যুগান্তর
দৈনিক যুগান্তরের প্রধান শিরোনাম ‘ঊর্ধ্বমুখী অপরাধে উদ্বিগ্ন মানুষ’। প্রতিবেদনে বলা হয়, মাদক কারবারের আধিপত্য ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ৩০ আগস্ট রাতে রাজধানীর গেন্ডারিয়ার স্বামীবাগ ও মুন্সিরটেক এলাকায় সশস্ত্র সংঘর্ষ হয়। এলোপাতাড়ি গুলিতে এক নারীসহ তিনজন গুলিবিদ্ধ এবং বেশ কয়েকজন আহত হন। এর আগের দিন শনিবার ভোরে সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার সামনে প্রকাশ্য দিবালোকে ছিনতাইকারীর টানে রিকশা থেকে ছিটকে পড়ে প্রাণ হারান স্কুল শিক্ষিকা রনজিনা পারভীন। চোখের চিকিৎসার জন্য বগুড়া থেকে ঢাকায় এসে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হন বাগবাড়ি বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এই প্রধান শিক্ষিকা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই দুটি ঘটনা কেবল বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়। বরং সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির রূপ সামনে এনেছে। এভাবে দিনকে দিন রাজধানীসহ সারা দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি ঘটছে। চাঁদাবাজি, ছিনতাই, মাদক, নারী ও শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ, অবৈধ দখলদারিত্ব এবং খুনের ঘটনায় সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনকে আতঙ্কগ্রস্ত করে তুলেছে।
প্রতিষ্ঠান ও সম্পত্তি দখল এবং কিশোর গ্যাংয়ের ভয়ংকর তৎপরতা জনজীবনকে এক প্রকার অতিষ্ঠ করে তুলেছে। সাধারণ মানুষ স্বস্তি রোধ করছেন না। অনেকে আছেন নিরাপত্তাহীনতায়। চাঁদাবাজির ঘটনা যেন রুটিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফুটপাতের দোকান থেকে ছোট বড় ব্যবসায়ী, আবাসন প্রতিষ্ঠান এবং করপোরেট অফিসগুলোও এখন চাঁদাবাজদের প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে সুবিধাবাদী চক্রের ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠা নানা সিন্ডিকেট এসব অপরাধ চালিয়ে যাচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কিছু ক্ষেত্রে অপরাধীদের গ্রেফতার করলেও জামিনে বেরিয়ে এসে তারা আরও বেশি হিংস্র হয়ে উঠছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চাঁদাবাজদের কারণে মানুষের মনে অস্বস্তি থাকলেও পুলিশ সদর দপ্তরে এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা বা আসামিদের বিষয়ে কোনো তথ্য নেই।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ছয় মাসের অপরাধের ঘটনা বিশ্লেষণ করে এর আগের ছয় মাসের তুলনায় ঊর্ধ্বমুখী হিসাবে দেখা গেছে। পুলিশ সদর দপ্তর থেকে প্রাপ্ত চলতি বছরের সর্বশেষ ছয় মাসের (ফেব্রুয়ারি-জুলাই) অপরাধ পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বিভিন্ন অপরাধে সারা দেশের থানাগুলোতে মামলা রেকর্ড করা হয়েছে প্রায় এক লাখ (৯৯ হাজার ৯৯২)। এর মধ্যে হত্যা মামলা হয়েছে এক হাজার ৭৯১টি। প্রাপ্ত হিসাবে দেখা যায়, প্রতিমাসে গড়ে মামলা হয়েছে ১৬ হাজার ৬৬৫ দশমিক ৩৩টি। দিনের হিসাবে দেখা যায়, প্রতিদিন গড়ে মামলা হয়েছে ৯২ দশমিক ৫৮টি।
অন্যান্য অপরাধের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ঘটেছে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা। এ অপরাধের ঘটনায় মামলা হয়েছে ১১ হাজার ১৬৫টি। একই সঙ্গে দ্রুত বিচার আইনে মামলা হয়েছে ৪০৮টি, ডাকাতির মামলা ২৬৫টি, ৯০৪টি ছিনতাইয়ের মামলা, অপহরণের মামলা ৫১২টি, চার হাজার ৮০৮ চুরির মামলা, এক হাজার ৫৯১ সিঁধেল চুরি ও অন্যান্য ঘটনায় ৪১ হাজার ৯২৫টি মামলা হয়েছে। এছাড়া পুলিশ আক্রান্তের ঘটনায় ৩১৬টি, দাঙ্গার ঘটনায় ১৩টি এবং উদ্ধারসংক্রান্ত (অস্ত্র, মাদক, চোরাচালান এবং বিস্ফোরক) ঘটনায় ৩৬ হাজার ২৯৮টি মামলা হয়েছে।
