যাত্রীবেশে বাহক, লাগেজে চালান

মাদক পাচারের নিরাপদ রুট ‘রেলপথ’

ফন্ট সাইজ:

বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে প্রতিনিয়তই ঢুকছে মাদকের চালান। ইয়াবা, ফেনসিডিল, গাঁজা, হেরোইনসহ বিভিন্ন ধরনের ভয়ঙ্কর মাদক রেলপথ দিয়ে ছড়িয়ে পড়ছে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। সড়কপথে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা বাড়ায় রুট পরিবর্তন করছে পাচারকারীরা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন— রেলের জনবল সংকট, স্ক্যানার না থাকা ও তল্লাশির অভাবকে কাজে লাগিয়ে জামা-কাপড় ও পণ্যের আড়ালে এসব মাদক যাত্রীবেশে গন্তব্যে পৌঁছে দিচ্ছে সংঘবদ্ধ চক্র।

গোয়েন্দারা বলছে, একটি ট্রেনে অল্প সময়ে বিপুলসংখ্যক যাত্রী চলাচল করেন এবং একইসঙ্গে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ তৈরি হয়। আর এই সুযোগকেই কাজে লাগাচ্ছে মাদক পাচারকারীরা। এই কাজগুলো একাধিক ধাপে করা হচ্ছে। প্রতিটি ধাপেই রয়েছে আলাদা লোকবল। প্রথমে একটি গ্রুপ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের চোখ ফাঁকি দিয়ে পার্শ¦বর্তী দেশ ভারত বা মিয়ানমার থেকে সীমান্ত দিয়ে দেশের অভ্যন্তরে মাদকের চালান প্রবেশ করাচ্ছে। এরপর নির্দিষ্ট স্থানে মজুত রেখে বিভিন্ন লাগেজের আড়ালে ছোট ছোট চালান আকারে যাত্রীবেশে বাহকদের মাধ্যমে আখাউড়া, কসবা, বিজয়নগর, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাজশাহী, সিলেট, বেনাপোল, দর্শনাসহ বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় চলাচল করা লোকাল ট্রেনে তুলে দেয়। এরপর ওই চালানগুলো জেলা শহর ও বড় স্টেশন, জংশন ঘুরে আলাদা ট্রেনে চলে আসছে রাজধানীতে। রাজধানীতে ঢোকার পর কখনো ট্রেন সেøা করে, কখনো আবার স্টেশন দিয়েই নামানো হচ্ছে এসব মাদকের চালান। আর এসব কাজে অনেক সময়ই জড়িত থাকছে খোদ ট্রেনের চালক, ক্যান্টিনের স্টাফসহ বিভিন্ন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। শুধু যাত্রীবাহী নয় মালবাহী ট্রেনেও আসছে মাদকের বড় বড় চালান। সম্প্রতি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া রেলওয়ে জংশনে ঢাকাগামী একটি মালবাহী ট্রেনের ইঞ্জিন রুম থেকে ১৫ দশমিক ৭ কেজি গাঁজা উদ্ধার করে র‌্যাব। ওই ঘটনায় ট্রেনটির লোকোমাস্টারকেও গ্রেপ্তার করা হয়। গত ২৬শে জুনও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া রেলওয়ে স্টেশনে ঢাকা অভিমুখী ৬০৩ আপ কন্টেইনার মালগাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে বিশেষ কায়দায় লুকিয়ে রাখা বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধার করে র‌্যাব। র‌্যাব জানায়, মাদকটি সীমান্ত দিয়ে ভারত থেকে দেশে ঢোকার পর অভ্যন্তরীণ বাজারে সরবরাহের জন্য ট্রেনে তোলা হয়েছিল। গত ৪ঠা আগস্টও চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনে কক্সবাজার এক্সপ্রেস ট্রেনের এক স্টুয়ার্ডের কাছ থেকে ৪ হাজার ৮৫০টি ইয়াবা উদ্ধার করে র‌্যাব। এ ছাড়াও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এক যাত্রীর ওষুধের প্রেসক্রিপশন রাখা ফাইল থেকে ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। আবার নারীদের শরীরেও বিশেষ কায়দায় গাঁজা বহনের ঘটনাও ধরা পড়েছে।

