হামের প্রকোপে চট্টগ্রাম মেডিকেলে তীব্র বেড সংকট

হামের প্রকোপে চট্টগ্রাম মেডিকেলে তীব্র বেড সংকট

ফন্ট সাইজ:

চট্টগ্রামে কমছে না হামের প্রকোপ। প্রতিদিনই নতুন রোগী ভর্তি হওয়ায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হাম ওয়ার্ডে দেখা দিয়েছে তীব্র বেড সংকট। এক বেডে দুই থেকে তিনজন, কোথাও চার শিশুকেও রাখা হচ্ছে। জায়গা না পেয়ে অনেক রোগীর ঠাঁই হয়েছে মেঝেতে। হামের পাশাপাশি আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে নিউমোনিয়ার জটিলতাও বাড়ছে। চিকিৎসকদের মতে, হামে আক্রান্ত শিশুদের প্রায় ৫ থেকে ৮ শতাংশের মধ্যে নিউমোনিয়া দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে অপুষ্টিতে ভোগা, কম ওজন নিয়ে জন্ম নেয়া এবং দুর্বল রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতার শিশুদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেশি। গুরুতর অবস্থায় অনেক শিশুকেই নিতে হচ্ছে পেডিয়াট্রিক ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (পিআইসিইউ)।

চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয়ের মঙ্গলবার প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে নতুন করে ৫৮ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। সবাই চট্টগ্রাম মহানগর এলাকার বাসিন্দা। এ নিয়ে জেলায় সন্দেহজনক হামের রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৪৬৪ জনে। গত ২৪ ঘণ্টায় চিকিৎসা শেষে মহানগরের ৭৫ জন এবং উপজেলা পর্যায়ের একজনসহ মোট ৭৬ জন রোগী হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন। এ পর্যন্ত সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৭ হাজার ১৮৮ জন। বর্তমানে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ২৭৬ জন সন্দেহজনক হামের রোগী। তাদের মধ্যে ২৭৪ জন মহানগর এবং দু’জন উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসাধীন।

স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যমতে, এ পর্যন্ত ল্যাব পরীক্ষায় ৭৪৩ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। তবে গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন কোনো নিশ্চিত রোগী শনাক্ত হয়নি এবং নমুনাও সংগ্রহ করা হয়নি। এখন পর্যন্ত ১ হাজার ৯৬০টি নমুনা পরীক্ষা বা পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। হাম সন্দেহে আক্রান্ত হয়ে এ পর্যন্ত চট্টগ্রামে ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে ১০ জন মহানগরের এবং দু’জন উপজেলার বাসিন্দা। অন্যদিকে, ল্যাব পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়া হামে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে তিনজনের—একজন মহানগরে এবং দু’জন উপজেলায়। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা গেছে, রোগীর চাপে নির্ধারিত বেডের পাশাপাশি অতিরিক্ত বেড বসিয়েও জায়গা দেয়া যাচ্ছে না। কোথাও একটি বেডে একাধিক শিশুকে রাখা হয়েছে। এতে চিকিৎসা দিতে যেমন হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসকরা, তেমনি চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন স্বজনরা। হাসপাতালের মেঝেতে দাদির কোলে শুয়ে আছে ৪ মাস বয়সের শাওন আহমেদ। মা আর দাদি চারদিন আগে হাম সন্দেহে হাসপাতালে নিয়ে এলে কর্তব্যরত চিকিৎসক ভর্তি করান। পরদিন পরীক্ষায় হাম শনাক্ত হয় তার। তার মা আক্তার বলেন, কাজের সন্ধানে ময়মনসিংহ থেকে চট্টগ্রামের কর্ণফুলীতে বসবাস করছি। হাসপাতালে ছেলেকে ভর্তি করেছি। হাম এর সঙ্গে সঙ্গে আরও জটিল রোগের লক্ষণ ও দেখা দিয়েছে। চিকিৎসকরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা দিয়েছে। সেগুলো করাতে হবে। আটদিন ধরে জ্বর ও শরীরে লালচে ফুসকুড়ি নিয়ে অসুস্থ ছিল লাবিবা। জ্বর কমে যাওয়ার পর তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। কিন্তু বেড না পেয়ে মেঝেতে থাকা একটি বেডে আরও দুই শিশুর সঙ্গে তাকে রাখা হয়েছে। রাতে মেয়েকে কোলে নিয়েই বসে থাকতে হচ্ছে তার মা সেলিনা বেগমকে। তিনি বলেন, একটা রোগীর মধ্যে চারটা রোগী। দুইটা রোগী রাখছে, আমারটা কোলে নিয়ে বসে থাকছি। ফেনী থেকে চিকিৎসা নিতে আসা তিন বছরের শরিফুলের মা ফুলি আক্তার বলেন, এক বেডে তিনজন শিশুকে রাখায় তাদের ঠিকমতো শোয়ানো, খাওয়ানো কিংবা যত্ন নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। কর্ণফুলীর চরলক্ষ্যা থেকে আসা রাবেয়া আক্তার জানান, শিশুর জ্বর কিছুটা কমলেও কাশি ও বুকের সমস্যা ভালো হচ্ছে না। চিকিৎসকরা বলছেন, হামের পরও শিশুদের শারীরিক জটিলতা দেখা দিতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে হাম সেরে যাওয়ার এক থেকে দুই সপ্তাহ পর নিউমোনিয়া কিংবা শ্বাসকষ্ট নিয়ে আবার হাসপাতালে আসছে শিশুরা। হামের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আইসোলেশন নিশ্চিত করার ওপর জোর দিচ্ছেন চিকিৎসকরা। তাদের মতে, আক্রান্ত শিশুকে প্রয়োজন ছাড়া হাসপাতালে না এনে বাড়িতে আইসোলেশনে রাখা গেলে সংক্রমণের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু রোগ বিভাগের হাম ফোকাল পার্সন ডা. ফারহানা জেরিন বলেন, সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে পোস্ট-মিজেলস কমপ্লিকেশন। হাম সেরে যাওয়ার পরও অনেক শিশুর নিউমোনিয়া বেড়ে যাচ্ছে এবং তীব্র শ্বাসকষ্ট নিয়ে হাসপাতালে আসছে। এসব রোগীর অবস্থা তুলনামূলকভাবে বেশি খারাপ থাকে। শিশু রোগ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. মুসা মিয়া বলেন, রোগীর চাপ এতটাই বেশি যে ১৬টি বেডে দুই থেকে তিনজন করে, কোথাও চারজন পর্যন্ত শিশুকে রাখতে হচ্ছে। অতিরিক্ত বেডেও রোগী রাখতে হচ্ছে। তবে সাধারণ ওয়ার্ডে তাদের রাখা সম্ভব নয়, কারণ এতে অন্য রোগীদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তসলিম উদ্দীন বলেন, কোভিড-১৯-এর সময় যেভাবে কঠোরভাবে আইসোলেশন মেনে চলা হয়েছিল, হামের ক্ষেত্রে তা যথাযথভাবে হচ্ছে না। ফলে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ছে। তিনি বলেন, হামের সব রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করার প্রয়োজন নেই। শ্বাসকষ্ট বা রেসপিরেটরি ডিস্ট্রেস, এনকেফালাইটিসের লক্ষণ, অস্বাভাবিক ঘুমঘুম ভাব বা অস্বাভাবিক জ্বরের মতো গুরুতর উপসর্গ দেখা দিলে তখন হাসপাতালে ভর্তি করা উচিত।