এর আগের বছর (২০২৫ সালের আগস্ট থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত) মোট মামলা রেকর্ড হয়েছে ৮৯ হাজার ১২টি। এর মধ্যে হত্যা মামলা ছিল এক হাজার ৭৮০টি। অন্যান্য অপরাধের মধ্যে দ্রুত বিচার আইনে ৪৬০টি, নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে ১০ হাজার ৯০টি, ডাকাতির মামলা ৩২৮টি, ছিনতাই মামলা ৯৬০টি, অপহরণ ৫৬৩টি, পাঁচ হাজার ১৩ চুরির মামলা, এক হাজার ৬৫৯ সিঁধেল চুরি ও অন্যান্য ঘটনায় ৩৮ হাজার ২৪৯টি মামলা হয়েছে। ওই সময় পুলিশ আক্রান্তের ঘটনা ঘটে ২৮৫টি। দাঙ্গার ঘটনায় মামলায় হয় ১০টি। উদ্ধার সংক্রান্ত (অস্ত্র, মাদক, চোরাচালান এবং বিস্ফোরক) ঘটনায় ২৯ হাজার ৪৮৫টি মামলা হয়েছে।
ঢাকার আইনশৃঙ্খলা : এদিকে শুধু রাজধানীর দিকে নজর দিলেও অপরাধপ্রবণতা ও মামলার ঊর্ধ্বমুখী তথ্য মেলে। ডিএমপি থেকে প্রাপ্ত হিসাবে দেখা যায়, গত ছয় মাসে (ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই) বিভিন্ন অপরাধে রাজধানীর বিভিন্ন থানায় মামলা হয়েছে আট হাজার ৪৪টি। এর মধ্যে খুনের মামলা ১২৭টি। অন্যান্য অপরাধের মধ্যে ডাকাতির ঘটনায় ১৮টি, দ্রুত বিচার আইনে ২৯, দস্যুতার ঘটনায় ১৩১, নারী ও শিশু নির্যাতেনের ঘটনায় ৭৭৮টি (ধর্ষণ ৩২৮) মামলা হয়েছে। অপহরণের মামলা হয়েছে ৯৪টি। সিঁধেল চুরির ঘটনায় ২৬২, গাড়ি চুরির ঘটনায় ২২৪ ও অন্যান্য চুরির অভিযোগে ৩৫০টি মামলা হয়েছে। উদ্ধারজনিত মামলা হয়েছে তিন হাজার ২৭টি। এর মধ্যে অস্ত্র মামলা ৮৪, বিস্ফোরক ১৩, চোরাচালান ৬৯ ও মাদক মামলা দুই হাজার ৭৬২টি। এছাড়া সড়ক দুর্ঘটনায় ১৬৩টি ও অন্যান্য ঘটনায় দুই হাজার ৮৩২টি মামলা হয়েছে।
অপরদিকে এর আগের ছয় মাসে (২০২৫ সালের আগস্ট থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত) বিভিন্ন ঘটনায় ডিএমপিতে মামলা হয়েছে আট হাজার ৬৬৫টি। এর মধ্যে খুনের মামলা ১৪৭টি। দস্যুতার মামলা ১৯৬টি। ডাকাতির ঘটনায় ১৬টি, দ্রুত বিচার আইনের ৫৯, নারী ও শিশু নির্যাতনেও ঘটনায় ৮১৭ (ধর্ষণ ৩১৭) মামলা হয়েছে। সিঁধেল চুরির ঘটনা ঘটেছে ২৬৯টি। গাড়ি চুরির ঘটনায় ১৮৩ ও অন্যান্য চুরির ঘটনায় মামলা হয়েছে ৪৮৭টি। সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে ১৩২টি। উদ্ধারজনিতে মামলা হয়েছে তিন হাজার ৩২৬টি। এর মধ্যে অস্ত্র সংক্রান্ত ১০৯, বিস্ফোরক সংক্রান্ত ৮৬, চোরাচালানের ৭০ ও মাদকের তিন হাজার ৬১টি মামলা আছে। এছাড়া অন্যান্য মামলা হয়েছে তিন হাজার ১৭টি।
চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্য বাড়ছে : অপরাধের তথ্যে আরও দেখা যায়, চাঁদাবাজরা বিভিন্ন দূতাবাস বা হাইকমিশনে চাঁদা চেয়ে ই-মেইলও পাঠাচ্ছে। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) জানিয়েছে, গত ১৭ ও ১৯ আগস্ট চীন, তুরস্ক ও পাকিস্তানসহ অন্তত চারটি বিদেশি দূতাবাস এবং কয়েকটি সরকারি দপ্তরে চাঁদা চেয়ে হুমকি দেওয়া হয়েছে। এর নেপথ্যে একটি অপরাধী চক্র কাজ করছে। এটি নিছক সাধারণ চাঁদাবাজি নয়; বরং বিদেশি কূটনীতিক ও দূতাবাসগুলোর মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার একটি গভীর দেশবিরোধী অপতৎপরতা। এ ঘটনার রহস্য উদঘাটন ও জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে বিশেষ টিম নিবিড়ভাবে কাজ করছে বলে জানিয়েছেন ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার শফিফুল ইসলাম। তিনি জানান, বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নিয়ে কূটনৈতিক পাড়ার নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। অপরাধীদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত আছে।
অন্যদিকে, বিভিন্ন কাঁচাবাজার, পরিবহণ খাত এবং নির্মাণাধীন ভবনে প্রকাশ্যেই চাঁদা দাবি করা হচ্ছে। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষকে শারীরিক নির্যাতন বা প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অসংখ্য অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। রাজনৈতিক পালাবদলের সুযোগ নিয়ে একশ্রেণির সুবিধাবাদী ও প্রভাবশালী ব্যক্তি অন্যের জমি, প্লট, মার্কেট, এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করছে।
পুরান ঢাকার সদরঘাটে বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং চাঁদাবাজির টাকা ভাগাভাগি নিয়ে গত ১৫ আগস্ট সূত্রাপুরের ইস্ট বেঙ্গল সুপার মার্কেটে সংঘর্ষ হয়। এতে একজন নিহত হন। আগস্টের শুরুতে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবিতে চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ থানার হামজারবাগ এলাকায় এক প্রবাসী ব্যবসায়ীর নির্মাণাধীন ১১ তলা ভবনের গেট লক্ষ্য করে আকস্মিক গুলি চালায় দুর্বৃত্তরা। পিরোজপুর সদর উপজেলার কদমতলা এলাকায় বালু সরবরাহ ও ঠিকাদারি কাজের ওপর প্রভাব বিস্তার কেন্দ্র করে স্থানীয় ইউনিয়ন বিএনপি ও ছাত্রদলের কিছু নেতার বিরুদ্ধে চাঁদা দাবির অভিযোগ ওঠে। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় গত ২৫ আগস্ট রাতে স্থানীয় ঠিকাদারের প্রায় এক কিলোমিটার বালু পরিবহণের পাইপ ভেঙে ফেলা হয়, যাতে প্রায় দেড় লাখ টাকার ক্ষতি হয়। পরে ভুক্তভোগী ঠিকাদারের দায়ের করা চাঁদাবাজি ও ভাঙচুরের মামলায় ৩০ আগস্ট পুলিশ অভিযান চালিয়ে কদমতলা ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি সালাম শেখসহ চারজনকে গ্রেফতার করে।
অপরাধ বৃদ্ধির এই বাস্তবতা সামনে রেখে সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অপরাধ দমনে তৎপরতা সরকার বাড়িয়েছে বলে জানান দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা।
পুলিশ যা বলছে: অপরাধ বৃদ্ধি ঠেকাতে পুলিশ কী ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে এমন প্রশ্নে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মোহাম্মদ ওসসমান গণি যুগান্তকে বলেন, আমরা অপরাধীদের বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত : আইনগত ব্যবস্থা নিচ্ছি। গোয়েন্দা সংস্থা থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। আদালতে সোপর্দের পর আসামিরা বেরিয়ে এসে একই কাজে জড়িত হচ্ছে। মাদক এবং অর্থনৈতিক কারণেই মানুষ বেশি অপরাধে জড়াচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, চাঞ্চল্যকর ৯৫ ভাগ ঘটনার রহস্য আমরা উদ্ঘাটন করেছি। অপরাধীরা যাতে দ্রুত জামিন না পায়, সেজন্য আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। প্রতিটি ঘটনায় আমরা জামিনের বিরোধিতা করছি।
ডিএমপির কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ যুগান্তরকে বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে আমরা সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালাচ্ছি। সাদা পুলিশে ডিবি এবং সিটিটিসি ইউনিটের বেশ কয়েকটি টিম সক্রিয় আছে। রাজধানীর আটটি অপরাধ বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে তারা কাজ করছে। তিনি বলেন, কিশোর গ্যাংকে জিরো (শূন্য) করার ঘোষণা দিয়েছি। এ ক্ষেত্রে আমাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে র্যাবও। আমরা এমন পরিস্থিতি তৈরি করব যাতে, ভবিষ্যতে কিশোর গ্যাং নামে কোনো গ্যাংয়ের নাম থাকবে না।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কঠোর হুঁশিয়ারি: সম্প্রতি পুলিশ সদর দপ্তরের ত্রৈমাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন অহমদ কঠোর বার্তা দিয়ে বলেছেন, চিহ্নিত সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ ও মাদককারবারিদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো কর্মকর্তা যদি অপরাধীদের রক্ষার চেষ্টা করে বা নিষ্ক্রিয়তার পরিচয় দেন, তবে তাদের বিরুদ্ধেও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পুলিশ সদর দপ্তর থেকেও সারা দেশের সব ইউনিটকে চাঁদাবাজ ও দখলবাজদের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রথম আলো