গত জুনে কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রামগামী প্রবাল এক্সপ্রেসে অভিযান চালিয়ে প্রায় ২০ হাজার ইয়াবা উদ্ধার করে চট্টগ্রাম রেলওয়ে পুলিশ। ওই ঘটনায় একজনকে গ্রেপ্তারও করা হয়। গত ১৯শে জুলাই সন্ধ্যায় সান্তাহার রেলওয়ে স্টেশনে তিতুমীর এক্সপ্রেস ট্রেনে অভিযান চালিয়ে ৫০টি ট্যাপেন্টাডল ট্যাবলেট ও পাঁচটি নেশাজাতীয় ইনজেকশন উদ্ধার করেছে রেলওয়ে পুলিশ। একইদিন ভৈরব রেলওয়ে স্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকার সময় সিলেট থেকে ছেড়ে আসা ঢাকাগামী পারাবত এক্সপ্রেস ট্রেনে বিশেষ অভিযান চালিয়ে ১ কেজি ৭০০ গ্রাম গাঁজাসহ বোরহান (২৫) নামে এক মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ভৈরব রেল পুলিশ বলছে— শুধুমাত্র ভৈরব স্টেশনের প্ল্যাটফরম ও ট্রেনের ছাদে অভিযান চালিয়ে ২৩৯ কেজি গাঁজা এবং ১০ বোতল মদ উদ্ধার করেছে রেল পুলিশ ও র‌্যাব। এদিকে সম্প্রতি কুষ্টিয়ার মিরপুরে আন্তঃনগর ট্রেন থেকে ৫০ এমএলের ২১ বোতল ভারতীয় এলএসডি মাদক উদ্ধার করেছে বিজিবি। যার বাজার মূল্য প্রায় ১১ কোটি টাকা। এর আগে ২২শে, মে রাজশাহীর হরিয়ান রেলওয়ে স্টেশনে অভিযান চালিয়ে ঢাকাগামী ধূমকেতু এক্সপ্রেস ট্রেন থেকে ২০০ গ্রাম হেরোইনসহ লিজা তাবাসসুম (৩২) নামে এক নারীকে আটক করে পুলিশ। এর দু’দিন আগে বেনাপোল রেলস্টেশনে ভারত থেকে আসা একটি মালবাহী ট্রেনের ইঞ্জিনের নিচে বিশেষ কৌশলে লুকিয়ে রাখা মাদকজাতীয় ৩২০ বোতল এস্কাফ সিরাপ উদ্ধার করে বিজিবি। রেলওয়ে পুলিশের তথ্য বলছে, শুধু পাকশী রেলওয়ে জেলা পুলিশই ২০২৫ সালের ২০শে জুলাই থেকে ২০২৬ সালের ৩১শে জুলাই পর্যন্ত বিভিন্ন স্টেশন ও আন্তঃনগর, মেইল ও লোকাল ট্রেনে অভিযান চালিয়ে প্রায় ৩ কোটি ৭৪ লাখ ৪৭ হাজার ৮০০ টাকা মূল্যের মাদক উদ্ধার করেছে। এসব ঘটনায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৮৯ জনকে।

বেনাপোল আমদানি-রপ্তানি সমিতির সাধারণ সম্পাদক জিয়াউর রহমান বলেছেন, আমাদের স্থলবন্দর ও রেলপথ ব্যবহার করে মাদক প্রবেশ করছে। এতে নিরাপদ বাণিজ্য হুমকির মুখে পড়ছে। মাদক প্রবেশ রোধে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে নজরদারি বাড়াতে হবে। তা না আমাদের সামগ্রিক কার্যক্রম হুমকির মুখে পড়বে।

এসব বিষয়ে পাকশী রেলওয়ে জেলা পুলিশ সুপার মেহেদী হাসান বলেছেন, পাকশী রেলওয়ে জেলা পুলিশের আওতায় রাজশাহী, সান্তাহার, সিরাজগঞ্জ ও ঈশ্বরদী রেলওয়ে থানা রয়েছে। এ জেলার অধীনে বগুড়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, আমনূরা ও সিরাজগঞ্জ বাজারে চারটি পুলিশ ফাঁড়ি আছে। এ ছাড়া পাবনায় আরও একটি পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপনের প্রক্রিয়া চলছে। চলমান জনবল সংকটের মধ্যেও আমাদের প্রত্যেকটি রেলওয়ে পুলিশের সদস্য ও কর্মকর্তারা আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছেন। তিনি বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান আগে যেমন ছিল, এখন তার চেয়েও জোরদার করা হয়েছে। রেল এলাকা থেকে মাদক নির্মূলে আমাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে।