কক্সবাজারে বেপরোয়া কিশোর গ্যাং বাড়ছে অপরাধ

কক্সবাজারে বেপরোয়া কিশোর গ্যাং বাড়ছে অপরাধ

ফন্ট সাইজ:

কক্সবাজারে দিন দিন ভয়ঙ্কর রূপ নিচ্ছে কিশোর গ্যাং। খুন, ছিনতাই, মাদক কারবার, প্রতারণা, ইভটিজিং, চাঁদাবাজি, আধিপত্য বিস্তার, রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা এখন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। কিশোর গ্যাং সন্ত্রাসীদের বেপরোয়া তৎপরতায় নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী ও পর্যটকরা।
কক্সবাজার শহর ও আশপাশে ছোট-বড় অন্তত শতাধিক কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। এসব গ্যাংয়ের একটি বড় অংশে রয়েছে রোহিঙ্গা কিশোর, পাশাপাশি দেশের অন্যান্য এলাকা থেকে আসা কিশোর অপরাধীরাও বিভিন্ন চক্রের সঙ্গে যুক্ত হয়ে অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাম্প্রতিক অভিযানে ধরা পড়া সদস্যদের তথ্যে এ চিত্র ফুটে উঠেছে।

মঙ্গলবার রাতে হোটেলের বারে মদ্যপানের সময় বাকবিতণ্ডার জেরে ৩ ঘণ্টার ব্যবধানে দুই যুবক খুন হয়েছেন। ধারালো অস্ত্রের আঘাতে প্রথমে খুন হন রাশেদুল হক রাশেদ (২৮)। রাশেদের হত্যাকারী সন্দেহে পরে দফায় দফায় মারধরে খুন হয়েছেন সালমান সোলাইমান নামের আরও এক যুবক। পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, খুন হওয়াদের মধ্যে সালমান সোলাইমান কিশোর গ্যাং লিডার। এর আগে চলতি বছরের ২৫শে মার্চ রাত সাড়ে ১০টার দিকে কক্সবাজার শহরের কবিতা চত্বর এলাকায় প্রকাশ্যে ছুরি মেরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক খোরশেদ আলমকে হত্যা করা হয়। ২০২৫ সালের ৯ই জানুয়ারি রাতে খুলনা সিটি করপোরেশনের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর গোলাম রব্বানী টিপুকে সমুদ্রসৈকত সংলগ্ন হোটেল সি-গালের সামনে গুলি করে হত্যা করা হয়। আলোচিত এই হত্যাকাণ্ড ভাড়াটিয়া কিশোর গ্যাং সন্ত্রাসীদের দ্বারা সংঘটিত হয়। এভাবে প্রতিনিয়ত ঘটছে খুন-খারাবি। বারবার খুন, ধর্ষণসহ গুরুতর অপরাধের সঙ্গে যে নামগুলো উঠে আসে, তারা হলেন শীর্ষ সন্ত্রাসী ও কিশোর গ্যাং লিডার বাহারছড়ার আরিফ, কলাতলীর সোহেল, তাজুয়ারুল হক ওরফে রাদি। এদের প্রত্যেকের নেতৃত্বে ৩০ থেকে ৪০ জনের একটি সংঘবদ্ধ গ্রুপ রয়েছে। এই চক্রটি কলাতলী হোটেল মোটেল জোন, বার্মিজ মার্কেট থেকে বিজিবি ক্যাম্প, গোলাদিঘি হয়ে খুরুশকুল মাথা পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে।

অভিযোগ রয়েছে, ছিনতাই, অপহরণ, মুক্তিপণ আদায় এবং ইয়াবা বাণিজ্যসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত এই গ্যাং লিডারগুলো। এমনকি ইয়াবা ছিনতাইয়ের ঘটনাও তাদের নিয়ন্ত্রণে সংঘটিত হয়। সন্ত্রাসীদের মধ্যে যারা শহর জুড়ে সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে তারা হলো- মিজান ওরফে বর্মায়া মিজান (৩৩), আবছার (২৬), তার বিরুদ্ধে হত্যা, অপহরণ ও ইয়াবাসহ অন্তত ৩২টি মামলা রয়েছে। পুরো শহরে তার দাপট রয়েছে।

