জ্বালানি সংকট উত্তরণে সংসদে বিরোধী দলের ৪ প্রস্তাব, সরকারের পরিকল্পনা তুলে ধরলেন প্রতিমন্ত্রী

জ্বালানি সংকট উত্তরণে সংসদে বিরোধী দলের ৪ প্রস্তাব, সরকারের পরিকল্পনা তুলে ধরলেন প্রতিমন্ত্রী

ফন্ট সাইজ:

দেশের চলমান জ্বালানি সংকট সমাধানে শিল্পকারখানাগুলোকে উৎপাদনকারীদের কাছ থেকে সরাসরি বিদ্যুৎ কেনার সুযোগসহসংসদে চারটি প্রস্তাব দিয়েছে প্রধান বিরোধী দল জামায়াত। একইসঙ্গে সরকার ও বিরোধী দলের সমন্বয়ে টাস্কফোর্স সেল গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়।

তবে বিরোধী দলের প্রস্তাবে নতুন কিছু নেই বলে মন্তব্য করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ ইসলাম অমিত। জ্বালানি সংকট সমাধানে সরকারের বেশ কিছু পরিকল্পনা তুলে ধরেন তিনি। বিগত সরকারের ভুল নীতির কারণে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে বর্তমান সংকট সৃষ্টি হয়েছে উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, এ সংকট থেকে উত্তরণে সরকারের সুস্পষ্ট স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা রয়েছে। সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদের অধিবেশনে “তীব্র জ্বালানি ও গ্যাস সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, শিল্প কারখানা বন্ধ হয়ে বেকারত্ব সৃষ্টি এবং দেশের জাতীয় অর্থনীতিতে মারাত্মক বিপর্যয় রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ” শীর্ষক প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।

১৭ বছরের জঞ্জাল ৬ মাসে পরিষ্কার সম্ভব নয়:স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
বিদ্যুৎ খাতে আর কোনো ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ (উৎপাদন না করলেও কেন্দ্র ভাড়ার টাকা) দেওয়া হবে না বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, নতুন করে যে তিনটি রেন্টাল পাওয়ার কোম্পানিকে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, তা ‘নো পাওয়ার, নো মানি’ বা ‘বিদ্যুৎ দিলে টাকা, না দিলে নাই’ ভিত্তিতে করা হয়েছে। অর্থাৎ কোনো ক্যাপাসিটি চার্জ দেওয়া হবে না।

ফ্যাসিবাদী সিস্টেম ও টাইকুনদের লালন-পালনের সমালোচনা:
বিরোধী দলের উত্থাপিত প্রস্তাবের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পরই সারা পৃথিবীতে গালফ ওয়ারের (উপসাগরীয় যুদ্ধ) প্রভাবে জ্বালানি সংকট শুরু হয়। তা সত্ত্বেও বোরো মৌসুমে কৃষকদের যেন কোনো ক্ষতি না হয়, সেজন্য সরকার ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত জ্বালানি তেলের দাম এক পয়সাও বাড়ায়নি। পরবর্তীতে পাচার রোধে বাধ্য হয়ে সহনীয় মাত্রায় দাম সমন্বয় করা হয়েছে, যার কোনো ক্ষতিকর প্রভাব দেশের অর্থনীতি বা বাজেটে পড়েনি।
বিগত সরকারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, “বিগত সরকার গ্যাস বা জ্বালানি কোথা থেকে আসবে, তা নিশ্চিত না করেই একের পর এক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করেছে। দেশের ভেতরে গ্যাস অনুসন্ধান না করে তারা বিদেশ নির্ভরতা বাড়িয়েছে। শুধু নিজেদের দলের টাইকুন বা লুটেরাদের প্রতিপালন করার জন্য তারা বিদেশ থেকে গ্যাস আমদানির ব্যবস্থা করেছে।”

ক্যাপাসিটি চার্জ প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, “এই ক্যাপাসিটি চার্জের বিষয়টি ফ্যাসিবাদী শেখ হাসিনা রেখে গিয়েছেন, যা আমরা ইনহেরিট (উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত) করেছি। কিন্তু এখন বিদ্যুতের প্রয়োজনে প্রধানমন্ত্রী যে নতুন রেন্টাল পাওয়ার অনুমোদন দিয়েছেন, সেখানে কোনো ক্যাপাসিটি চার্জ নেই।”

