শ্রমিক সুরক্ষায় টেকসই শিল্পের নতুন পথ

শ্রমিক সুরক্ষায় টেকসই শিল্পের নতুন পথ

ফন্ট সাইজ:

একদিকে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তিগত দ্রুত রূপান্তর, অন্যদিকে ভূ-রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের তীব্র সংকট এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বহুমুখী চ্যালেঞ্জ। এই জটিল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে যেকোনো দেশের শিল্প খাতের টেকসই প্রবৃদ্ধির মূল ভিত্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে মর্যাদাপূর্ণ কাজ এবং শ্রমিকের সুরক্ষা। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। আমাদের তৈরি পোশাক শিল্প, নির্মাণ খাত, সরবরাহ শৃঙ্খল, কৃষিভিত্তিক প্রক্রিয়াজাত শিল্প এবং উদীয়মান রূপান্তরকারী শিল্পসমূহ আজ জাতীয় অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার এই মহাকাব্য মূলত কোটি কোটি শ্রমজীবী মানুষের গল্প। পোশাকশিল্পের কারখানা থেকে নির্মাণক্ষেত্র, জাহাজ নির্মাণ থেকে পরিবহন কিংবা বিশাল সেবা খাত—দেশের অর্থনীতির চাকা দিনরাত ঘুরছে লাখো-কোটি মানুষের ঘাম, দক্ষতা ও ত্যাগের ওপর নির্ভর করে। অথচ আমাদের নীতি-নির্ধারণী মহলে কিংবা সুশীল সমাজের আলোচনায় শিল্পের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ও মূলধন বিকাশ নিয়ে যতটা কথা হয়, সেই উৎপাদনশীলতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা শ্রমিকের ভৌত ও মানসিক নিরাপত্তা, সামাজিক মর্যাদা, ন্যায্য মজুরি, স্বাস্থ্যকর কর্মপরিবেশ এবং সার্বিক সামাজিক সুরক্ষাবলয় নিয়ে ততটা সুসমন্বিত আলোচনা সবসময় দেখা যায় না।

এই বাস্তবতায় সম্প্রতি রাজধানী ঢাকার সোনারগাঁও হোটেলে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস) কর্তৃক আয়োজিত আন্তর্জাতিক সিম্পোজিামে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান উপদেষ্টা মাহ্‌দী আমিনের বক্তব্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা বহন করে। তিনি স্পষ্ট ভাষায় ব্যক্ত করেছেন যে, দেশে মানসম্মত কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করা, একটি টেকসই, সম্পূর্ণ নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মপরিবেশ গড়ে তোলা, জাতীয় শ্রমশক্তির কারিগরি ও মেধাভিত্তিক দক্ষতা বৃদ্ধি করা, সমগ্র অর্থনীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া এবং নারীদের সার্বিক অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করাই বর্তমান সরকারের মূল লক্ষ্য। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে যেকোনো প্রতিকূল পরিস্থিতি তৈরি হলেও দেশের কলকারখানা বন্ধ না রেখে সেগুলো কীভাবে সচল রাখা যায়, সে জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা প্রদানে সরকার যে বদ্ধপরিকর—সেই সংকল্পও তিনি ব্যক্ত করেন।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্রের এই বক্তব্যকে কেবল একটি আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হিসেবে না দেখে একবিংশ শতাব্দীর উপযোগী নতুন শ্রমনীতির কৌশলগত সূচনা হিসেবে দেখা দরকার। চিরাচরিত ধারণায় মনে করা হতো শ্রমিকের অধিকার রক্ষা এবং শিল্পের ব্যবসায়িক লাভজনকতা দুটি সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী বিষয়। অথচ আধুনিক অর্থনৈতিক বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে, শ্রমিকের নিরাপত্তা ও শিল্পের উৎপাদনশীলতা পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং তারা অঙ্গাঙ্গীভাবে যুক্ত ও পরিপূরক।

