কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে মাদকের ভয়াল ছোবলে বিপর্যস্ত প্রতিটি ইউনিয়নের গ্রাম-পাড়া-মহল্লা। কটিয়াদী মডেল থানার ওসি মো. রফিকুল ইসলাম যোগদানের পর মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। তিনি প্রায়ই বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে গাঁজা, ইয়াবা উদ্ধার করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাইভে এসে সচেতনতার আহ্বান জানান। তারপরও নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না মাদকের বিস্তার। সম্প্রতি মাদকের টাকার জন্য সন্তান বিক্রির ঘটনা এলাকায় মারাত্মক বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। একটি, দু’টি নয়, চার পরিবারের পাঁচটি সন্তান বিক্রির ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় এলাকাবাসী রয়েছেন আতঙ্কে। জানা যায়, উপজেলার জালালপুর ইউনিয়নের উত্তর চরপুক্ষিয়া গ্রামের চার পরিবার মাদকের টাকার জন্য তাদের পাঁচ শিশু সন্তানকে বিক্রি করে দিয়েছেন।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, দুলাল মিয়ার ছেলে জাকির হোসেনের মাদকাসক্ত স্ত্রী ফারজানা তার নবজাতক ছেলেসন্তান গত ২রা সেপ্টেম্বর ৬০ হাজার টাকায়, জজ মিয়ার ছেলে সাদ্দাম হোসেনের দুই স্ত্রীর গর্ভে জন্ম নেয়া দু’টি শিশু সন্তান যথাক্রমে ১ লাখ ৫০ হাজার ও ২০ হাজার টাকায়, আসাদ মিয়ার ছেলে জাকির হোসেন ৭৭ হাজার টাকায় এবং মফিজ উদ্দিনের ছেলে আসাদ মিয়ার সন্তান ২ লাখ টাকায় বিক্রি করা হয়েছে।
গত ৬ই সেপ্টেম্বর মাদকাসক্ত জাকির হোসেন তার মাদকাসক্ত স্ত্রী ফারজানা ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে সন্তান বিক্রির অভিযোগ এনে কটিয়াদী মডেল থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। অপর চার শিশু বিভিন্ন সময় বিক্রি করা হয়েছে বলে এলাকাবাসী জানিয়েছেন।
স্থানীয়দের দাবি, সন্তানদের প্রথমে যাদের কাছে বিক্রি করা হয়েছিল, পরবর্তীকালে তাদের কেউ কেউ আবার অন্য জায়গায় বেশি টাকায় বিক্রি করে দিয়েছে। ফলে শিশুদের বর্তমান অবস্থান ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। প্রবাস থেকে ছুটিতে আসা গ্রামের মো. ইকবাল হোসেন বলেন, দীর্ঘদিন পর বাড়ি এসে ঘরে ঘরে মাদকের ছড়াছড়ি দেখে হতবাক হয়েছি। মাদক সেবনের জন্য টাকা জোগাড় করতে নিজেদের সন্তান বিক্রি করে দেয়ার ঘটনা ঘটছে। চার পরিবারের পাঁচটি শিশু ইতিমধ্যে বিক্রি করে দেয়া হয়েছে। স্থানীয় জয়নাল মিয়া, বকুল মিয়া, বাবুল মিয়া, জামাল মিয়া, কালা চান, সখিনা, কালুমিয়া, নুরুন্নাহার ও গ্রাম পুলিশ দুলাল মিয়া জানান, গ্রামে মাদকের বিস্তার ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। তাদের অভিযোগ, প্রায় পাঁচ বছর বয়সী শিশুকেও মাদক সেবন করানো হয়।
অনেক বাড়িতে স্বামী-স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে একসঙ্গে মাদক সেবন করে। প্রতিবাদ করলে হামলা, হয়রানি ও চাপের আশঙ্কায় অনেকে নীরব থাকেন। কটিয়াদী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির এক ছাত্র জানায়, উত্তর চরপুক্ষিয়া গ্রামের পরিচয় দিতে সে লজ্জা পায়। গ্রামের নাম শুনলেই অনেকে টিটকারি করে। কটিয়াদী থানা থেকে দেড় কিলোমিটার দূরত্বের মধ্যেই এমন অভিযোগ উঠলেও মাদকের বিস্তার ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় ক্ষোভ জানিয়েছেন স্থানীয়রা। সরজমিন তথ্য সংগ্রহ করতে গেলে সন্তান বিক্রির অভিযোগ ওঠা পরিবারের সদস্যরা সাংবাদিক আসার খবর পেয়ে অন্যত্র চলে যান। ফলে তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
জালালপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, বিভিন্ন সময়ে মাদক সেবনের টাকার জন্য উত্তর চরপুক্ষিয়া গ্রামে পাঁচটি শিশু বিক্রি করে দেয়ার কথা শুনেছি। মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে সামাজিক ও প্রশাসনের সহায়তায় কাজ করবো। কটিয়াদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, দারিদ্র্যতা ও মাদকের টাকা জোগাড় করতে সন্তান বিক্রি করে দেয়ার অভিযোগ পেয়েছি। মাদক নির্মূলে আইনগত এবং সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।
