বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর যুগান্তকারী ও সময়োপযোগী উদ্যোগ ‘সঞ্জীবন প্রকল্প’-এর মাধ্যমে বাহিনীর বিশাল স্বেচ্ছাসেবক নেটওয়ার্ককে আত্মকর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২০২৬ সালের শুরু থেকে মাঠ পর্যায়ে উপজেলা ও গ্রাম পর্যায়ে ‘সঞ্জীবন প্লাটুন’ গঠনের কার্যক্রম জোরদারভাবে এগিয়ে চলছে। চাকরির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আনসার-ভিডিপির সদস্যদের দক্ষ, কর্মমুখী ও স্বাবলম্বী করে তোলাই এ প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য। এ প্রেক্ষাপটে বৃহস্পতিবার মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকুর সঙ্গে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবদুল মোতালেব সাজ্জাদ মাহমুদের সৌজন্য সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়।
সাক্ষাৎকালে সঞ্জীবন প্লাটুনের সদস্যদের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদভিত্তিক আত্মকর্মসংস্থানে সম্পৃক্ত করার সম্ভাবনা এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পারস্পরিক সহযোগিতার সুযোগ নিয়ে আলোচনা হয়। এ উদ্যোগের মাধ্যমে আনসার-ভিডিপির তৃণমূলভিত্তিক সাংগঠনিক কাঠামোকে দেশের উৎপাদন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
বাংলাদেশের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা, প্রাণিজ আমিষের চাহিদা পূরণ এবং গ্রামীণ কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাত গুরুত্বপূর্ণ। আনসার-ভিডিপির সদস্যদের শৃঙ্খলা, দায়িত্ববোধ, সংগঠিতভাবে কাজ করার সক্ষমতা এবং স্থানীয় পর্যায়ে বিস্তৃত উপস্থিতিকে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের লক্ষ্য ও সঞ্জীবন প্লাটুনের কর্মপরিকল্পনার সঙ্গে সমন্বিত করা গেলে তৃণমূল পর্যায়ে উৎপাদনশীলতা ও উদ্যোক্তা কার্যক্রম আরও সম্প্রসারিত করা সম্ভব। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কারিগরি নির্দেশনা ও গাইডলাইন অনুসরণ করে সঞ্জীবন প্লাটুনের উদ্যোক্তারা স্বল্প পুঁজিতে উন্নত জাতের গাভী, ছাগল,গাড়ল ও ভেড়া পালন এবং দেশি-বিদেশি জাতের মুরগির খামার গড়ে তুলতে পারেন। আনসার-ভিডিপির সদস্যদের দলগত উদ্যোগ, পারস্পরিক সহযোগিতা ও দায়িত্বশীল ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এসব খামার পরিচালিত হলে নিরাপদ মাংস ও দুধ উৎপাদনে কার্যকর অবদান রাখা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে মানসম্মত ও ভেজালমুক্ত পশুখাদ্য ব্যবহার, স্বাস্থ্যসম্মত খামার ব্যবস্থাপনা এবং নিরাপদ বাজারজাতকরণে তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।
এ ছাড়া মাছ চাষ, সমন্বিত মৎস্য চাষ এবং মৎস্যভিত্তিক ক্ষুদ্র উদ্যোগের মাধ্যমে আনসার-ভিডিপির সদস্যদের আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব। গ্রাম প্রতিরক্ষা দলের স্থানীয় নেটওয়ার্ক কাজে লাগিয়ে পুকুর, জলাশয় ও পতিত জমির পরিকল্পিত ব্যবহার নিশ্চিত করা যেতে পারে। এ লক্ষ্যে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ বিষয়ে কারিগরি প্রশিক্ষণ, উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ প্রদান করা হলে তৃণমূল পর্যায়ে দক্ষ মানবসম্পদ ও নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হবে এবং গ্রামীণ বেকারত্ব হ্রাসে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
সঞ্জীবন প্রকল্পকে আরও কার্যকর করতে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তার পাশাপাশি আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংকের মাধ্যমে সহজ শর্তে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ঋণের সুযোগ সৃষ্টি করা যেতে পারে। আনসার-ভিডিপির সদস্যদের জন্য প্রশিক্ষণ, ঋণ, উৎপাদন উপকরণ, পরামর্শ ও বাজারসংযোগের সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলা হলে তারা সংগঠিতভাবে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ পরিচালনা করতে পারবেন। এ ধরনের সমন্বিত উদ্যোগ সদস্যদের টেকসইভাবে উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সহায়ক হবে।
দেশের প্রায় ৬০ লক্ষ আনসার-ভিডিপি সদস্যের পরিবারকে উৎপাদনমুখী কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করে প্রায় ৩ কোটি মানুষের অর্থনৈতিক ও পুষ্টিগত উন্নয়নে অবদান রাখার সম্ভাবনা রয়েছে সঞ্জীবন প্রকল্পের। সঞ্জীবন প্লাটুনের মাধ্যমে মৎস্য, ডেইরি, পোল্ট্রি ও প্রাণিসম্পদ খাতের ক্ষুদ্র উদ্যোগ সম্প্রসারিত হলে প্রাণিজ আমিষের উৎপাদন বৃদ্ধি, পুষ্টির চাহিদা পূরণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং গ্রামীণ অর্থনীতির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে। পাশাপাশি আনসার-ভিডিপির সদস্যদের সামাজিক দায়িত্ববোধ ও জনকল্যাণমূলক ভূমিকা আরও সুদৃঢ় হবে।
সঞ্জীবন প্রকল্প আনসার-ভিডিপির স্বেচ্ছাসেবক সদস্যদের আত্মনির্ভরশীল করার পাশাপাশি দেশের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার একটি সম্ভাবনাময় উদ্যোগ। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর, মৎস্য অধিদপ্তর, আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরসমূহের সহযোগিতা ও সমন্বয়ের মাধ্যমে এ উদ্যোগ তৃণমূল পর্যায়ে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে পারে। আনসার-ভিডিপির সংগঠিত সদস্যশক্তিকে উৎপাদন, সেবা ও উদ্যোক্তা উন্নয়নের কাজে সম্পৃক্ত করে সঞ্জীবন প্রকল্প দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে একটি কার্যকর ও টেকসই মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।