শিল্পের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির সমীকরণে সাধারণত আধুনিক যন্ত্রপাতি, পর্যাপ্ত মূলধন, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি এবং অবকাঠামোর কথা জোর দিয়ে বলা হয়। কিন্তু সমস্ত প্রযুক্তির প্রাণকেন্দ্রে অবস্থান করে মানবসম্পদ। একজন শ্রমিক যদি অনিরাপদ ও স্বাস্থ্যঝুঁকিপূর্ণ কর্মপরিবেশে কাজ করতে বাধ্য হন, যেখানে প্রতিনিয়ত অগ্নিকাণ্ড বা দুর্ঘটনার আতঙ্ক থাকে, তবে তার দীর্ঘমেয়াদী মনোযোগ ও উৎপাদনশীলতা কমে যেতে বাধ্য। অনিরাপদ কর্মপরিবেশ শ্রমিকের মাঝে যে মানসিক চাপ ও অনীহা তৈরি করে, তা শেষ পর্যন্ত পণ্যের মান খারাপ করে এবং কারখানার অপচয় বাড়িয়ে দেয়।
এর বিপরীত চিত্রটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, যখন একটি কারখানায় সর্বোচ্চ অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়, আধুনিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, বাজারদরের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ ন্যায্য পারিশ্রমিক প্রদান করা হয়, মাতৃত্বকালীন ছুটি ও প্রাতিষ্ঠানিক সামাজিক সুরক্ষা সুসংহত করা হয়—তখন সেই শ্রমিক নিজেকে কেবল একজন সাধারণ বেতনভুক্ত কর্মী ভাবেন না, বরং তিনি প্রতিষ্ঠানের একজন দায়িত্বশীল অংশীদার হিসেবে নিজেকে বিবেচনা করেন।

এর ফলে প্রতিষ্ঠানের প্রতি তার আনুগত্য বাড়ে, শ্রমিকের দক্ষতা বৃদ্ধি পায়, কর্মক্ষেত্র ছেড়ে চলে যাওয়ার হার নাটকীয়ভাবে হ্রাস পায় এবং উৎপাদন প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতা নিরবচ্ছিন্ন থাকে। অতএব, উদ্যোক্তা ও নীতি-নির্ধারকদের মানসিকতায় একটি দৃষ্টিভঙ্গিগত পরিবর্তন আনা এখন সময়ের দাবি। শ্রমিকের নিরাপত্তা ও কল্যাণ খাতে অর্থ ব্যয়কে অনাবশ্যক অতিরিক্ত খরচ বা লাভের পথে বাধা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বরং শ্রমিকের স্বাস্থ্যে ও সুরক্ষায় নিয়োজিত অর্থ শিল্পের ভবিষ্যৎ সুরক্ষার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ।

বাংলাদেশের শিল্প অর্থনীতি বর্তমানে একটি স্পর্শকাতর রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এতদিন আমাদের অর্থনৈতিক সাফল্যের একটি বড় ভিত্তি ছিল স্বল্পমূল্যের শ্রমঘন শিল্পের ওপর নির্ভরতা। তবে উন্নয়নশীল দেশের স্থায়ী বাস্তবায়নে বাংলাদেশকে এখন উচ্চ উৎপাদনশীলতা ও প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প কাঠামোর দিকে এগোতে হচ্ছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের সামনে এখন উন্মুক্ত রয়েছে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা তরুণ জনগোষ্ঠীর বিপুল প্রাচুর্য, যেখানে আমাদের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি কর্মক্ষম তরুণ। তবে এই মেধা ও জনসংখ্যাগত সুবিধা যথাযথভাবে কাজে লাগাতে না পারলে তা অদূর ভবিষ্যতে তীব্র বেকারত্ব ও সামাজিক অসন্তোষের রূপ নিতে পারে।

এই প্রেক্ষাপটে তরুণ সমাজকে সনাতন চাকরির প্রথাগত কাঠামোর বাইরে এনে উচ্চতর কারিগরি দক্ষতা, আধুনিক ডিজিটাল প্রযুক্তিজ্ঞান, আন্তর্জাতিক পেশাগত শৃঙ্খলা এবং দ্রুত জটিল সমস্যা সমাধানের সক্ষমতায় প্রশিক্ষিত করে তুলতে হবে। আমাদের জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থা ও বাস্তব শিল্প খাতের চাহিদার মধ্যে বিদ্যমান ব্যবধান সরকারি ও বেসরকারি যৌথ উদ্যোগে দূর করা জরুরি। আন্তর্জাতিক শিল্প ও বাণিজ্য খাত আজ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বয়ংক্রিয় রোবোটিকস, স্মার্ট ফ্যাক্টরি অটোমেশন এবং পরিবেশবান্ধব সবুজ প্রযুক্তির প্রভাবে অভূতপূর্ব গতিতে বদলে যাচ্ছে। প্রযুক্তির এই পরিবর্তনের সঙ্গে দেশীয় শ্রমশক্তিকে মানিয়ে নেওয়ার উপযুক্ত সুযোগ না দিলে বিশ্ববাজারে কেবল সস্তা ও অদক্ষ শ্রমের পুরনো সুবিধা আঁকড়ে ধরে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি বজায় রাখা কঠিন হবে।

বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা ও কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধির মুখে দেশের কলকারখানা সচল রাখার জন্য সরকারের নীতিগত সহায়তার আশ্বাস অত্যন্ত সময়োপযোগী। একটি বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠান কোনো কারণে অচল হলে কেবল বিনিয়োগকারী ক্ষতিগ্রস্ত হন না; বরং হাজার হাজার শ্রমিকের আয় বন্ধ হয়, তাদের ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলো সংকটে পড়ে এবং জাতীয় সরবরাহ শৃঙ্খল বিপর্যস্ত হয়। তবে কারখানা সচল রাখার অর্থ কিন্তু কোনো অদক্ষ, ঝুঁকিপূর্ণ কিংবা নিয়ম অমান্যকারী প্রতিষ্ঠানকে কৃত্রিম উপায়ে টিকিয়ে রাখা নয়। বরং শিল্পকে টেকসই রাখতে হলে কারখানার প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন, পরিবেশবান্ধব উৎপাদন, শ্রমিকের ক্রমাগত মেধা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। সরকারকে একটি স্বচ্ছ নীতি প্যাকেজ প্রণয়ন করতে হবে, যেখানে সংকটের মুখে পড়া সম্ভাবনাময় প্রতিষ্ঠানগুলোকে অর্থায়ন বা ট্যাক্স সুবিধা দেওয়া হবে এই শর্তে যে তারা শতভাগ নিরাপত্তা, পরিবেশবান্ধব উৎপাদন এবং শ্রম অধিকার কঠোরভাবে মেনে চলবে।

শিল্প মালিকদের অনেকের মধ্যে একটি ধারণা রয়েছে যে, শ্রমিকদের আইনানুগ অধিকার ও বাড়তি সুবিধা দিলে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে হয়। বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকেও এটি একটি ভুল ধারণা। যে কারখানায় শ্রমিক অধিকার ও মানবিক মর্যাদা সুরক্ষিত থাকে, সেখানে ধর্মঘট বা অসন্তোষের ঝুঁকি থাকে না, অভিজ্ঞ শ্রমিকদের ধরে রাখা সম্ভব হয় এবং পণ্যের উচ্চ গুণগত মান অক্ষুণ্ণ থাকে। আজকের আন্তর্জাতিক বাজারের ক্রেতা ও বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডগুলো কেবল পণ্যের মূল্য দেখে ক্রয়াদেশ দেয় না, সেখানে সাপ্লাই চেইন ডিউ ডিলিজেন্স এবং পরিবেশ-সামাজিক-সুশাসন সংক্রান্ত নীতিগুলো বড় শর্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্ববাজার গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে যে উৎপাদনে আন্তর্জাতিক শ্রম অধিকার, অগ্নিনিরাপত্তা এবং পরিবেশ সুরক্ষার নীতি মানা হচ্ছে কি না। তাই কম খরচের অদক্ষ শ্রমের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দক্ষ, নিরাপদ ও মানসম্পন্ন শ্রমশক্তির ভাবমূর্তি গড়ে তোলাই এখন মূল কৌশল।

এর পাশাপাশি মোট শ্রমশক্তির অর্ধেক অংশ অর্থাৎ নারী শক্তিকে অর্থনৈতিক মূলধারায় সমান মর্যাদায় যুক্ত করা আবশ্যক। প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্রে নারীবান্ধব কর্মপরিবেশ তৈরি, ডে-কেয়ার সুবিধাসমূহ বাধ্যতামূলক করা এবং ফ্যামিলি কার্ড স্কিমের মতো কল্যাণমুখী উদ্যোগ অর্থনৈতিক রূপান্তরের মূল উপাদান। আমাদের নারীরা আজ কেবল পোশাক শিল্পে সীমাবদ্ধ নন; প্রযুক্তি খাত, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, স্বাস্থ্যসেবা, ব্যবসা ও ডিজিটাল ই-কমার্সেও সাফল্য দেখাচ্ছেন। তবে নারীদের এই অবদানকে টেকসই করতে নিরাপদ পাবলিক পরিবহন, কর্মস্থলে লিঙ্গভিত্তিক হয়রানি প্রতিরোধে আইনি ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত মাতৃত্বকালীন সুবিধা এবং কারখানার সন্নিকটে ডে-কেয়ার কেন্দ্র স্থাপন করা প্রয়োজন। ডে-কেয়ার সুবিধাকে কোনো সামাজিক দয়া হিসেবে দেখার সুযোগ নেই, এটি উৎপাদনশীল অর্থনীতির একটি মৌলিক অবকাঠামো।

