উখিয়ায় মাদকের ভয়াল বিস্তার, সন্ধ্যা নামলেই বাড়ে দৌরাত্ম্য

ফন্ট সাইজ:

কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলায় উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে মাদকসেবনের প্রবণতা। উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের প্রত্যন্ত এলাকা থেকে শুরু করে বাজার, পরিত্যক্ত ভবন, সড়কের পাশ ও নির্জন স্থানে সন্ধ্যা নামার পর দলবদ্ধভাবে মাদকসেবীদের আড্ডা বসে বলে অভিযোগ উঠেছে। মাদকসেবনের অর্থ জোগান দিতে একটি অংশ চুরি, ছিনতাইসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, মাদকের বিস্তার রোধে কার্যকর নজরদারি ও সামাজিক প্রতিরোধ জোরদার করা না হলে এর সঙ্গে খুন, রাহাজানি, ডাকাতিসহ গুরুতর অপরাধের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।

স্থানীয়দের তথ্যমতে, উখিয়া উপজেলার রত্নাপালং ইউনিয়নের খোন্দকারপাড়া, হলদিয়াপালং ইউনিয়নের রুমখাঁ পশ্চিম বড়বিল, মৌলভীপাড়া ও দক্ষিণ ক্লাসপাড়া, মরিচ্যাপালংয়ের পাগলির বিল ও পাতাবাড়ি এলাকায় সন্ধ্যার পর মাদকসেবনের আসর বসে বলে অভিযোগ রয়েছে। জালিয়াপালং ইউনিয়নের ইনানী, নিদানিয়া ও মেরিন ড্রাইভের বিভিন্ন ব্রিজসংলগ্ন নির্জন স্থানেও মাদকসেবীদের আনাগোনা রয়েছে বলে স্থানীয়দের দাবি। রাজাপালং ইউনিয়নের উখিয়া সদরের কয়েকটি পরিত্যক্ত ভবন, ডাকবাংলো মার্কেটের পেছনের এলাকা, হাজিরপাড়া রাস্তার মাথা, টাইপালং, পাতাবাড়ি, টিএনটি ও হাজেম রাস্তার মাথা এবং কুতুপালং এলাকাতেও মাদকসেবীদের উৎপাত রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। অন্যদিকে পালংখালী ইউনিয়নের থাইংখালী, রহমতের বিল, তেলখোলা ও বালুখালী এলাকাতেও মাদকসেবন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বাসিন্দারা।

স্থানীয়রা জানান, মাদকাসক্ত ও বেপরোয়া তরুণদের কারণে অনেক পরিবারে অশান্তি তৈরি হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মা-বাবাকে জিম্মি করে টাকা আদায় এবং স্বর্ণালংকার চুরির মতো ঘটনাও ঘটছে। মাদকের পাশাপাশি তরুণদের মধ্যে স্মার্টফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার ও অনলাইন জুয়ার প্রবণতা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। সচেতন মহলের মতে, বেকারত্ব, পারিবারিক নজরদারির ঘাটতি, প্রযুক্তির অপব্যবহার এবং সহজে মাদকের সংস্পর্শে আসার সুযোগ-সব মিলিয়ে তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। শিক্ষক মোজাম্মেল হক বলেন, সন্তান মাদকে জড়িয়ে পড়লে তাকে শাস্তি দেয়ার আগে মাদকমুক্ত ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করতে হবে। তবে মাদক ব্যবসা, চুরি, ছিনতাই বা সহিংস অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।

উখিয়া প্রেস ক্লাবের প্রবীণ সদস্য ও পরিকল্পিত উখিয়া চাই পরিষদের সভাপতি সাংবাদিক নুর মোহাম্মদ সিকদার বলেন, মাদকের বিস্তার রোধে প্রশাসনের পাশাপাশি পরিবার ও সমাজকে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এম. গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, মাদক শুধু একজন ব্যক্তিকে নয়, একটি পরিবার ও সমাজকে ধ্বংস করে, যার নেতিবাচক প্রভাব রাষ্ট্রেও পড়ে। তরুণদের মাদক থেকে দূরে রাখতে পরিবার, জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। উখিয়া উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর আমীর মাওলানা আবুল ফজল বলেন, মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকসেবীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে মসজিদ, মাদ্রাসা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে ভূমিকা রাখতে হবে। উখিয়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি সরওয়ার জাহান চৌধুরী বলেন, মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি বেকার তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে হবে।

সচেতন নাগরিকরা বলছেন, উখিয়ায় মাদকের বিস্তার ঠেকাতে উপজেলা প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন, শিক্ষক, অভিভাবক, সাংবাদিক, সুশীল সমাজ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। একইসঙ্গে সন্ধ্যার পর নির্জন এলাকা ও পরিত্যক্ত ভবনগুলোতে পুলিশের নিয়মিত টহল ও নজরদারি বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন তারা। তাদের মতে, মাদক নিয়ন্ত্রণে শুধু অভিযান নয়, মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন, তরুণদের কর্মসংস্থান, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা এবং পরিবারভিত্তিক সচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করাও জরুরি।