রাষ্ট্র সংস্কার, গণতন্ত্র ও নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত

ফ্যাসিবাদ-পরবর্তী বাংলাদেশ

রাষ্ট্র সংস্কার, গণতন্ত্র ও নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত

ফন্ট সাইজ:

ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থার পতনের পর কীভাবে এমন একটি রাষ্ট্র নির্মাণ করা যায়, যেখানে আবার কোনো ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠী রাষ্ট্রযন্ত্রকে নিজেদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার হাতিয়ার বানাতে না পারে?

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সংস্কার-আলোচনায় সংবিধান, নির্বাচন, বিচার বিভাগ, প্রশাসন, পুলিশ ও দুর্নীতি দমন ব্যবস্থাকে পুনর্গঠনের প্রশ্ন সামনে এসেছে। জুলাই জাতীয় সনদেও এসব ক্ষেত্রে কাঠামোগত সংস্কারের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

আমাদের অনুধাবন আবশ্যক যে, ফ্যাসিবাদের পতন মানেই ফ্যাসিবাদের অবসান নয়; ফ্যাসিবাদী কাঠামো, সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন ভেঙে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন করা না গেলে তার পুনরুত্থানের ঝুঁকি থেকেই যাবে।

১. ফ্যাসিবাদের পতনের পর প্রথম প্রশ্ন-রাষ্ট্র কি বদলেছে?

একটি সরকার বা রাজনৈতিক দলের পতন এবং রাষ্ট্রব্যবস্থার গণতান্ত্রিক রূপান্তর এক বিষয় নয়। যদি একই প্রশাসনিক সংস্কৃতি, একই জবাবদিহিহীন ক্ষমতার কাঠামো, একই রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা, একই আইন প্রয়োগের সংস্কৃতি এবং একই ধরনের দলীয়করণ থেকে যায়, তাহলে শুধু ক্ষমতার পালাবদলকে রাষ্ট্র সংস্কার বলা যায় না।

এখানে প্রশ্ন হতে পারে-আমরা কি শুধু শাসক পরিবর্তন চাই, নাকি শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন চাই? এটিই জনমনে আজকের অন্যতম কেন্দ্রীয় প্রশ্ন!

২. রাষ্ট্র সংস্কার: প্রতিশোধ নয়, প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন

ফ্যাসিবাদী বা কর্তৃত্ববাদী শাসনের পরে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো Justice ও Revenge এর পার্থক্য নির্ণয় করা। প্রতিশোধের বদলে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা।

অতীতের হত্যাকাণ্ড, গুম, নির্যাতন, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিচার প্রয়োজন; কিন্তু বিচার হতে হবে আইনের শাসন, প্রমাণ ও ন্যায়সংগত প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে। অন্যথায় আজকের বিজয়ী শক্তি আগামী দিনের নতুন নিপীড়ক হয়ে উঠতে পারে।

আমাদের মনে রাখতে হবে- রাষ্ট্র সংস্কারের তিনটি ভিত্তি: জবাবদিহি, আইনের শাসন ও মানবিক মর্যাদা।

৩. সংবিধান সংস্কার: ক্ষমতার কেন্দ্র কোথায় থাকবে?

এক্ষেত্রে মূল প্রশ্ন হচ্ছে—রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য কী হবে?, প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার মেয়াদ সীমিত হবে কি?, সংসদ কতটা কার্যকর হবে?, বিরোধী দল কি বাস্তব সাংবিধানিক সুবিধা পাবে?, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কীভাবে নিশ্চিত হবে?, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে দলীয় প্রভাবমুক্ত থাকবে?

জুলাই জাতীয় সনদে প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিত করা, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা পুনর্বিন্যাস, সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকা বৃদ্ধি, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও মৌলিক অধিকারের মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

এখানে স্পষ্ট বক্তব্য হচ্ছে-সংবিধান শুধু ক্ষমতা বণ্টনের দলিল নয়; এটি ক্ষমতার অপব্যবহার ঠেকানোরও প্রধান প্রাচীর।

৪. নির্বাচন সংস্কার: ভোটের অধিকার থেকে ক্ষমতার বৈধতা

ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার একটি বিপজ্জনক বৈশিষ্ট্য হলো-নির্বাচন থাকে, কিন্তু প্রকৃত রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা থাকে না। তাই নির্বাচন সংস্কারের প্রশ্নে শুধু ভোটের দিনটি নয়, পুরো নির্বাচন-ব্যবস্থাকে দেখতে হবে: নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, প্রার্থী মনোনয়ন, প্রচার, অর্থায়ন, ভোটগ্রহণ, ফলাফল ও ফলাফলের গ্রহণযোগ্যতা।

সাম্প্রতিক সংস্কার প্রক্রিয়াতেও নির্বাচন কমিশন ও নির্বাচনী ব্যবস্থার স্বাধীনতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব এসেছে।

৫. বিচার বিভাগ: রাষ্ট্রের ভয় নয়, নাগরিকের আশ্রয়

এক্ষেত্রে শক্তিশালী প্রশ্ন হচ্ছে-একজন সাধারণ নাগরিক যদি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ন্যায়বিচার চাইতে যায়, সে কি রাষ্ট্রকে ভয় করবে, নাকি আদালতের ওপর আস্থা রাখবে?

