‘আগে এক গ্রুপ এসে চাঁদা চাইতো, এখন আরেক গ্রুপ চায়। চাঁদা না দিলে ঝামেলা করে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে এসেও টাকা দাবি করে।’ এভাবেই ক্ষোভের কথা বলছিলেন সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলার চান্দাইকোনা বাজারের কয়েকজন মুরগি ব্যবসায়ী। তাদের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে চাঁদা দাবি ও ভয়ভীতির কারণে তারা অনেকটা আতঙ্কের মধ্যে ব্যবসা করছেন।
সম্প্রতি চান্দাইকোনা (পাবনা বাজার) ফকিরবাড়ী রোডের একটি মুরগির ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ৫০ হাজার টাকা দাবি এবং টাকা না দেয়ায় কর্মচারীকে মারধরের ঘটনা ঘটেছে। এ সময় ধারালো অস্ত্রের আঘাতে ওই কর্মচারীর ডান হাতের কব্জির ওপরের অংশ কেটে যায়। পরে তাকে রায়গঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়।
ঘটনাটি নিয়ে ব্যবসায়ী মো. আল আমিন রায়গঞ্জ থানায় পাঁচজনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরও ২-৩ জনের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। আল আমিনের ভাষ্য, চান্দাইকোনা বাজারে তার মুরগির ব্যবসা রয়েছে। কয়েকজন ব্যক্তি তার কাছে ৫০ হাজার টাকা দাবি করে আসছিলেন। টাকা দিতে রাজি না হওয়ায় তাকে বিভিন্নভাবে হুমকি দেয়া হচ্ছিল।
গত শুক্রবার বিকাল ৫টার দিকে তিনি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে না থাকার সুযোগে কয়েকজন সেখানে গিয়ে তার খোঁজ করেন। পরে প্রতিষ্ঠানে থাকা কর্মচারী মো. হাসান আলীর কাছে ওই টাকা দাবি করা হয়। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে গালিগালাজ ও মারধর করা হয়। একপর্যায়ে ধারালো অস্ত্র দিয়ে হাসান আলীর গলা লক্ষ্য করে আঘাত করা হলে তিনি হাত দিয়ে তা ঠেকানোর চেষ্টা করেন। এতে তার ডান হাতের কব্জির ওপরের অংশে গুরুতর জখম হয়। পরে তাকে গলা চেপে ধরে শ্বাসরোধের চেষ্টা করা হয় বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
হাসানকে রক্ষা করতে এগিয়ে এলে আরও দুই ব্যক্তিকে মারধর করা হয়। পরে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ক্যাশের ড্রয়ার থেকে ৬৫ হাজার টাকা এবং হাসানের ব্যবহৃত একটি মুঠোফোন নিয়ে যাওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
চান্দাইকোনা বাজারের মুরগি ব্যবসায়ী মো. মোতালেব শেখ, মো. জালাল হোসেন ও মো. হুজাইফাসহ কয়েকজন বলেন, ‘আমরা বিভিন্ন এলাকা থেকে এসে এখানে ব্যবসা করি। আগে একদল এসে টাকা চাইতো, এখন আরেকদল আসে। টাকা না দিলে নানা ধরনের ঝামেলা করে। আমাদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে এসেও চাঁদা দাবি করা হয়।’ তাদের প্রশ্ন- ‘আমরা অন্য এলাকা থেকে এসে চান্দাইকোনা বাজারে ব্যবসা করি- এটাই কি আমাদের সমস্যা?’ ব্যবসায়ীরা বলেন, তারা কারও সঙ্গে বিরোধে জড়াতে চান না। শান্তিপূর্ণভাবে ব্যবসা করতে চান। তবে এভাবে বারবার টাকা দাবি ও ভয়ভীতি দেখানো হলে ব্যবসা পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ছে। তারা প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করেন। ব্যবসায়ীদের কয়েকজনের ভাষ্য, এসব ঘটনায় স্থানীয় তরুণদের একটি অংশ জড়িত।
তাদের মধ্যে কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিরাও রয়েছেন বলে তারা দাবি করেন। এ ঘটনায় অভিযুক্তদের পক্ষ থেকে মো. সালমান নামের এক যুবক ঘটনার সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘সঙ্গদোষে দোষী।’ ঘটনার সময় একজনকে চড়-থাপ্পড় মারার কথাও তিনি স্বীকার করেন। তবে চাঁদা দাবির বিষয়ে তার বক্তব্য স্পষ্ট নয়। অন্যদিকে, প্রধান অভিযুক্ত মো. লিটন নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন। তিনি বলেন, ঘটনার সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। বরং তিনি ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধেই পাল্টা অভিযোগ করেন।
তার দাবি, ব্যবসায়ীদের সঙ্গে তাদের আগে থেকেই বিরোধ রয়েছে এবং ঘটনাটি ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। এ বিষয়ে রায়গঞ্জ সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. সাইফুল ইসলাম খান বলেন, ‘চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। এ ঘটনায় থানায় একটি লিখিত অভিযোগ জমা হয়েছে বলে জানতে পেরেছি। বিষয়টি তদন্ত করে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।’ চান্দাইকোনা বাজারের ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা, তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে ভয়ভীতি দেখানো ও টাকা দাবির মতো ঘটনা বন্ধ হবে। তাদের দাবি, নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে তারা নির্বিঘ্নে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারবেন।
