২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার ২৫ বছর পেরিয়ে গেছে। এই সিকি শতাব্দী পর পশ্চিমা বিশ্বের গোয়েন্দা কার্যক্রম ও কৌশলগত পরিকল্পনায় ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। তবে এখনও বড় ধরনের কৌশলগত ভুল ঘটিয়ে চলেছেন বিশ্বনেতারা। অন্যদিকে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অবাধ প্রবাহে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছাচ্ছে হামলার ভয়াবহ সব ভিডিও, যার হাত ধরে পুরনো ষড়যন্ত্র তত্ত্বগুলো নতুন করে ডালপালা মেলছে। ভয়াবহ নাইন-ইলেভেনের ২৫ বছর পূর্তিতে এ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বিবিসি ও সিএনএন।
গোয়েন্দা ব্যর্থতা ও কৌশলগত ভুল
৯/১১-এর ঘটনাকে মার্কিন সরকারের ‘কল্পনা, নীতি, সক্ষমতা এবং ব্যবস্থাপনার চরম ব্যর্থতা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিল তদন্ত কমিশন। সেই অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর যেমন: সিআইএ, এফবিআই ও এমআইফাইভ মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান ব্যবস্থা বর্তমানে অনেক সুসংহত হয়েছে। তবে এই ২৫ বছরে পশ্চিমা বিশ্ব বেশ কিছু বড় কৌশলগত ভুলও করেছে। এমআইসিক্স-এর সাবেক প্রধান স্যার অ্যালেক্স ইয়ঙ্গারের মতে, পশ্চিমা বিশ্ব গত দুই দশক কেবল সন্ত্রাসবাদ দমনে ব্যস্ত থাকায় সামরিক ও কৌশলগত শক্তি হিসেবে চীন ও রাশিয়ার উত্থানকে বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে। এছাড়া, ২০০৩ সালে ইরাকে ‘গণবিধ্বংসী অস্ত্র’ থাকার ভুয়া তথ্যের ভিত্তিতে আগ্রাসন এবং সম্প্রতি ইসরাইলকে সঙ্গে নিয়ে ইরানের ওপর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের হামলার সিদ্ধান্তকে বড় কৌশলগত ব্যর্থতা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
মানবাধিকার লঙ্ঘন ও বিতর্কিত নীতি
সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে তথাকথিত এই যুদ্ধের নামে মানবাধিকার লঙ্ঘনের কলঙ্কজনক অধ্যায়ও রচনা করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা। সন্দেহভাজনদের ধরে এনে গুয়ান্তানামো বে-র মতো গোপন বন্দিশালায় বিনা বিচারে আটকে রাখা ও নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। এমনকি সম্প্রতি ২০২৫ সালে এল সালভাদরের বিতর্কিত ‘টেররিজম কনফাইনমেন্ট সেন্টারে’ যুক্তরাষ্ট্র থেকে দুই শতাধিক বন্দি স্থানান্তরের মতো ঘটনাও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে।
নতুন প্রজন্মের কাছে ৯/১১ ও ষড়যন্ত্র তত্ত্বের বিস্তার
ভূ-রাজনৈতিক ও কৌশলগত এই ব্যর্থতার পাশাপাশি, প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের কারণে ৯/১১-এর স্মৃতিও নতুন প্রজন্মের কাছে সম্পূর্ণ ভিন্ন ও বিকৃতভাবে উপস্থাপিত হচ্ছে। নিউইয়র্ক সিটির সাবেক মেয়র মাইকেল ব্লুমবার্গ জানান, যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ১০ কোটির বেশি মানুষের বয়স এতই কম যে তাদের ৯/১১-এর কোনো স্মৃতি নেই। এই তরুণেরা এখন ইউটিউব ও টিকটকের মাধ্যমে ঘটনাটি জানছে। গুগল বা ইউটিউবে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা কতগুলো সিঁড়ি বেয়ে উঠেছিলেন কিংবা বিমান ছিনতাইকারী কারা ছিল—এসব নিয়ে প্রচুর সার্চ হচ্ছে। নেটফ্লিক্সে ‘টার্নিং পয়েন্ট: জেনারেশন ৯/১১’-এর মতো তথ্যচিত্রগুলো ব্যাপক দর্শকপ্রিয়তা পাচ্ছে। কিন্তু অ্যালগরিদমের কারণে ঐতিহাসিক সংবাদের পাশাপাশি ষড়যন্ত্র তত্ত্বও ছড়িয়ে পড়ছে, যা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে এবং মূল অপরাধীদের আড়াল করে দিচ্ছে।
ইতিহাসের ট্রমা যখন ‘টিকটক কনটেন্ট’
২৫ বছর আগের সেই সকালে মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলো অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সংবাদ সম্প্রচার করত। টম ব্রোকাও বা ড্যান রাদারদের মতো প্রখ্যাত সংবাদ পাঠকরা চরম অনিশ্চয়তা ও আতঙ্কের মাঝে জাতিকে সান্ত্বনা দেয়ার ক্ষেত্রে জাতীয় নেতার মতো ভূমিকা পালন করেছিলেন। জ্বলন্ত ভবন থেকে মানুষের নিচে লাফিয়ে পড়ার বিখ্যাত ছবি ‘ফলিং ম্যান’ বা অন্যান্য মর্মান্তিক দৃশ্য প্রচারের ক্ষেত্রে সাংবাদিকতার নীতি ও সংবেদনশীলতা বজায় রাখা হতো। কিন্তু বর্তমানে কোনো ধরনের ‘গেটকিপার’ বা সম্পাদক ছাড়াই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম এসব সংবেদনশীল ভিডিও তরুণদের সামনে বারবার তুলে ধরছে। এক প্রজন্মের সবচেয়ে বড় মানসিক ট্রমার স্মৃতি যখন অ্যালগরিদমের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের কাছে নিছক ‘টিকটক কনটেন্ট’ হিসেবে পৌঁছায়, তখন এর মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