‘বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে এখন ৩৬ বিলিয়ন ডলার’—এটি দৈনিক প্রথম আলোর প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, দুই বছরে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার মজুত বা রিজার্ভ অনেকটাই বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে এখন চার মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর মতো রিজার্ভ আছে। সাধারণত তিন মাসের মজুত থাকলেই গ্রহণযোগ্য ধরা হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গতকাল রোববার রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৬ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন (৩ হাজার ৬৩৯ কোটি) ডলার। বিগত ছয় মাসে রিজার্ভ বেড়েছে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, গত সপ্তাহেও রিজার্ভের পরিমাণ সাড়ে ৩৭ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছিল। তবে ১ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন ডলারের বিল পরিশোধের কারণে রিজার্ভ কমেছে।
এটা মোট মজুতের হিসাব। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণের শর্ত হিসেবে মোট রিজার্ভের পাশাপাশি প্রকৃত রিজার্ভের হিসাবও দেওয়া হয়, যা বিপিএম ৬ (ব্যালান্স অব পেমেন্ট অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল ইনভেস্টমেন্ট পজিশন) নামে পরিচিত। এ হিসাবে রিজার্ভের পরিমাণ ৩১ বিলিয়ন ডলারের বেশি (৩ হাজার ৪৭৪ কোটি)।
যথেষ্ট বৈদেশিক মুদ্রা হাতে না থাকলে দেশের খাদ্য, জ্বালানিসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানি ব্যাহত হয়। ডলারের দাম বাড়তে থাকে। মূল্যস্ফীতিও বাড়ে। অন্যদিকে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করতে না পেরে দেশ দেউলিয়া হয়। শ্রীলঙ্কা তেমন পরিস্থিতিতেই পড়েছিল।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বাংলাদেশের অবস্থাও খারাপ হয়ে যাচ্ছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে নিয়োগ পাওয়া বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর রিজার্ভের পতন ঠেকাতে সমর্থন হন। দেখা যাচ্ছে, রাজনৈতিক সরকার আসার পর, অর্থাৎ গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও রিজার্ভ বেড়েছে।
কয়েক মাসে মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে তেল-গ্যাস, সারের দাম বেড়েছে। তবে এখন রিজার্ভে পর্যাপ্ত ডলার থাকায় বাড়তি আমদানি খরচ সামাল দেওয়া যাচ্ছে। বিদেশি ঋণ শোধে ডলারের জোগান আছে।
কিছু অস্বস্তিও আছে। দেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতি অনেকটাই স্থবির। বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কম। উদ্যোক্তাদের মধ্যে বিনিয়োগে উৎসাহ না থাকায় শিল্পের মূলধনি যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল আমদানির চাহিদাও কম। ফলে ডলার খরচও কম; কিন্তু অর্থনীতি চাঙা হতে পারছে না।
জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘রিজার্ভ ভালো থাকার অন্যতম কারণ হলো দেড়-দুই বছর ধরে বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হয়েছে। রেমিট্যান্স আয় বেড়েছে। ভালো রিজার্ভ থাকায় জ্বালানি পণ্য আনতে বাড়তি তিন-চার বিলিয়ন ডলার খরচ করতে পেরেছি। বিদেশি ঋণও শোধ করা যাচ্ছে।’
মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, যখন আমদানির চাহিদা বাড়বে, তখন রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়বে। বিদেশি ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়ছে। ২০২৯ সাল নাগাদ ৭ বিলিয়ন ডলারের মতো বিদেশি ঋণ শোধ করতে হবে।
সংকট যেভাবে শুরু হয়েছিল
বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ হলো দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে জমা থাকা বৈদেশিক মুদ্রা ও অন্যান্য বৈদেশিক সম্পদের সঞ্চয়। বাংলাদেশে এই রিজার্ভের প্রধান অংশ ডলার। এ ছাড়া রিজার্ভে ইউরো, পাউন্ড, ইয়েনসহ বিভিন্ন বৈদেশিক মুদ্রা ও কিছু সোনাও থাকতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংক এই রিজার্ভ পরিচালনা করে। দেশের রপ্তানি আয়, প্রবাসী আয়, বিদেশি ঋণ ও অনুদানসহ বিভিন্ন উৎস থেকে বৈদেশিক মুদ্রা আসে। আবার আমদানি, বিদেশি ঋণ পরিশোধ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক লেনদেনে তা ব্যয় হয়।