বাংলাদেশের শ্রমবাজারের অন্যতম বড় দুর্বলতা হলো বিপুলসংখ্যক শ্রমিকের অনানুষ্ঠানিক খাতে অবস্থান। দেশের মোট কর্মসংস্থানের একটি বিশাল অংশ প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর বাইরে, যেখানে কৃষি, ক্ষুদ্র পরিবহন, দিনমজুরি, গৃহভিত্তিক কাজ, জাহাজ ভাঙা ও নির্মাণ খাতের কোটি কোটি মানুষ কোনো প্রাতিষ্ঠানিক নিয়োগপত্র, নির্দিষ্ট মজুরি বা স্বাস্থ্য সুরক্ষা ছাড়াই কাজ করছেন। অনানুষ্ঠানিক খাতের এই শ্রমশক্তিকে ধাপে ধাপে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর আওতায় নিয়ে আসা রাষ্ট্রের বড় সংস্কারমূলক কাজ। শ্রমিকের ডিজিটাল পরিচয়পত্রের সঙ্গে পেশাগত শ্রমনীতি যুক্ত করে এবং সর্বজনীন স্বাস্থ্য বীমা ও সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় এনে তাদের সুরক্ষিত করতে হবে। তবে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ওপর অতিরিক্ত আমলাতান্ত্রিক জটিলতা না চাপিয়ে ডিজিটাল অনলাইন নিবন্ধন ও কর-সহনশীল নীতির মাধ্যমে এই রূপান্তর ঘটাতে হবে।

একই সঙ্গে সামাজিক সুরক্ষাকে কর্মজীবনের স্থায়ী অংশ করতে হবে। একজন শ্রমিক অসুস্থ হলে বা কর্মস্থলে দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার সুরক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক মেকানিজম থাকতে হবে। শ্রমিকদের সুবিধার জন্য মোবাইল সোশ্যাল সিকিউরিটি আইডি ব্যবস্থা করা যেতে পারে, যেন এক কারখানা বা শহর পরিবর্তন করলেও তার অর্জিত পেনশন বা স্বাস্থ্য বীমার সুবিধা অব্যাহত থাকে। এই ফান্ড গঠনে সরকার, মালিকপক্ষ ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থাসমূহকে যৌথভাবে এগিয়ে আসতে হবে।

এখানে একটি সত্য বলতেই হবে যে,বাংলাদেশের শিল্প খাতের অন্যতম বড় বাধা মালিক ও শ্রমিকের মধ্যকার আস্থার সংকট। শ্রমিকদের যৌক্তিক দাবিকে উপেক্ষা করা যেমন টেকসই সমাধান আনে না, তেমনি আন্তর্জাতিক বাজার ও কারখানার সক্ষমতা না বুঝে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করাও শিল্পের ভবিষ্যতের জন্য ক্ষতিকর। এই বৈরী সম্পর্ক দূর করার একমাত্র পথ হলো কার্যকর সামাজিক সংলাপ। কারখানা পর্যায় থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত শ্রমিক, মালিক ও সরকারের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি স্থায়ী ত্রিপক্ষীয় আলোচনার প্ল্যাটফর্ম সক্রিয় রাখতে হবে। ন্যূনতম মজুরি, কর্মঘণ্টা এবং প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের প্রভাবের মতো বিষয়গুলো নিয়ে নিয়মিত প্রকাশ্য আলোচনার ব্যবস্থা থাকলে যেকোনো সংকট সংঘাতের রূপ নেওয়ার আগেই সমাধান সম্ভব।