রাতারাতি চুক্তি বাতিলের সুযোগ নেই:
বর্ডার পেরিয়ে বিদেশ থেকে বিদ্যুৎ আমদানি প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, “আমরা জানি ওভার প্রাইজড (অতিরিক্ত দাম) দিয়ে জাতির পয়সা অপচয় করে বিদ্যুৎ আমদানির ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু আমরা যদি এখন সেই চুক্তি বন্ধ করে দেই, তবে বিষয়টি আন্তর্জাতিক আর্বিট্রেশনে (সালিশি) যাবে এবং বিদ্যুৎ সাপ্লাই বন্ধ হয়ে যাবে। এমনিতেই আমাদের বিদ্যুতের সংকট, এই মুহূর্তে আমরা ১৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ হারানোর ঝুঁকি নিতে পারি না। রাষ্ট্র পরিচালনায় ধৈর্য সহকারে এগোতে হয়।”

সংকট সমাধানে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা:
জ্বালানি সংকট সমাধানে সরকারের নানা পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মাতারবাড়ীতে ল্যান্ড বেইজড (স্থলভিত্তিক) এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে প্রায় এক হাজার এমএমসিএফডি গ্যাস পাওয়া যাবে।
চায়নার সঙ্গে জি-টু-জি ভিত্তিতে মাতারবাড়ীতে ১৮ মাসের মধ্যে তৃতীয় এফএসআরইউ (ভাসমান টার্মিনাল) স্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়েছে।

বড়পুকুরিয়ায় দেশীয় কয়লা দিয়ে ৬২০ মেগাওয়াটের নতুন একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু করা হবে। পায়রায় দ্বিতীয় ধাপে ১৩২০ মেগাওয়াটের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের আলোচনা চলছে। মাতারবাড়ীতে এলপিজি গ্যাসের টার্মিনাল ও স্টোরেজ নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং উইন্ডমিলের (বায়ুবিদ্যুৎ) বড় পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, “বিগত ১৭ বছরের জঞ্জাল, ফ্র্যাজাইল (ভঙ্গুর) ব্যাংকিং, ফ্র্যাজাইল বিদ্যুৎ ব্যবস্থা আমরা ইনহেরিট করেছি। ছয় মাসের ভেতরে এই ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থা ওভারহলিং করে (ঢেলে সাজানো) সব সমস্যার সমাধান করে ফেলা সম্ভব নয়। তবে প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেছেন, মানুষের যে ভোগান্তি হচ্ছে তা আমাদের সৃষ্ট নয়, এটি বিগত সরকারের রেখে যাওয়া জঞ্জালের ফল।

বিদ্যুৎ সংকটে দেশ আজ পাওয়ারলেস, আমরা ক্রেডিট চাই না, সমাধান চাই’: বিরোধী দলের নেতা
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট সমাধানে সরকারের কাছে কোনো ‘ক্রেডিট’ না চেয়ে নিঃস্বার্থভাবে টেকনিক্যাল এক্সপার্ট টিমের সহায়তার পাশাপাশি, এই সংকট কাটাতে মুখে আশ্বাস না দিয়ে বাস্তবসম্মত ও সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ জাতির সামনে তুলে ধরার দাবি জানিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান।

সংসদে দেওয়া সরকারের প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবের মিল না থাকার অভিযোগ করে শফিকুর রহমান বলেন, আমরা সরকারের পদক্ষেপে আশাবাদী। তবে কনফিউশন তৈরি হয় যখন দেখি সংসদে দেওয়া খোলামেলা আশ্বাস বাস্তবায়ন হচ্ছে না। যেমন—বলা হয়েছিল মিটার চার্জ, ডিমান্ড চার্জ আর নেওয়া হবে না, কিন্তু ঠিকই নেওয়া হচ্ছে। ভুতুড়ে বিলের সমাধানের কথাও বলা হয়েছিল, কিন্তু তা কন্টিনিউ করছে। জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে না পারলে আমাদের প্ল্যান যত সুন্দরই হোক, সব ব্যর্থ হবে।