২০২১ সালের আগস্ট মাসে রিজার্ভ রেকর্ড ৪৮ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়। তখন করোনা মহামারির কারণে আমদানি চাহিদা কমেছিল। প্রবাসীরাও পরিবার-পরিজনকে কোভিডের ধাক্কা সামাল দিতে বেশি ডলার পাঠিয়েছিলেন। ফলে রিজার্ভ রেকর্ড পর্যায়ে ওঠে।
আওয়ামী লীগ সরকার তখন রিজার্ভ থেকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ও পায়রা বন্দরের রাবনাবাদ চ্যানেলের ড্রেজিং খাতে রিজার্ভ থেকে অর্থ দেয়। আগে থেকেই ছিল রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল (ইডিএফ)। শ্রীলঙ্কাকেও দুই কোটি ডলার ঋণ দেওয়া হয়েছিল। আইএমএফ এসব বাদ দিয়ে প্রকৃত রিজার্ভের হিসাব রাখতে বলে, যা বিপিএম ৬ নামে পরিচিত।
২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ এবং বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় আমদানি খরচ মেটাতে হিমশিম খায় তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। ডলার–সংকট তৈরি হয়। ডলারের দামও বাড়তে থাকে। অব্যবস্থাপনায় ২০২৩ সালে ৮৬ টাকার ডলার ১২৮ টাকায় ওঠে। আমদানির খরচ সামাল দিতে বাংলাদেশ ব্যাংক নিজেদের কাছে থাকা ডলারও বিক্রি করে। ফলে রিজার্ভ কমতে থাকে।
২০২৪ সালের আগস্ট মাসে পতনের আগে আওয়ামী লীগ সরকার ২৫ দশমিক ৯২ বিলিয়ন ডলার রিজার্ভ রেখে গিয়েছিল। সেটি সম্ভব হয়েছিল কঠোর আমদানিনিয়ন্ত্রণ ও দেনা পরিশোধ পিছিয়ে দিয়ে।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার আসার পর ডলার–সংকট ও রিজার্ভ বাড়ানোকে গুরুত্ব দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। বাজারব্যবস্থার ওপর ডলারের দাম ছেড়ে দেওয়া হয়। পরে প্রবাসী আয় বৈধপথে আসা বৃদ্ধি পায়। ডলারের জোগান বাড়ে। রপ্তানিও আয় বাড়ে। ফলে অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসে রিজার্ভ বাড়ে ৯ বিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে সরকার দেনা পরিশোধ শুরু করে। আমদানিনিয়ন্ত্রণও কিছুটা কমিয়ে দেওয়া হয়।
বিএনপি সরকার আসার পরও প্রবাসী আয় এবং রপ্তানি আয়প্রবাহের ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকে। ডিসেম্বর থেকে মে মাস পর্যন্ত টানা ছয় মাস তিন বিলিয়ন ডলারের বেশি প্রবাসী আয় পাঠান প্রবাসীরা। রপ্তানি আয়ে প্রবৃদ্ধি আছে। ফলে রিজার্ভ আরও বাড়ে।
আমদানিতে আগের মতো নিয়ন্ত্রণ রাখেননি নতুন গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান। ফলে আমদানি সহজ হয়েছে এবং পরিমাণে বেড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান প্রথম আলোকে বলেন, ডলারের দাম বাজারভিত্তিক রাখা ও তদারকির ফলে ডলারের বাজার স্থিতিশীল আছে। এখন কেউ ডলার নিয়ে অভিযোগ করছেন না। প্রবাসী আয়ের চাঙাভাব ডলারের জোগান স্বাভাবিক রাখতে সহায়তা করেছে।
রিজার্ভে স্বস্তি কেন
রিজার্ভ বৃদ্ধির সবচেয়ে বড় স্বস্তি হলো আমদানি বিল পরিশোধের সক্ষমতা কিছুটা শক্তিশালী হয়েছে। বাংলাদেশকে শিল্পের কাঁচামাল, জ্বালানি, খাদ্যসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানি করতে নিয়মিত বিপুল অঙ্কের ডলার ব্যয় করতে হয়। ফলে রিজার্ভ শক্তিশালী থাকলে আমদানি পরিশোধ নিয়ে চাপ কম থাকে।
ইরান যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের দাম ছিল ৭০ থেকে ৭৫ ডলার। এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৫ ডলারে। ১৪-১৫ ডলারের প্রতি ইউনিট তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) দাম ২৭-২৮ ডলারে কিনতে হচ্ছে।
ফলে একই পরিমাণ জ্বালানি কিনতে সরকারকে অনেক বেশি বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করতে হচ্ছে। গত ২২ আগস্ট ঢাকা চেম্বারের এক অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, চলমান মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে সরকারের জ্বালানির বিল পরিশোধে অতিরিক্ত ৪-৫ বিলিয়ন বা ৪০০-৫০০ কোটি ডলার খরচ হয়েছে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, এখন যথেষ্ট রিজার্ভ না থাকলে জ্বালানি কেনা, অন্য পণ্য আমদানি এবং ঋণ পরিশোধ সম্ভব হতো না। বিদেশি ব্যাংকগুলো লেনদেনে নানা শর্ত আরোপ করত। রিজার্ভ আছে বলেই স্বস্তি। ব্যাংকিং ব্যবস্থায় এখন ডলারের দাম ১২৩–১২৪ টাকার মধ্যে। খোলাবাজারে তা ১২৬ টাকার মতো।