একই সঙ্গে কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তাকে কেবল দুর্ঘটনার পর ক্ষতিপূরণ দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে একটি প্রতিরোধমূলক নিরাপত্তা সংস্কৃতি হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। প্রতিটি কারখানায় নিয়মিত প্রাতিষ্ঠানিক নিরাপত্তা অডিট, অগ্নিনির্বাপণ মহড়া এবং নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ আবশ্যক করা প্রয়োজন। দুর্ঘটনা ঘটার পর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার চেয়ে দুর্ঘটনা যেন ঘটতে না পারে—সেই প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিশ্চিত করাই আধুনিক শ্রমনীতির মূল লক্ষ্য।

এই রূপান্তর প্রক্রিয়া বাস্তবায়নে সামগ্রিক নীতিগত কাঠামোয় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। ভৌত ও পেশাগত নিরাপত্তার ক্ষেত্রে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের কারখানায় অগ্নিকাণ্ড ও দুর্ঘটনা রোধে একটি শক্তিশালী ও স্বচ্ছ জাতীয় শ্রম পরিদর্শন অধিদপ্তর গঠন করে ডিজিটাল অডিট চালু করা যেতে পারে। সামাজিক সুরক্ষায় দুর্ঘটনায় ক্ষতিপূরণের অভাব ও অসুস্থতার ঝুঁকি এড়াতে কর্মসংস্থানভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা স্কিম এবং পোর্টেবল হেলথ কার্ড চালুর বিকল্প নেই। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শ্রম আইন যুগোপযোগী করা এবং শ্রম আদালতে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা অপরিহার্য। একইভাবে, চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে অদক্ষ শ্রমিকের কাজ হারানোর ঝুঁকি মোকাবিলায় সরকারি-বেসরকারি যৌথ অর্থায়নে আধুনিক কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে। অন্যদিকে, নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে বাধ্যতামূলক লিঙ্গীয় হয়রানি প্রতিরোধ সেল ও মানসম্মত শিশুযত্ন কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে।

এই সুপারিশসমূহ বাস্তবায়নে সুনির্দিষ্ট প্রণোদনা ও আইনি জবাবদিহিতার সমন্বয় দরকার। যেসকল কারখানা শ্রমিকের নিরাপত্তা, ডে-কেয়ার ও প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করবে, তাদের কর ছাড় বা ব্যাংকিং সুবিধার মতো প্রণোদনা দেওয়া যেতে পারে। অন্যদিকে, শ্রমিকের নিরাপত্তা ও আইনে অবহেলাকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ কঠোর আইনি পদক্ষেপ নিশ্চিত করা জরুরি।

বাংলাদেশ আজ তার অর্থনৈতিক প্রগতির এমন একটি ঐতিহাসিক মোড়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে, যেখানে সস্তা শ্রমের নির্ভরশীলতা থেকে বেরিয়ে এসে উন্নত দক্ষতা, আধুনিক প্রযুক্তি এবং সর্বাত্মক উৎপাদনশীলতাভিত্তিক টেকসই প্রবৃদ্ধির পথে হাঁটা আবশ্যক। আর এই প্রগতির কেন্দ্রবিন্দুতে রাখতে হবে দেশের কোটি কোটি শ্রমজীবী মানুষকে। আমাদের অনুধাবন করতে হবে যে, প্রতিটি শ্রমিক দেশের অর্থনৈতিক প্রগতির অংশীদার, বাজার অর্থনীতির প্রধান ভোক্তা এবং জাতীয় সক্ষমতার স্তম্ভ। শ্রমিকের নিরাপত্তা কোনো অতিরিক্ত বোঝা বা খরচ নয়—এটি আধুনিক শিল্পের সবচেয়ে লাভজনক ও কৌশলগত বিনিয়োগ।

সরকারের ঘোষিত লক্ষ্যসমূহ—মানসম্মত কর্মসংস্থান তৈরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, ব্যাপক দক্ষতা বৃদ্ধি, নারী শক্তির প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমায়ান ও সামাজিক সুরক্ষা—বাস্তবায়িত হলে আমাদের শিল্প খাত থাকবে সম্পূর্ণ স্থিতিশীল। কারখানায় উৎপাদনশীলতা বাড়বে এবং বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের অবস্থান হবে টেকসই। সুতরাং শ্রমিকের মানবাধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করাই বাংলাদেশের শিল্পের নিরাপদ ভবিষ্যতের অন্যতম প্রধান বিষয়।

লেখক:সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন।
ই-মেইল: [email protected]