কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে দেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও সরকারি সেবার গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত করে ২০৩০ সালের মধ্যে মালয়েশিয়াকে একটি ‘এআই জাতি’ হিসেবে গড়ে তুলতে ব্যাপক প্রস্তুতি নিচ্ছে দেশটির সরকার। এ লক্ষ্য অর্জনে প্রযুক্তি অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি জনগণকে এআই ব্যবহারে দক্ষ করে তোলা, কর্মীদের নতুন দক্ষতায় প্রশিক্ষিত করা এবং ভবিষ্যতের পরিবর্তিত কর্মবাজারের জন্য প্রস্তুত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
দেশটির মালয় মেইল জানিয়েছে, ২০২৬ থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত জাতীয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কর্মপরিকল্পনার আওতায় ২০৩০ সালের মধ্যে এআই খাতে ৩ লাখের বেশি কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্য নিয়েছে মালয়েশিয়া। একই সময়ে ৭ লাখ কর্মীকে পুনঃদক্ষতা ও দক্ষতা উন্নয়নের প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। দেশের ৮০ শতাংশ জনগোষ্ঠীকে ২০৩০ সালের মধ্যে ডিজিটালভাবে দক্ষ করে তোলাও সরকারের অন্যতম লক্ষ্য।
এআইয়ের দ্রুত সম্প্রসারণের ফলে আগামী কয়েক বছরে কর্মক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে বলে মনে করছে সরকার। মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন ট্যালেন্টকর্পের ‘জেলাজাহ এআই মাইমাহির’ কর্মসূচির মাধ্যমে শিক্ষার্থী, কর্মজীবী, চাকরিপ্রার্থী, উদ্যোক্তা, গৃহিণী ও প্রবীণসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে এআই বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
সরকারের হিসাবে, আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরে পুনঃদক্ষতা ও দক্ষতা উন্নয়নের উদ্যোগ জোরদার করা না হলে প্রায় ৬ লাখ ৮৫ হাজার মালয়েশিয়ান কর্মী এআইয়ের কারণে তাদের কাজের ধরন পরিবর্তনের মুখে পড়তে পারেন। তবে এর অর্থ সরাসরি এত মানুষের চাকরি হারানো নয়। বরং প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক পেশায় কাজের ধরন ও দায়িত্ব পরিবর্তিত হবে। সেই পরিবর্তনের সঙ্গে কর্মীদের মানিয়ে নেওয়ার জন্য নতুন দক্ষতা অর্জন করানোই সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
সাধারণ জনগণের মধ্যে এআই ও ডিজিটাল প্রযুক্তি সম্পর্কে জ্ঞান বাড়াতে ডিজিটাল মন্ত্রণালয়ের ‘রাকিয়াত ডিজিটাল’ প্ল্যাটফর্মে বিনামূল্যে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এআই, সৃষ্টিশীল এআই, সাইবার নিরাপত্তা, ক্লাউড প্রযুক্তি ও ব্লকচেইনসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রাথমিক ধারণা দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। মালয়, ইংরেজি, চীনা ও তামিল ভাষায় এসব শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
গ্রামীণ জনগোষ্ঠী, তরুণ, প্রবীণ, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদেরও এই উদ্যোগের আওতায় আনার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সরকারের লক্ষ্য হলো, শুধু ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারা নয়—নাগরিকরা যেন এআইনির্ভর তথ্য যাচাই করতে পারেন, ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষিত রাখতে পারেন, প্রতারণা শনাক্ত করতে পারেন এবং স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির প্রভাব বুঝতে পারেন বলে জানিয়েছে মালয় মেইল।
২০২৪ সালে চালু হওয়া ‘এআই উন্তুক রাকিয়াত’ কর্মসূচির মাধ্যমেও সাধারণ জনগণকে এআইয়ের মৌলিক জ্ঞান দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর নতুন সংস্করণে তরুণদের বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ২০২৭ সাল পর্যন্ত ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সী ১ লাখ মালয়েশিয়ানকে এই কর্মসূচির আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
মালয় মেইল আরও লিখেছে, অংশগ্রহণকারীদের নির্ধারিত ছয়টি মডিউল সম্পন্ন করতে হবে। প্রশিক্ষণ সফলভাবে শেষ করা অংশগ্রহণকারীদের নির্বাচিত এআইভিত্তিক সফটওয়্যার ও অ্যাপ্লিকেশন ব্যবহারের জন্য তিন মাস পর্যন্ত বিনামূল্যে সুবিধা দেওয়ার উদ্যোগও রয়েছে।
সরকারি কর্মীদেরও এআই ব্যবহারে দক্ষ করে তুলতে ‘এআই অ্যাট ওয়ার্ক’ কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। এর আওতায় প্রায় ৪ লাখ ৪৫ হাজার সরকারি কর্মকর্তাকে সৃষ্টিশীল এআই ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। ডকুমেন্টস তৈরি, তথ্যের সারসংক্ষেপ, তথ্য বিশ্লেষণ, কর্মপ্রবাহ সহজ করা এবং সভার নোট তৈরির মতো দৈনন্দিন প্রশাসনিক কাজে এআই ব্যবহারের ওপর প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
এ ছাড়া বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সরকারি সংস্থার প্রায় ২০০ জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। তারা নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানে এআই ব্যবহারের জ্ঞান ও দক্ষতা ছড়িয়ে দিতে কাজ করবেন।
সরকারি সেবায়ও এআইয়ের ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ‘এজেন্টিক এআই’ প্রযুক্তি পরীক্ষামূলকভাবে সরকারি সেবায় ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এই প্রযুক্তি নাগরিকের প্রয়োজন বুঝে সংশ্লিষ্ট সরকারি সেবা শনাক্ত করতে এবং নির্দিষ্ট অনুমোদন ও নিরাপত্তাব্যবস্থার মধ্যে প্রয়োজনীয় কাজ সম্পন্ন করতে সহায়তা করতে পারে।
তবে সরকারি সেবায় এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা, সাইবার নিরাপত্তা, তথ্যের নির্ভুলতা, স্বচ্ছতা এবং মানুষের তদারকি নিশ্চিত করার বিষয়কে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে মালয় মেইল।
শিক্ষাব্যবস্থাতেও এআই প্রস্তুতির বিষয়টি যুক্ত করা হচ্ছে। স্কুল পর্যায় থেকেই শিক্ষার্থীদের এআই সম্পর্কে মৌলিক ধারণা ও সচেতনতা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতের কর্মক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার আরও বাড়বে—এই বাস্তবতা বিবেচনায় শিক্ষার্থীদের শুরু থেকেই এআইয়ের সুযোগ, সীমাবদ্ধতা ও ঝুঁকি সম্পর্কে ধারণা দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
উচ্চশিক্ষা ও কর্মজীবীদের দক্ষতা বাড়াতেও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের অনলাইন শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। ‘গ্লোবাল লার্নিং পাস’ কর্মসূচির আওতায় ১ লাখ মালয়েশিয়ানকে কোরসেরার হাজার হাজার কোর্স ও পেশাগত সনদ ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
একই সঙ্গে ‘রাকিয়াত ডিজিটাল এআই বিল্ডার্স হাব’ চালুর মাধ্যমে মৌলিক প্রশিক্ষণ শেষ করা নাগরিকদের বাস্তব এআইভিত্তিক প্রকল্প ও সমাধান তৈরির সুযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার। এর মাধ্যমে শুধু এআই ব্যবহারকারী নয়, ভবিষ্যতে স্থানীয় এআই উদ্ভাবক তৈরির লক্ষ্যও রয়েছে।
এআই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি এর সম্ভাব্য অপব্যবহার ও ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণেও কাজ করছে মালয়েশিয়া বলে লিখেছে মালয় মেইল।
