২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার ২৫ বছর পূর্তির আগে দেশটিতে মুসলিমবিদ্বেষ বা ইসলামোফোবিয়ার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, এত বছর পেরিয়ে গেলেও যুক্তরাষ্ট্রে ইসলামোফোবিয়া কি আগের চেয়ে আরও গভীর হয়েছে?
বৃটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের ‘স্টেটসাইড উইথ কাই অ্যান্ড কার্টার’ পডকাস্টের সাম্প্রতিক এক পর্বে সাংবাদিক রোজিনা আলী যুক্তরাষ্ট্রে ইসলামোফোবিয়ার ইতিহাস, ৯/১১-পরবর্তী পরিবর্তন এবং মুসলিম আমেরিকানদের ওপর এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে আলোচনা করেছেন।
রোজিনা আলী জানান, ৯/১১ হামলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তার বাবা-মা তাকে বলেছিলেন, মুসলিম হিসেবে তাদের এখন সন্দেহের চোখে দেখা হবে। তখন তিনি কথাটির গভীরতা বুঝতে পারেননি। সময়ের সঙ্গে তিনি উপলব্ধি করেন, ৯/১১-এর পর মুসলিমদের ঘিরে সন্দেহ ও বৈরিতা কীভাবে মার্কিন সমাজের বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে পড়ে।
রোজিনা গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্রে ইসলামোফোবিয়ার ইতিহাস নিয়ে কাজ করছেন। তার মতে, ৯/১১-এর পর পরবর্তী বিভিন্ন মার্কিন প্রশাসনের নেয়া নীতি ও পদক্ষেপ মুসলিমদের বিরুদ্ধে বিদ্যমান পূর্বধারণাকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে ভূমিকা রেখেছে। এর প্রভাব শুধু রাজনীতি বা নিরাপত্তানীতিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং মার্কিন সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রেও এর প্রতিফলন দেখা গেছে।
গার্ডিয়ানের পডকাস্টে রোজিনা আলী যুক্তরাষ্ট্রে ইসলামোফোবিয়ার বিকাশকে ৯/১১-এর পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে যুক্ত করে দেখিয়েছেন। সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ, নিরাপত্তানীতি এবং মুসলিমদের ঘিরে তৈরি হওয়া সন্দেহের পরিবেশ কীভাবে দীর্ঘ সময় ধরে টিকে আছে, সেটিও আলোচনায় উঠে এসেছে।
তার আলোচনায় উঠে আসে, ৯/১১-এর পর মুসলিম আমেরিকানদের অনেকেই নিজেদের ‘অন্য’ হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন। এই প্রবণতা সময়ের সঙ্গে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্কের মধ্য দিয়ে নতুন রূপ পেয়েছে।
২৫তম বার্ষিকীর আগে নিউইয়র্কের প্রথম মুসলিম মেয়র জোহরান মামদানিকে ঘিরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তাতেও ইসলামোফোবিয়ার অভিযোগ সামনে এসেছে।
সাবেক নিউইয়র্ক মেয়র রুডি জুলিয়ানি মামদানিকে ৯/১১ স্মরণ অনুষ্ঠানে অংশ না নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন এবং তার মুসলিম পরিচয়কে কেন্দ্র করে মন্তব্য করেছেন।
মামদানি অবশ্য নিহতদের পরিবার ও হামলার প্রথম প্রতিক্রিয়াদাতাদের সম্মান জানাতে অনুষ্ঠানে অংশ নেয়ার সিদ্ধান্তে অটল রয়েছেন।
নিউইয়র্কে ৯/১১-এর ২৫তম বার্ষিকী উপলক্ষে মামদানি ১১ সেপ্টেম্বরকে ‘ডে অব রিমেমব্র্যান্স অ্যান্ড সার্ভিস’ হিসেবে পালনের ঘোষণা দিয়েছেন। তার উদ্যোগের পাশাপাশি তাকে অনুষ্ঠান থেকে বাদ দেয়ার দাবিতে একটি অনলাইন পিটিশনও হয়েছে, যাতে প্রায় এক লাখ মানুষ স্বাক্ষর করেছেন।
৯/১১-এর পর যুক্তরাষ্ট্রে যে সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তন শুরু হয়েছিল, তার প্রভাব এখনও দৃশ্যমান বলে মনে করেন বিশ্লেষকদের অনেকে।
গার্ডিয়ানের আলোচনায় রোজিনা আলী যে প্রশ্নটি সামনে এনেছেন, তা হলো, একটি ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার স্মৃতি কীভাবে একটি পুরো জনগোষ্ঠীর প্রতি দীর্ঘস্থায়ী সন্দেহ ও বৈরিতায় রূপ নিতে পারে।
