মৌলভীবাজারে ধ্বংসের দোরগোড়ায় জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক পরিবেশ ওদের থামাবে কে?

ফন্ট সাইজ:

মৌলভীবাজারে দিন দিন উজাড় হচ্ছে জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক পরিবেশ। জেলার সংরক্ষিত বনাঞ্চলের গাছ চুরি হচ্ছে। বাসস্থান ও খাদ্য সংকটে বন্যপ্রাণী প্রায়ই লোকালয়ে ধরা পড়ছে। নাব্যহ্রাস, দখল আর দূষণে নদী ও হাওর রয়েছে চরম অস্তিত্ব সংকটে। তাই দেশীয় প্রজাতির মাছ, পাখি, জলজপ্রাণী, উদ্ভিদ ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের দোরগোড়ায়। পাহাড় টিলা কেড়ে হচ্ছে ঘরবাড়ি। শুষ্ক মৌসুমে সুকৌশলে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে নিশ্চিহ্ন করা হচ্ছে বন ও জঙ্গল। ধ্বংস হচ্ছে বন্য পরিবেশ। অভিযোগ উঠেছে সংশ্লিষ্টদের উদাসীনতায় এই অপরাধীরা বেপরোয়া। কি ছিল আর এখন কি? কেন প্রতিনিয়ত চোখের পলকেই অদৃশ্য আর উজাড় হচ্ছে এজেলার চিরচেনা পরিবেশ ও প্রাণ প্রকৃতি। এত এত সরকারি বেসরকারি সংস্থা আর সংগঠন। পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ওদের ভূমিকাই বা কি।

এমন প্রশ্নের উত্তর খোঁজেন এ জেলার প্রবীণ ও সচেতন প্রকৃতিপ্রেমীরা। জেলা জুড়ে পাহাড়ি টিলা কেটে তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন ঘরবাড়ি। হোটেল আর নামিদামি রিসোর্ট। শ্রেণি পরিবর্তন করে হচ্ছে নানা ফলজ বাগান। অবৈধ পন্থায় দেদারছে উত্তোলন হচ্ছে বালু। হুমকিতে পড়ছে নদীর রক্ষা বাঁধ। নানা কায়দায় কাটা হচ্ছে রিজার্ভ ফরেস্টের দুর্লভ গাছ। এমনি করে প্রভাবশালীদের খপ্পরে অযত্ন আর চরম অবহেলায় ধ্বংসের দোরগোড়ায় এজেলার চিরচেনা জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ।
অভিযোগ উঠেছে জনপ্রতিনিধি, বনবিভাগ আর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের গড়ে উঠা সিন্ডিকেটই এর জন্য দায়ী। জেলার ৭টি উপজেলার মধ্যে পাহাড়ি টিলা কাটা ও অবৈধ বালু উত্তোলনে এগিয়ে আছে মনুনদের তীরবর্তী উপজেলাগুলোসহ শ্রীমঙ্গল, কুলাউড়া, বড়লেখা ও কমলগঞ্জ। কিন্তু ওই এলাকাগুলোতে লোক দেখানো অভিযান ছাড়া নেই কোনো স্থায়ী প্রতিকার। অথচ বছর জুড়ে প্রায় প্রতিদিনই এই অবৈধ কর্মযজ্ঞ রয়েছে চলমান।