কালের কণ্ঠ
‘ভর্তুকির বরাদ্দ দুই মাসেই শেষ’—এটি দৈনিক কালের কণ্ঠের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও বিশ্ববাজারের জ্বালানির দামের অস্থিরতার বড় মাশুল দিতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। বেশি দামে জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি করে দেশের বাজারে তুলনামূলক কম দামে বিক্রি করায় বিপুল লোকসান গুনছে রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলো।
একই সঙ্গে বাড়ছে সরকারের ভর্তুকির বোঝা। চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসেই এলএনজি খাতে সরকারের ভর্তুকি সাত হাজার ৩০০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে, যেখানে পুরো বছরের জন্য বরাদ্দ ছিল সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বিশ্ববাজার থেকে চড়া দামে জ্বালানি তেল কিনে কম দামে বিক্রির ফলে গত আগস্ট পর্যন্ত ছয় মাসে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) লোকসান দিয়েছে ২২ হাজার কোটি টাকার বেশি। আর চড়া দামে এলএনজি আমদানি করে কম দামে বিক্রি করে গত ছয় মাসে নির্ধারিত ভর্তুকির বাইরে অতিরিক্ত ১৪ হাজার ৯০০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে পেট্রোবাংলার।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিদ্যুৎ খাতের বাড়তি উৎপাদন ব্যয়ও। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) সূত্র জানিয়েছে, চলতি অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে লোকসান ধরা হয়েছিল ৪৫ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু কয়লা, ফার্নেস অয়েল ও এলএনজির দাম বেড়ে যাওয়ায় চলতি অর্থবছরে বিপিডিবির লোকসান ৬০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সব ধরনের জ্বালানি বেড়ে যাওয়ায় এক ধরনের টালমাটাল অবস্থা তৈরি হয়েছে। তবে সরকারের প্রচেষ্টার কোনো কমতি নেই। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দূরদর্শী সিদ্ধান্ত ও কঠোর মনিটরিংয়ের কারণে সংকট নিরসনে সরকার সাধ্যমতো সব চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
এ বিষয়ে পেট্রোবাংলার পরিচালক (অর্থ) এ কে এম মিজানুর রহমান গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যুদ্ধের প্রভাবে গত ছয় মাসে নির্ধারিত ভর্তুকির বাইরে অতিরিক্ত ১৪ হাজার ৯০০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। গত দুই মাসে এলএনজির জন্য পাঁচ হাজার ৪০০ কোটি টাকা ভর্তুকি পাওয়া গেছে। এর সঙ্গে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বকেয়া এক হাজার ৯০০ কোটি টাকা যোগ হয়েছে। অর্থাৎ সব মিলিয়ে গত দুই মাসে এলএনজিতে মোট সাত হাজার ৩০০ কোটি টাকা ভর্তুকি পেয়েছে পেট্রোবাংলা।’
আন্তর্জাতিক বাজারে স্পট এলএনজির দাম বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরো জটিল হয়েছে। একসময় প্রতি এমএমবিটিইউ ১০ থেকে ১২ ডলারে এলএনজি কেনা হলেও গত আগস্টে দাম বেড়ে ১৮ থেকে ২২ ডলারে ওঠে। সেপ্টেম্বরের জন্য কেনা ৯টি কার্গোর অধিকাংশের দাম পড়েছে ২৩ থেকে ২৪ ডলার। আর অক্টোবরের সর্বশেষ কেনা একটি কার্গোর দাম দাঁড়িয়েছে ২৮ ডলার প্রতি এমএমবিটিইউ।
পেট্রোবাংলা ও রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কম্পানি লিমিটেডের (আরপিজিসিএল) তথ্যনুযায়ী, গত বছরের প্রথম আট মাসে দেশে ৭১টি এলএনজি কার্গো আনা হয়েছিল। চলতি বছরের একই সময়ে এসেছে ৬৮টি। গত বছরের জুলাই-আগস্টে ২১টি কার্গো এলেও চলতি বছরের একই সময়ে এসেছে মাত্র ১৫টি।