কাজল (২৬) অস্ত্রধারী হিসেবে পরিচিত, শহীদ (২৫), আকিব (২৩) হত্যাসহ একাধিক মামলার আসামি, সালাউদ্দিন (প্রকাশ: সালা) (২৫), সিফাত (২৩), সাহাব উদ্দিন বাবু, রাদির আরেক সহযোগী শীর্ষ সন্ত্রাসী সাদ্দাম হোসেনের নেতৃত্বে ‘সাদ্দাম বাহিনী’ সক্রিয় রয়েছে। এ ছাড়া কলাতলী পয়েন্টে: মোহাম্মদ হাসান আলী, সুগন্ধা পয়েন্টে শাহ আলম (প্রকাশ) সিডম, মোহাম্মদ এহসান, মোহাম্মদ রুবেল, মোহাম্মদ নয়ন, জিসান হত্যা, অস্ত্র, ছিনতাই, জমি দখল ও কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। রাদির আরেক সহযোগী সাদ্দাম হোসেনের বিরুদ্ধে ডজনখানেক মামলা রয়েছে। জাহেদ নামের আরেকজনও ছিনতাই ও অপহরণের সঙ্গে জড়িত।

বিশেষ করে সমুদ্রসৈকত ঘিরেই সবচেয়ে বেশি সক্রিয় কিশোর গ্যাংগুলো। সুগন্ধা, শৈবাল, সি-গাল, ডিভাইন পয়েন্ট, কবিতা চত্বর, ঝাউবন, কলাতলী সৈকত এবং মেরিন ড্রাইভের নির্জন এলাকাগুলোতে সন্ধ্যার পর তাদের বিচরণ বেড়ে যায়। এদের সঙ্গে রয়েছে সুন্দরী নারী প্রতারক চক্র। ল’ কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল, কলাতলী মোড়, সুগন্ধা মোড়, কলাতলী বাইপাস, লাইটহাউস এলাকা, ভোলা বাবুর পেট্রোল পাম্প, নূরপাড়া, পেশকারপাড়া, হাসপাতাল সড়ক, এন্ডারসন রোড, সাহিত্যিকা পল্লী, পাহাড়তলী, ল্যাবরেটরি স্কুল রোড, ভোলাইয়ার ঘোনা, টেকপাড়া এবং মেরিন ড্রাইভের বিভিন্ন নির্জন এলাকায় এরা তৎপর থাকে।

কক্সবাজারে অধিকাংশ কিশোর গ্যাংয়ের ওপর রয়েছে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা। বিভিন্ন দলের শীর্ষ নেতারা তাদের নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবহার করেন। রাজনৈতিক কর্মসূচিতে লোকসমাগম, জমি দখল, প্রতিপক্ষকে ভয়ভীতি দেখানো কিংবা ব্যক্তিগত বিরোধ নিষ্পত্তিতে এসব কিশোরদের ব্যবহার করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। বিনিময়ে তাদের দেয়া হয় অর্থ, মাদক, আশ্রয়-প্রশ্রয় এবং আইনি সহায়তা। ফলে বয়সে কিশোর হলেও অপরাধের ধরন হয়ে উঠছে ভয়ঙ্কর ও সংঘবদ্ধ। সীমান্তবর্তী জেলা হওয়ায় কক্সবাজারে ইয়াবাসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক সহজলভ্য। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের মতে, কিশোর গ্যাংয়ের বড় একটি অংশ মাদকাসক্ত।

নেশার অর্থ জোগাড় করতেই তারা ছিনতাই, চুরি ও বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।
কক্সবাজার জেলা পুলিশ ও র‌্যাব জানিয়েছে, কিশোর গ্যাং দমনে নিয়মিত চিরুনি অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার পাশাপাশি গোয়েন্দা নজরদারিও বাড়ানো হয়েছে। ট্যুরিস্ট পুলিশের কক্সবাজার রিজিওনের পুলিশ সুপার মো. মারুফাত হুসাইন বলেন, সৈকতে ভাসমান অপরাধী ও ছিনতাইকারীদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলমান রয়েছে। পর্যটকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ট্যুরিস্ট পুলিশ কাজ করছে।