দৃষ্টিনন্দন, দুর্লভ ও বিরল প্রজাতির জীববৈচিত্র্য আর প্রাকৃতিক পরিবেশের মৌলভীবাজার এমন সুনামের ঐতিহ্য এখন হারাতে বসেছে। আবাসস্থল ও খাদ্য সংকটে মহাহুমকিতে থাকা জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষায় নেই পরিকল্পিত প্রয়োজনীয় উদ্যোগ ও তার বাস্তবায়ন। ২৭৯৯ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের ৭টি উপজেলা আর ৬৭টি ইউনিয়নের এজেলা পাহাড়ি টিলা, নদী ও হাওর বেষ্টিত। ইতিমধ্যে অনেক নদী ও হাওর অস্তিত্ব বিলীন হলেও কোনোরকম টিকে আছে ৩টি হাওর ও ৬টি নদী। দেশের সবচেয়ে বড় হাওর হাকালুকি আর কাউয়দীঘি ও হাইল হাওর। স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের হাওরগুলোর নানা জীববৈচিত্র্য, জলজপ্রাণী ও উদ্ভিদের নিরাপদ আবাস্থল এখন মহাহুমকিতে।
নানা সংকট ও সমস্যায় কোনোরকম অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে মনু, ধলাই, ফানাই, সোনাই, কন্টিনালা ও জুড়ী নদী।

আর বরাকের মতো অনেক খরস্রোতা নদীও এখন নিশ্চিহ্ন প্রায়। দেশীয় প্রজাতির মাছ উৎপাদনের অন্যতম উৎস শতাধিক গাঙ, খাল ও ডোবা অনেক আগেই বিলীন। জাতীয় উদ্যান লাউয়াছড়া বনের ভেতর দিয়ে সড়ক থাকায় দ্রুতগতির বাস, ট্রাকসহ অন্যান্য গাড়ি ও ট্রেনের নিচে কাটা পড়ে প্রায়ই মারা যাচ্ছে নানা প্রজাতির প্রাণী। সংরক্ষিত বনের ভেতর দিয়ে যাওয়া বিদ্যুতের ৩৩ কেভি গ্রিড লাইনে প্রাণ যাচ্ছে বন্যপ্রাণির।
জলচর পাখির জলকেলি। জলজ উদ্ভিদ আর প্রাণীর প্রাণবন্ত উচ্ছ্বাস। দেশীয় নানা প্রজাতির ঝাঁকে ঝাঁকে মাছের অবাধ বিচরণ। এমন মনোহর দৃশ্যের এখন ছন্দপতন। দেশের সবচেয়ে বড় হাওর হাকালুকি আর হাইল হাওরের বাইক্কা বিল। অতিথি পাখির জন্য জেলার বিখ্যাত স্থান দু’টিতে নেই সেই পাখির দল। এখন পাখিপ্রেমী দর্শনার্থীদের ভিড় বাড়লেও প্রতি বছরই পরিসংখ্যান ছোট হচ্ছে পরিযায়ী ও দেশীয় পাখির। পাখি বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশবাদীরা বলছেন, এর অন্যতম কারণ দীর্ঘদিন থেকে চিহ্নিত সমস্যাগুলো সমাধানে ব্যর্থতা।

বনবিভাগ ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ বিভাগের চরম উদাসীনতা ও স্থানীয়দের অসচেতনতা।
পরিবেশ অধিদপ্তর মৌলভীবাজার জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. মাঈদুল ইসলাম মানবজমিনকে বলেন, তার বিভাগ ২০২৪ সাল থেকে অবৈধ বালু উত্তোলন, পলিথিন, শর্তভঙ্গ ইটভাটা, তরল বর্জ্য, খামার বর্জ্য, শব্দদূষণ, ছাড়পত্র, পাহাড় কাটাসহ পরিবেশ বিপর্যয়ের অন্যান্য বিষয়ে এনফোর্স মামলা ১৫৮টি। একই বিষয়ে মোবাইল কোর্টের ৮৩টি মামলায় অর্থদণ্ড ৫,৮১০০০ টাকা আরোপ ও আদায় করা হয়। লোকবল কম থাকায় নিয়মিত অভিযান কম হচ্ছে স্বীকার করে তিনি বলেন জেলায় ৬ জনের জায়গায় ১ জন দেখভাল করছেন। তিনি বলেন, গুরুত্ব বিবেচনায় এ জেলার প্রতিটি উপজেলায় একজন করে পরিদর্শক থাকা প্রয়োজন।