খাগড়াছড়িতে বাড়ছে ‘গ্যাং’ উদ্বেগ

খাগড়াছড়িতে বাড়ছে ‘গ্যাং’ উদ্বেগ

ফন্ট সাইজ:

খাগড়াছড়িতে কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। জেলা সদর থেকে শুরু করে নয়টি উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় কিশোরদের দলবদ্ধ আড্ডা, বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো, মারামারি, ইভটিজিং, মাদক সেবন ও নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ আসছে প্রতিনিয়ত। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর শহরের বিভিন্ন পয়েন্ট, বাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশ ও নিরিবিলি এলাকায় কিশোরদের দলবদ্ধ অবস্থান চোখে পড়ছে।
খাগড়াছড়ি সদরের কলেজ গেট, মোহাম্মদপুর, শালবন, গঞ্জপাড়া ও হাইস্কুল মাঠসংলগ্ন এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে কিশোরদের গ্যাং আচরণ ও অপরাধপ্রবণতা নিয়ে স্থানীয়দের অভিযোগ রয়েছে। একই চিত্র দেখা যাচ্ছে দীঘিনালা, পানছড়ি, মহালছড়ি, মাটিরাঙ্গা, রামগড়, মানিকছড়ি, গুইমারা ও লক্ষ্মীছড়ির বিভিন্ন এলাকায়। কোথাও মাদক সেবন, উচ্চ শব্দে গান বাজানো, বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো ও পথচারীদের উত্ত্যক্ত করার অভিযোগ রয়েছে। আবার তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে দলবদ্ধ মারামারি ও সংঘর্ষেও জড়িয়ে পড়ছে কেউ কেউ।

সচেতন মহলের মতে, শুধু অভিযান বা গ্রেপ্তার করে কিশোর অপরাধ বন্ধ করা সম্ভব নয়। কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রশাসন, পুলিশ, সমাজসেবা বিভাগ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সামাজিকভাবে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আগেই সদরসহ প্রতিটি উপজেলায় কিশোর অপরাধের প্রকৃত চিত্র তুলে এনে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার দাবি জানিয়েছেন অভিভাবক ও সচেতন মহল। খাগড়াছড়ি সদরের মুসলিমপাড়ার অভিভাবক মো. হাবিবুল্লাহ বলেন, ‘আমার ছেলে নবম শ্রেণিতে পড়ে। সে কখন কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে- এটা নিয়ে সব সময় দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়। পরিবারকে যেমন দায়িত্ব নিতে হবে, তেমনি প্রশাসনকেও কিশোরদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করতে হবে।’

শিক্ষকরা বলছেন- পরিবারের নজরদারির অভাব, অসৎ সঙ্গ, মাদকের সহজলভ্যতা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার এবং খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সীমিত সুযোগ কিশোর অপরাধ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হতে পারে। শিক্ষার্থীর আচরণে হঠাৎ পরিবর্তন, নিয়মিত অনুপস্থিতি কিংবা অপরিচিত ব্যক্তিদের সঙ্গে অতিরিক্ত মেলামেশার বিষয়েও অভিভাবক ও শিক্ষকদের সতর্ক থাকা প্রয়োজন। আইনজীবী এডভোকেট জসিম উদ্দিন মজুমদার বলেন, ‘কিশোর অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে হবে। কিশোরদের ব্যবহার করে মাদক কারবার বা সংঘবদ্ধ অপরাধে জড়িত প্রাপ্তবয়স্কদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেয়া জরুরি। একই সঙ্গে অপরাধে জড়িয়ে পড়া কিশোরদের কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে হবে।’

খাগড়াছড়ি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. আব্দুল হামিদ বলেন, ‘মাদক নির্মূলে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। গত মাসে মাদকবিরোধী অভিযানে ১০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কিশোরদের মাদকের সংস্পর্শ থেকে দূরে রাখতে অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো হয়েছে, তাদের কিশোর গ্যাংয়ের কুফল সম্পর্কে বলা হচ্ছে। গত মাসে ১০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাদকবিরোধী কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে।’ খাগড়াছড়ির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান বলেন, ‘কিশোর অপরাধ ও কিশোর গ্যাংয়ের বিষয়টি পুলিশ গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। জেলা ও উপজেলায় নিয়মিত নজরদারি এবং আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে এ সমস্যা পুরোপুরি সমাধান সম্ভব নয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও সমাজের সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে। কিশোর অপরাধীদের রাজনৈতিক সাপোর্ট দিয়ে সহযোগিতা করা থেকে আমাদের বের হয়ে আসতে হবে। এদের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।’

খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসক মো. আনোয়ার সাদাত বলেন, ‘কিশোরদের অপরাধপ্রবণতা কোনোভাবেই হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। পরিবার, সামাজিক পরিবেশ, মাদক ও অসৎ সঙ্গসহ বিভিন্ন কারণে কিশোররা বিপথগামী হতে পারে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সমন্বয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হবে। একই সঙ্গে কিশোরদের খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও সৃজনশীল কাজে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ আরও জোরদার করা প্রয়োজন।’