এ বিষয়ে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের যুগ্ম সচিব (অপারেশন অনুবিভাগ) মনির হোসেন চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণেই জ্বালানির আমদানি ব্যয় বেড়েছে। এলএনজি আমদানির জন্য কাতার ও ওমানের সঙ্গে আমাদের দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি রয়েছে। কিন্তু চুক্তি অনুযায়ী তারা এখন আমাদের এলএনজি সরবরাহ করতে পারছে না। ফলে বাধ্য হয়ে আমাদের স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কিনতে হচ্ছে। এতে দাম বেশি পড়ছে এবং সরবরাহের নিশ্চয়তাও কমে যাচ্ছে। এলএনজি কার্গোর দাম বেড়ে যাওয়ার এটিই মূল কারণ। বাড়তি দরে জ্বালানি তেল কিনে কম দামে বিক্রি করতে গিয়ে বিপিসির ব্যাপক হারে লোকসান বেড়েছে বলেও তিনি জানান।
এ বিষয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, ‘জ্বালানিসংকট সামাল দিতে বাধ্য হয়ে বেশি দামে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কিনছে সরকার। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির সরবরাহকারীরা ফোর্স মেজর ঘোষণা করায় স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কিনতে হচ্ছে। এতে বাড়তি খরচ হলেও মানুষের দুর্ভোগ ও শিল্প-কারখানার ক্ষতি বিবেচনায় নিয়ে সরকার এই ঝুঁকি নিচ্ছে।’
সমকাল
দৈনিক সমকালের প্রধান শিরোনাম ‘কারাগারে চিকিৎসা সংকট, সরঞ্জাম বাক্সবন্দি’। প্রতিবেদনে বলা হয়, গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে বিশেষায়িত কারা হাসপাতাল নির্মাণসহ কারা হাসপাতালগুলোতে বন্দিদের আধুনিক চিকিৎসাসেবা নিশ্চিতের উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রায় ১৪ বছর আগে কেনা হয় এক্স-রে মেশিন, অপারেশন থিয়েটারের যন্ত্রপাতি, এন্ডোস্কোপি, ইসিজি মেশিনসহ অত্যাধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম। কিন্তু প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও জনবল নিয়োগ না হওয়ায় কাশিমপুর বিশেষায়িত হাসপাতালটি চালু করা যায়নি। এতে এই হাসপাতালসহ কয়েকটি কারা হাসপাতালের জন্য প্রায় ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে কেনা অধিকাংশ চিকিৎসা সরঞ্জাম বছরের পর বছর বাক্সবন্দি হয়ে থেকে কার্যত নষ্ট হয়ে গেছে।
কারা অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, টেকনোলজিস্ট ও প্রশিক্ষিত জনবল না থাকায় কাশিমপুর কারা হাসপাতালটি চালু করা যায়নি। অন্য হাসপাতালেও ক্রয় করা যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা যাচ্ছে না। কারা নিয়োগবিধিতে চিকিৎসক বা হাসপাতালের জন্য যেই জনবল দরকার, সেগুলো নিয়োগ হয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মাধ্যমে। কিন্তু এসব জনবল না থাকায় যন্ত্রপাতিও ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
ভুক্তভোগীরা বলছেন, দীর্ঘ দিন কারাবন্দিদের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা থাকলেও তা কাটাতে কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। বন্দির সংখ্যা বাড়লে তা আরও প্রকট হয়। বর্তমানে সারাদেশের কারাগারের ধারণক্ষমতা ৪৫ হাজার। কিন্তু গতকাল রোববার পর্যন্ত কারাগারে দ্বিগুণের বেশি ১ লাখ ৩ হাজার ১০ জন বন্দি রয়েছে। তাদের মধ্যে পুরুষ ৯৯ হাজার ১৫৫ জন এবং নারী ৩ হাজার ৮৫৫ জন। কারাগারে বন্দির সংখ্যা বাড়লেও অসুস্থ বন্দিদের দুর্দশা কাটছে না। গতকাল এক দিনে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তিন কারাবন্দি মারা গেছেন।
কারা হাসপাতাল-সংক্রান্ত বিভিন্ন নথি ও কারা অধিদপ্তরের একাধিক সূত্রে জানা গেছে, ‘গাজীপুর জেলার কাশিমপুরে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার নির্মাণ’ প্রকল্পের আওতায় ২০০৩ সালে কাশিমপুর-২ কেন্দ্রীয় কারাগারে তিন তলাবিশিষ্ট ২০০ শয্যার একটি কারা হাসপাতালের ভবন নির্মাণ শুরু হয়। ২০০৫ সালে হাসপাতালটির কাজ শেষ হয়। ২০১১ সালে প্রথমে অপারেশন থিয়েটারের যন্ত্রপাতি ও এক্স-রে মেশিন, পরে আল্ট্রাসনোগ্রামসহ অন্যান্য মেশিন কেনা হয়। প্রায় সব ধরনের রোগের চিকিৎসা উপযোগী এই কারা হাসপাতালের জন্য উন্নতমানের অপারেশন থিয়েটার ও যন্ত্রপাতি, আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন, প্যাথলজি ল্যাবসহ সবকিছু কেনা ও স্থাপন করা হয়। এসব যন্ত্রপাতি ক্রয়-সংক্রান্ত সুপারিশ কমিটিতে কারা অধিদপ্তরসহ গণপূর্ত, সিভিল সার্জনের প্রতিনিধিরা ছিলেন। দুই ধাপে প্রায় ৯ কোটি টাকার চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনা হয়।
