এবারের ব্রিকস সম্মেলনের অন্যতম আলোচিত দৃশ্য ছিল নরেন্দ্র মোদি, শি জিনপিং ও ভ্লাদিমির পুতিন- তিন নেতার হাসিমুখে করমর্দনের ছবি।বিশ্ব রাজনীতিতে এই ছবিটি ভারত, চীন ও রাশিয়ার ঘনিষ্ঠতার একটি প্রতীকী বার্তা দিচ্ছে।
তবে সম্মেলনের ফাঁকে তোলা আরেকটি ছবি ব্রিকসের কূটনৈতিক গুরুত্বকে আরও স্পষ্ট করেছে। সেখানে মুখোমুখি বসেছিলেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের যুবরাজ শেখ খালেদ বিন মোহাম্মদ বিন জায়েদ।
পশ্চিম এশিয়ায় চলমান সংঘাতের মধ্যে দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ের এই বৈঠক বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
এবিসি নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্রিকসের বর্তমান গুরুত্ব বুঝতে হলে এর পেছনের ইতিহাস জানা দরকার। ২০০৬ সালে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চীনকে নিয়ে ‘ব্রিক’ নামে জোটটির যাত্রা শুরু হয়। পরে দক্ষিণ আফ্রিকা যোগ দিলে নাম হয় ‘ব্রিকস’।
সাম্প্রতিক সম্প্রসারণে ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মিশর, ইথিওপিয়া, সৌদি আরব ও ইন্দোনেশিয়া যুক্ত হয়েছে। বর্তমানে জোটটির সদস্য ১১টি দেশ।
ব্রিকসের অন্যতম লক্ষ্য হলো, পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বাইরে গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর প্রভাব বাড়ানো। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), বিশ্ব ব্যাংক ও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) মতো প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি নিজেদের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সহযোগিতা বাড়াতে চাইছে সদস্যদেশগুলো।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটো বা জি৭-এর মতো ব্রিকস কোনো আদর্শিক জোট নয়। এই জোটের সদস্যদের জাতীয় স্বার্থও অনেক ক্ষেত্রে পরস্পরবিরোধী। ফলে অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য ব্রিকসের অন্যতম বড় দুর্বলতা।
বিশেষ করে পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত সেই বিভাজনকে সামনে এনেছে। ইরানের সঙ্গে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সম্পর্কের টানাপড়েন রয়েছে। আবার ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের হামলাও আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়িয়েছে।
চ্যাথাম হাউজের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক জ্যেষ্ঠ গবেষক চিতিগ বাজপেয়ি বলেন, ব্রিকসের সদস্যদের মধ্যে স্পষ্ট বিভাজন রয়েছে। ভারত ও ব্রাজিল জোটটিকে মূলত অর্থনৈতিক উদ্যোগ হিসেবে দেখতে চায়। অন্যদিকে রাশিয়া ও চীন এটিকে ভূরাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে আগ্রহী
মোদির কূটনৈতিক সাফল্য
এত মতপার্থক্যের মধ্যেও সম্মেলনে ১৪০ দফার একটি যৌথ ঘোষণা সর্বসম্মতভাবে অনুমোদন করানো ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জন্য বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংও সম্মেলন থেকে গুরুত্বপূর্ণ অর্জন নিয়ে ফিরেছেন। যৌথ ঘোষণায় আফ্রিকার ৫০টির বেশি দেশের জন্য চীনের শুল্কমুক্ত বাণিজ্য সুবিধার বিষয়টি স্বীকৃতি পেয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, গ্লোবাল সাউথে চীনের বাণিজ্যিক প্রভাব বাড়ানোর জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ওয়াশিংটনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে শির বৈঠকের কয়েক দিন আগে এমন স্বীকৃতি বেইজিংয়ের জন্য বাড়তি কূটনৈতিক সুবিধা তৈরি করেছে।
পুতিন ও পেজেশকিয়ানের পশ্চিমবিরোধী অবস্থান
ব্রিকস বিজনেস ফোরামে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বিশ্ব অর্থনীতিতে পরিবর্তনের কথা বলেন। ইউক্রেইন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের আরোপ করা নিষেধাজ্ঞারও সমালোচনা করেন তিনি।
পুতিনের বক্তব্যের সময় উপস্থিত ব্যক্তিদের করতালি ও উচ্ছ্বাস ছিল লক্ষণীয়। এতে বোঝা যায়, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও রাশিয়া গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর একটি অংশের সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।
একই ফোরামে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সমালোচনা করেন। বেসামরিক মানুষ ও অবকাঠামোতে হামলার অভিযোগ তুলে তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলকে ‘সন্ত্রাসী’ বলে আখ্যা দেন।
যে ছবিটি সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ
তবে ব্রিকস সম্মেলনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ মুহূর্তগুলোর একটি ছিল পেজেশকিয়ান ও শেখ খালেদের বৈঠক। ফেব্রুয়ারিতে পশ্চিম এশিয়ায় নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ার পর ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের শীর্ষ পর্যায়ে এটিই ছিল প্রথম আলোচনা। বৈঠকটি সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক কর্মসূচির অংশ ছিল না। তারপরও দুই পক্ষের একই টেবিলে বসা গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে।
এবিসি নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈঠকের পরিবেশ ছিল কিছুটা শীতল। কিন্তু এর পর ব্রিকসের যৌথ ঘোষণায় পশ্চিম এশিয়ায় ‘সর্বোচ্চ সংযম’ দেখানোর আহ্বান জানানো হয়।
চিতিগ বাজপেয়ির মতে, এখানেই ব্রিকসের আসল শক্তি। ভিন্ন স্বার্থ ও মতাদর্শের দেশগুলোকে একই টেবিলে বসাতে পারে এই জোট। কঠোর কোনো আদর্শিক কাঠামো না থাকায় সদস্যদেশগুলো নিজেদের বিরোধের পাশাপাশি অভিন্ন স্বার্থের জায়গাও খুঁজে নিতে পারে।
পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত যখন আরও জটিল হয়ে উঠছে এবং লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে হুতি বিদ্রোহীদের তৎপরতা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে, তখন ব্রিকসের মতো মঞ্চে সীমিত হলেও ঐকমত্য তৈরি হওয়াকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
ব্রিকস তাই ন্যাটো বা জি৭-এর মতো ঐক্যবদ্ধ কোনো রাজনৈতিক জোট নয়। কিন্তু পরস্পরের সঙ্গে বিরোধ থাকা দেশগুলোকেও একই আলোচনার টেবিলে বসানোর সক্ষমতা ভবিষ্যতে এর সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক শক্তি হয়ে উঠতে পারে।