তিনি আরও বলেন, বিদ্যুৎ খাতে ক্যাপাসিটি চার্জের টাকা দিয়ে মূলত জনগণের টাকা ডাকাতি হয়ে যাচ্ছে। আমরা কাউকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে চাই না, কিন্তু এর সমাধান হওয়া উচিত। এই দুষ্ট চক্র থেকে জাতি বের হতে না পারলে কোনো নিস্তার নেই।

‘লংমার্চে বিদ্যুতের সাথে মোলাকাত হয়নি’
লোডশেডিংয়ের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, “দেশের ৮০ ভাগ লোক গ্রামে বসবাস করে। তাদের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। কোথাও কোথাও ১২-১৪ ঘণ্টা কারেন্ট থাকে না। লংমার্চের সময় আমরা বিভিন্ন জেলা ও বাজারে থেমেছি। প্রথমে বিদ্যুৎ দেখেছি, এরপর সীতাকুণ্ড পৌঁছানোর পর বিদ্যুতের সাথে আবার মোলাকাত হয়েছে। মাঝখানে হয়নি। এটাই সারা দেশের চিত্র।”

সংকট গোপন না করে সত্য স্বীকার করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “মহান সংসদে দাঁড়িয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত লোকেরা বলেছেন, কোনো সংকট নেই! এসব হাস্যকর কথা বলে জাতির সাথে তামাশা করা উচিত নয়। আমাদের কী আছে আর কী নেই, তা জাতিকে বলে দেওয়া উচিত। তাহলে জাতি মানসিকভাবে প্রস্তুত হবে।”
‘মুখের তেল বন্ধ হলে দেশের তেলের সংকট হবে না’
তোষামোদী রাজনীতির সমালোচনা করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, “প্রধানমন্ত্রীর সাদামাটা জীবনযাপন দেখে আমরা অনুপ্রাণিত হই। কিন্তু যারা তাকে আইকন বলেন, তারা তাকে ফলো করেন না। আমরা শুধু রিভার্সটাই (উল্টো) দেখি। তেল নিয়ে দেশে সংকট চলছে, কিন্তু মুখের তেল (তোষামোদ) বন্ধ হলে দেশের তেলের সংকট আর হবে না।”

তিনি আরও বলেন, “ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা যখন ক্ষমতায় ছিলেন, সবাই বলত নেত্রী পবিত্র, আশপাশের লোকেরা খারাপ। এখন নেত্রী চলে যাওয়ায় বলা হচ্ছে, আশপাশের লোকেরা ভালো ছিল, নেত্রীর জন্যই দেশ ধ্বংস হয়েছে। এই সংস্কৃতি বদলাতে হবে। ক্ষমতা কারো জন্য চিরস্থায়ী নয়।”

সরকারকে সহযোগিতার প্রস্তাব:
জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট সমাধানে সরকারকে সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, “সরকার যদি সহযোগিতা চায়, তাহলে আমরা আমাদের টেকনিক্যাল এক্সপার্ট টিমকে সরকারের সাথে যুক্ত করে দিতে পারি। একসঙ্গে দেশের জন্য, মানুষের জন্য কাজ করব। এখানে ক্রেডিট বা ডিসক্রেডিটের কোনো ব্যাপার নেই। সব ক্রেডিট সরকার নিয়ে নিক, আমাদের আপত্তি নেই। আমরা শুধু সমাধান চাই।”

তিনি বলেন, “একটি দেশ যখন পাওয়ার ক্রাইসিসে ভোগে, তখন দেশটা পাওয়ারলেস হয়ে যায়। আমরা চাই না আমাদের জাতি পাওয়ারলেস হোক, আমরা চাই জাতি পাওয়ারফুল হোক।”

‘উই হ্যাভ এ প্ল্যান’: প্রতিমন্ত্রী
প্রধানমন্ত্রীর একটি মন্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ ইসলাম অমিত বলেন, “১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান যখন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে স্বাধীনতা ঘোষণার প্রারম্ভে ‘উই রিভোল্ট’ বলেছিলেন, সঙ্গে সঙ্গে তার সাথীরাও বলেছিলেন ‘উই রিভোল্ট’। ঠিক তেমনিভাবে, সংকট সমাধানে প্রধানমন্ত্রী যখন বলেছেন ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’, তার সাথে গলা মিলিয়ে আমরাও দ্ব্যর্থহীনভাবে বলতে চাই— ‘উই হ্যাভ এ প্ল্যান’ (আমাদের একটি পরিকল্পনা রয়েছে)!”