হাসপাতালটির জন্য একজন তত্ত্বাবধায়ক, দুইজন সিনিয়র কনসালট্যান্ট, ৯ জন জুনিয়র কনসালট্যান্ট, ২০ জন মেডিকেল অফিসারসহ ১৫০ জনবলের অনুমোদন ছিল। কিন্তু দুই যুগেও এসব জনবল নিয়োগ হয়নি। এতে কোটি কোটি টাকার যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা যায়নি। বাক্সবন্দি হয়ে আছে সেসব স্বাস্থ্যসেবার যন্ত্র।
এরপর বিভিন্ন সময়ে চট্টগ্রাম, কেরানীগঞ্জে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার ও খুলনা কারাগারের জন্যও এক্স-রে মেশিন, অপারেশন থিয়েটারের যন্ত্রপাতির সেট, ইসিজি মেশিন, এন্ডোস্কোপি মেশিনসহ প্রায় ৩ কোটি টাকার বিভিন্ন চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনা হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘ দেড় দশকেও সেগুলো চালু করা সম্ভব হয়নি। এতে অধিকাংশ যন্ত্রপাতি এখন ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়েছে।
১৯৯৮ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে ১০০ শয্যাবিশিষ্ট একটি কারা হাসপাতাল নির্মাণ করা হয়। পরে প্রায় ১ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি কেনা হয়। তিনজন ডাক্তারসহ ১০টি পদ রাখা হয়। কিন্তু এসব জনবল আর নিয়োগ না হওয়ায় যন্ত্রপাতিও অব্যবহৃত।
এ ছাড়া খুলনায় ২০১১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ১৭০ শয্যার কারা হাসপাতাল নির্মাণ করা হয়। হাসপাতালটির জন্য ১ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি কেনা হয়। কেরানীগঞ্জে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ২০০৫ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ১৭২ শয্যাবিশিষ্ট কারা হাসপাতাল নির্মাণ করা হয়। হাসপাতালটিতে প্রায় ৬১ লাখ টাকার যন্ত্রপাতি কেনা হয়। হাসপাতাল দুটিতে আটজন চিকিৎসকসহ ১৯টি পদে লোক নিয়োগের অনুমোদন থাকলেও নিয়োগ না হওয়ায় এসব যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা যায়নি।
কারাগারে চিকিৎসার ঘাটতির অভিযোগ
দেশের কারাগারগুলোয় চিকিৎসাসেবার সংকট, অবহেলা এবং জরুরি চিকিৎসার মারাত্মক ঘাটতির অভিযোগ আছে। গত বছরের ১৮ মে ‘মবের’ শিকার হয়ে গুরুতর আহত অবস্থায় ঢাকায় গ্রেপ্তার হন ঝালকাঠির নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ নেতা ওয়ালিউল্লাহ সুমন। পরে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে আদালতের মাধ্যমে তাঁকে কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়।
কয়েক মাস কারাভোগ করে ২৭ ডিসেম্বর জামিনে মুক্তি পাওয়া সুমন সমকালকে বলেন, আমাকে কারাগারের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। কিন্তু কোনো চিকিৎসাসেবা না পাওয়ায় আরও অসুস্থ হয়ে পড়ি। পরে ধীরে ধীরে কিছুটা সুস্থ হই। কারামুক্তির পর এক্স-রে, সিটি স্ক্যান, এমআরআইসহ বিভিন্ন পরীক্ষায় মাথার পেছনে রক্ত জমাট, মেরুদণ্ডে আঘাত এবং চোখে জটিলতা ধরা পড়ে। কারাগারে থাকাকালে কয়েকজন অসুস্থ বন্দির দুর্দশা দেখেছি।
গত ২৩ জুন চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার বিস্ফোরক আইনের একটি মামলায় গ্রেপ্তার হন নুরুল আলম। তিনি ওই উপজেলার ঢেমশা ইউনিয়নের নিষিদ্ধ যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। ওইদিনই তাঁকে আদালতের মাধ্যমে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়। পরদিন সকালে কারাগারে হঠাৎ বুকে ব্যথা ও শ্বাস কষ্ট দেখা দিলে দ্রুত তাঁকে কারা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাