সব ক্ষেত্রেই ডিজেলের দাম বাড়ার প্রভাব পড়ে।