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা শুধু বিচারকদের স্বাধীনতা নয়। এটা হতে হবে—নির্বাহী বিভাগের প্রভাবমুক্ত বিচার, স্বচ্ছ নিয়োগ, বিচারিক জবাবদিহি, দ্রুত বিচার, রাজনৈতিক মামলার অপব্যবহার বন্ধ ও নাগরিকের মৌলিক অধিকার রক্ষা।

৬. প্রশাসন ও পুলিশ: সরকারের নয়, রাষ্ট্রের কর্মচারী

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রশাসন কোনো দলের ‘ক্যাডার’ নয়। পুলিশ কোনো সরকারের ‘রাজনৈতিক বাহিনী’ নয়। তাদের আনুগত্যের কেন্দ্র হবে সংবিধান, আইন, রাষ্ট্র ও জনগণ। তাই, জুলাই সংস্কার আলোচনায় জনপ্রশাসন এবং পুলিশ সংস্কারও রাষ্ট্র সংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে এসেছে।

ফলে, এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে সরকার বদলালে কি প্রশাসনের আনুগত্যও বদলাবে, নাকি প্রশাসন সাংবিধানিকভাবে নিরপেক্ষ থাকবে?

৭. গণমাধ্যম: ফ্যাসিবাদবিরোধী রাষ্ট্রে মিডিয়ার স্বাধীনতা

শুধু ‘মিডিয়া স্বাধীন’ বললেই হবে না। প্রশ্ন হবে—সাংবাদিক কি সরকারের সমালোচনা করতে পারবেন?, মালিকানা কাঠামো কতটা স্বচ্ছ?, রাষ্ট্রীয় বিজ্ঞাপন কি রাজনৈতিক চাপের হাতিয়ার হবে?, ডিজিটাল নিরাপত্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার মধ্যে ভারসাম্য কী?, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত হবে?

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সরকারপন্থী মিডিয়া যেমন প্রয়োজনীয় নয়, তেমনি বিরোধীপন্থী মিডিয়াও রাষ্ট্রীয় সুবিধাভোগী হওয়া উচিত নয়। প্রয়োজন স্বাধীন মিডিয়া।

৮. রাজনৈতিক সংস্কার: নতুন শাসক যেন পুরোনো পথ না নেয়

‘নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত’ কেবল স্লোগান নয়, বাস্তবে নতুনত্ব ও নান্দনিকতা নিয়ে আসতে হবে। এটি রাষ্ট্র ও সমাজে গভীর সংস্কারের মাধ্যমে নতুনত্ব ফুটিয়ে তোলার অঙ্গীকার। বাংলাদেশে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে এই ধারণাটি রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি প্রধান আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো: ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করা দল ক্ষমতায় গিয়ে নিজেরাই কি পুরানো বা সেকেলে রাজনৈতিক সংস্কৃতি অনুসরণ করছে? এক্ষেত্রে প্রয়োজন হচ্ছে—দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র, নেতৃত্ব নির্বাচনে স্বচ্ছতা, দলীয় অর্থের হিসাব, প্রার্থী মনোনয়নে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, রাজনৈতিক সহিংসতা বর্জন, বিরোধী দলের অধিকারকে সম্মান, সরকার এবং বিরোধী দল একসঙ্গে জাতীয় পরিমণ্ডলে কাজ করা, যেখানে বিরোধী দল সরকারের নীতি, কার্যক্রম এবং সিদ্ধান্ত পর্যবেক্ষণ করতে পারে।

এক কথায়, সংসদীয় ব্যবস্থার আধুনিক রাজনৈতিক কাঠামোতে গণতন্ত্র শুধু রাষ্ট্রে নয়, রাজনৈতিক দলের ভেতরেও প্রতিষ্ঠিত হতে হবে।

৯. অর্থনৈতিক ক্ষমতা ও রাজনৈতিক ক্ষমতার সম্পর্ক

ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থা শুধু রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান দখল করে না; অনেক সময় অর্থনীতি, ব্যবসা, ব্যাংকিং, ঠিকাদারি, গণমাধ্যম ও আমলাতন্ত্রের সঙ্গে একটি ক্ষমতার নেটওয়ার্ক তৈরি করে।

তাই রাষ্ট্র সংস্কারের সঙ্গে দরকার দুর্নীতি দমন, সম্পদের স্বচ্ছতা, ব্যাংকিং খাতে জবাবদিহি, রাজনৈতিক অর্থায়নের স্বচ্ছতা, সরকারি ক্রয়ে স্বচ্ছতা। আর এগুলো রাষ্ট্র সংস্কারের ধারাবাহিকতায় গণতন্ত্র, সুশাসন, দুর্নীতি প্রতিরোধ ও রাজনৈতিক দলগুলোর জবাবদিহির ওপর নির্ভর করে।

১০. সংখ্যাগরিষ্ঠতার গণতন্ত্র নয়-অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র

এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গণতন্ত্র মানে শুধু ‘সংখ্যাগরিষ্ঠ যা চাইবে তাই হবে’ নয়। একটি প্রকৃত গণতন্ত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠের পাশাপাশি সংখ্যালঘু, নারী, তরুণ, ভিন্নমতাবলম্বী, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক সম্প্রদায় রাজনৈতিক বিরোধী পক্ষ সবার সমান অধিকার থাকবে। কারণ আজ যে সংখ্যাগরিষ্ঠ, কাল সে সংখ্যালঘু হতে পারে।

১১. জুলাইয়ের চেতনা বনাম দলীয় মালিকানা

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক-দার্শনিক প্রশ্ন তোলা যায়: কোনো গণআন্দোলনের চেতনা কি একটি দল বা গোষ্ঠীর একক সম্পত্তি হতে পারে?
জুলাই আন্দোলনকে যদি রাষ্ট্র সংস্কারের ঐতিহাসিক ভিত্তি হিসেবে দেখা হয়, তাহলে তার মূল মূল্যবোধ হতে হবে: ন্যায়, মর্যাদা, স্বাধীনতা, বৈষম্যহীনতা, জবাবদিহি ও গণতন্ত্র।

জুলাই জাতীয় সনদও রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিক সংস্কারের প্রশ্নকে এই বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত করেছে। তবে এখানে সমালোচনামূলক অবস্থানও জরুরি। রাজনৈতিক ঐকমত্য যত গুরুত্বপূর্ণ, ততটাই গুরুত্বপূর্ণ মতভিন্নতার সাংবিধানিক স্বীকৃতি।

১২. ‘নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত’ বলতে কী বোঝাবে?

এখানে আলোচনার সবচেয়ে মৌলিক তাত্ত্বিক অংশ হচ্ছে-নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত মানে শুধু নতুন সরকার নয়, বরং গভীরভাবে বুঝতে পারা ক্ষমতার মালিক কে? রাষ্ট্রের মালিক কে? উত্তর হবে: জনগণ। অর্থাৎ রাষ্ট্র কোনো দল, নেতা, পরিবার, আমলা, ব্যবসায়ী গোষ্ঠী বা নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়।

নতুন বন্দোবস্তের মূলনীতিতে জনগণের সার্বভৌমত্ব, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা, রাজনৈতিক বহুত্ববাদ, আইনের শাসন, মানবাধিকার ও জবাবদিহি অপরিহার্য।

১৩. সবচেয়ে বড় বিপদ: নতুন ‘ফ্যাসিবাদ’ নয়, নতুন ‘কর্তৃত্ববাদ’

এই আলোচনায় শক্তিশালী সতর্কতা হবে-ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা ফ্যাসিবাদের পতন নয়; ফ্যাসিবাদ পতনের পর বিজয়ী শক্তি কতটা গণতান্ত্রিক থাকে-সেটিই আসল পরীক্ষা।

একজন নেতা বদলালেই যদি—বিরোধী কণ্ঠ দমন হয়, সংবাদমাধ্যম নিয়ন্ত্রিত হয়, প্রশাসন দলীয় হয়, পুলিশ রাজনৈতিক হয়, নির্বাচন নিয়ন্ত্রিত হয়, বিচার বিভাগ প্রভাবিত হয়, তাহলে নাম বদলাচ্ছে, ব্যবস্থা বদলায়নি।

বাংলাদেশের সামনে এখন কেবল সরকার পরিবর্তনের সুযোগ নয়-রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের সম্পর্ক পুনর্নির্ধারণের সুযোগ এসেছে। ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রের পতনের পর আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নির্মাণ, যেখানে কোনো নেতা রাষ্ট্রের ঊর্ধ্বে নন, কোনো দল সংবিধানের ঊর্ধ্বে নয় এবং কোনো প্রতিষ্ঠান জনগণের জবাবদিহির বাইরে নয়।

এক্ষেত্রে বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় আবেগের চেয়ে দেশ ও সমাজের দীর্ঘমেয়াদী কল্যাণে রাষ্ট্রদর্শন ও ভবিষ্যৎ-ভাবনাকে আধিক্য দিতে হবে। নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের সাফল্য তখনই হবে, যখন ক্ষমতার কেন্দ্র ব্যক্তি থেকে প্রতিষ্ঠানে, দল থেকে রাষ্ট্রে এবং শাসকের ইচ্ছা থেকে আইনের শাসনে স্থানান্তরিত হবে।

শেষ কথা হবে, ফ্যাসিবাদকে পরাজিত করার শেষ ধাপ ক্ষমতা দখল নয়-ক্ষমতাকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা।
লেখক: দৈনিক সময় ও মানব টিভি সম্পাদক, কবি ও কথাসাহিত্যিক।