স্বল্পমেয়াদী পদক্ষেপ ও ক্যাপাসিটি চার্জবিহীন বিদ্যুৎ:
বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে সরকারের তাৎক্ষণিক পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী জানান, জরুরি প্রয়োজনে ব্যবহারের জন্য ফার্নেস অয়েলভিত্তিক (এইচএফও) বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে সর্বোচ্চ ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে এবং সরকার ইতোমধ্যে ৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে। এছাড়া রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের বন্ধ থাকা ৬৬০ মেগাওয়াটের একটি ইউনিট চলতি সপ্তাহেই চালু হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
তিনি আরও বলেন, “চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসা এত সহজ নয়, কারণ এটি রাষ্ট্রের সাথে হয়। আমরা সেগুলো মূল্যায়ন করছি। তবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে মেয়াদোত্তীর্ণ ৫টি পাওয়ার প্লান্টের সাথে আমরা কথা বলেছি। আশা করছি এ সপ্তাহ থেকেই কোনো ক্যাপাসিটি চার্জ ছাড়াই এসব কেন্দ্র থেকে আমরা ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাবো।”

গ্যাস অনুসন্ধান ও এলএনজি টার্মিনাল:
সমুদ্রে গ্যাস উত্তোলনে বিগত সরকার কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি অভিযোগ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, “দায়িত্ব নেওয়ার পরই আমরা গত ২৪ মে অফশোর বিডিং রাউন্ড উন্মুক্ত করেছি, যার মেয়াদ ৩০ নভেম্বর শেষ হবে। এছাড়া দেশীয় উৎপাদন বাড়াতে ১০৬টি কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে ৩০টির কাজ চলমান।”

ভবিষ্যৎ গ্যাসের চাহিদা মেটাতে এ বছরের মধ্যেই ন্যূনতম দুটি নতুন এফএসআরইউ (ঋঝজট) চুক্তির কথা জানান তিনি। এছাড়া মাতারবাড়িতে ল্যান্ড বেইজড (স্থলভাগ) এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের জন্য ট্রান্সেকশন অ্যাডভাইজার নিয়োগের প্রক্রিয়া ও জমি অধিগ্রহণ শুরু হয়েছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী।

ইস্টার্ন রিফাইনারির সক্ষমতা তিনগুণ বাড়বে:
জ্বালানি তেলের পরিশোধন সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রসঙ্গে অনিন্দ ইসলাম অমিত জানান, বর্তমান সরকারের মেয়াদেই ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের দ্বিতীয় ইউনিটের কাজ সম্পন্ন করা হবে। এর ফলে ক্রুড অয়েল (অশোধিত তেল) পরিশোধনের সক্ষমতা বর্তমানের ১৫ লাখ মেট্রিক টন থেকে তিনগুণ বেড়ে ৪৫ লাখ মেট্রিক টনে উন্নীত হবে। এছাড়া অব্যবহৃত পড়ে থাকা ৮ হাজার কোটি টাকার ‘সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং’ প্রকল্প চালু করতে ঠিকাদার নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলেও জানান তিনি।

মিটার ভাড়া মওকুফ ও ভুতুড়ে বিল সমস্যা:
বিদ্যুৎ বিলে মিটার ভাড়া মওকুফের বিষয়ে বিরোধী দলের দাবির প্রেক্ষিতে প্রতিমন্ত্রী জানান, মিটার ভাড়া সম্পূর্ণ মওকুফ করতে হলে ২৯ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন। তবে গ্রাহক চাইলে নিজ খরচে মিটার কিনে নিতে পারেন, সেক্ষেত্রে কোনো ভাড়া দিতে হবে না।
ভুতুড়ে বিল সমস্যা সমাধানে সরকারের উদ্যোগের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ গ্রাহককে স্মার্ট প্রিপেইড মিটারের আওতায় আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে বিলিং সংক্রান্ত অভিযোগ চিরতরে বন্ধ হবে।

নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে ‘বিপ্লব’:
সৌরবিদ্যুৎ খাতে বিশেষ সুবিধার ঘোষণা দিয়ে জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী বলেন, আগামী গ্রীষ্মকে সামনে রেখে রুফটপ সোলার (ছাদের ওপর সৌরবিদ্যুৎ) স্থাপনে শিল্পোদ্যোক্তাদের পাশাপাশি বাণিজ্যিক আমদানিকারকদেরও মাত্র ১ শতাংশ শুল্ক সুবিধা দেওয়া হয়েছে। আগামী ৬ মাস তাদের কোনো অগ্রিম আয়কর বা ভ্যাট দিতে হবে না। এছাড়া নেট মিটারিংয়ের মাধ্যমে উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ আগামী ৩ বছরের জন্য ১০ টাকা ৫০ পয়সা আকর্ষণীয় মূল্যে সরকারের কাছে বিক্রির সুযোগ পাবেন গ্রাহকরা।

বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কিনতে অতিরিক্ত ১৫ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা ব্যয়ের কথা উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, “যেই পরিস্থিতি আজ বিদ্যমান, আমাদের পরিকল্পনা হচ্ছে আগামী বছর যেন আমরা কিছুটা স্বস্তি অনুভব করতে পারি। আর ২০৩০ সাল নাগাদ দেশের জ্বালানি খাতে কোনো সংকট থাকবে না।”

জ্বালানি সংকট উত্তরণে সংসদে জামায়াতের ৪ প্রস্তাব: এদিকে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পর্যাপ্ত সক্ষমতা থাকলেও মূলত দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা, সিদ্ধান্তহীনতা ও সরকারের অযোগ্য নেতৃত্বের কারণেই আজ জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে চরম সংকট বিরাজ করছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন।

একইসঙ্গে বিদ্যুৎ বিলে মিটার ভাড়া ও ডিমান্ড চার্জ আদায়কে ‘ডিজিটাল চাঁদাবাজি’ আখ্যা দিয়ে তা অবিলম্বে বন্ধের দাবি জানিয়েছেন তিনি।
আলোচনায় অংশ নিয়ে ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান বলেন, “বিদ্যুৎ আর গ্যাস কারো দয়া নয়, এটি মানুষের অধিকার। মানুষ কর দেয়, বিল দেয়। সেই টাকায় ঘরে আলো জ্বলবে—এটাই ন্যায়বিচার। আমাদের কৃষকের, শ্রমিকের, প্রবাসীর রেমিট্যান্সের টাকা থেকে জ্বালানি খাতে যে বিপুল ভর্তুকি দেওয়া হয়, সেই টাকা কোথায় গেল—তার হিসাব বুঝিয়ে দিতে হবে।”

সক্ষমতা নয়, সমস্যা বকেয়ার দুষ্টচক্র ও অব্যবস্থাপনায়:
বিদ্যুৎ খাতের পরিসংখ্যান তুলে ধরে জামায়াতের এই আইনপ্রণেতা বলেন, দেশে বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট। আর পিক আওয়ারে সর্বোচ্চ চাহিদা মাত্র ১৭ থেকে সাড়ে ১৭ হাজার মেগাওয়াট। সক্ষমতার চেয়ে চাহিদা অনেক কম হওয়ার পরও দেশে তিন হাজার মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং হচ্ছে।

এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, “বিদ্যুৎ উৎপাদকদের কাছে সরকারের বকেয়া দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫২ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। যার কারণে তারা কয়লা, তেল বা প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ কিনতে পারছে না। ফলে উৎপাদন কমছে। অন্যদিকে এই উৎপাদকদেরকেই আবার বসিয়ে বসিয়ে ৪৮ হাজার কোটি টাকা ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ দেওয়া হচ্ছে।” ১২ হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতা মাসজুড়ে অচল বসে থাকলেও ক্যাপাসিটি চার্জ ঠিকই দিতে হচ্ছে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।

গ্যাস সংকট ও এলএনজিতে লুটপাট:
গত ১৭ বছরে অনশোর বা অফশোরে কোনো গ্যাসের কূপ খনন বা পুনঃখনন (ওয়ার্কওভার) করা হয়নি অভিযোগ করে ব্যারিস্টার মোমেন বলেন, “দেশীয় গ্যাস উৎপাদন ৮৪৯ মিলিয়ন ঘনফুট থেকে কমে ৭০৯ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমেছে। প্রতিদিন গ্যাসের ঘাটতি প্রায় ১ হাজার ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট। অথচ গত অর্থবছরে আমাদের গলার কাঁটা এলএনজি আমদানিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৫৯ হাজার কোটি টাকা।”

সম্প্রতি একটি এফএসআরইউ-তে (ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল) আগুন লাগার ঘটনাকে ষড়যন্ত্র বা নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড কিনা, তা তদন্ত করে জাতিকে জানানোর দাবি জানান তিনি। পাশাপাশি, এলএনজি ক্রয়ের ক্ষেত্রে সরকারদলীয় ব্যক্তিদের বিনা গ্যারান্টিতে লাইসেন্স দেওয়া এবং তৃতীয় এসএফআরইউ ক্রয়ে এক সরকারদলীয় সদস্যের আত্মীয়ের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তুলে স্বচ্ছতার স্বার্থে তা প্রকাশের দাবি জানান তিনি।

ডিমান্ড চার্জের নামে ‘ডিজিটাল চাঁদাবাজি’:
ভুতুড়ে বিল ও অযৌক্তিক চার্জের সমালোচনা করে তিনি বলেন, সংসদে সরকারি দলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল মিটার ভাড়া ও ডিমান্ড চার্জ নেয়া হবে না। কিন্তু এখনও তা নেয়া হচ্ছে।
“হিসাব অনুযায়ী চার থেকে সাড়ে চার কোটি গ্রাহকের কাছ থেকে মাসে প্রায় ১৯০ কোটি টাকা ডিমান্ড চার্জ এবং ৮০ থেকে ১৬০ কোটি টাকা মিটার ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। এর কোনো যৌক্তিকতা নেই। আমি একে ‘ডিজিটাল চাঁদাবাজি’ বলতে চাই। মানুষের ওপর এই জুলুম অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে,” বলেন এই সংসদ সদস্য।

সংকট সমাধানে জামায়াত এমপির প্রস্তাবনা:
শুধু সমালোচনা নয়, সংকট উত্তরণে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি বেশ কিছু প্রস্তাবনাও সংসদে তুলে ধরেন ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
ওপেন এক্সেস পদ্ধতি: বকেয়া বিলের কারণে উৎপাদকরা বিদ্যুৎ দিতে পারছে না, অন্যদিকে শিল্প বন্ধ হচ্ছে। এর সমাধানে ‘ওপেন এক্সেস’ পদ্ধতি চালু করে শিল্প কারখানাগুলোকে সরাসরি বিদ্যুৎ উৎপাদকদের কাছ থেকে বিদ্যুৎ কেনার সুযোগ দেওয়া।

জরুরি সেল গঠন: সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের তত্ত্বাবধানে কার্যকর একটি ‘জ্বালানি জরুরি সেল’ গঠন করা, যেখানে পেট্রোবাংলা, পিডিবি, পিজিসিবি ও বিপিসি একটি সমন্বিত সিদ্ধান্ত কাঠামোর মধ্যে আসবে।

কয়লা বিদ্যুতের সর্বোচ্চ ব্যবহার: দেশে প্রায় ৬ হাজার ৯০০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। জ্বালানি ও এলসি নিশ্চিত করে এখান থেকে দ্রুত সাড়ে ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা।
অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিল পরিশোধ: বিদ্যুৎ উৎপাদনে যেন ব্যাঘাত না ঘটে, সেজন্য সবার আগে জ্বালানি কেনার বকেয়া বিল পরিশোধের উদ্যোগ নেওয়া।
তিনি বলেন, “বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট শুধু সম্পদের ঘাটতি নয়, সবচেয়ে বড় ঘাটতি হলো সিদ্ধান্তের গতিতে। বিদ্যমান সম্পদ ও নির্মিত অবকাঠামোর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারলেই এই সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব।”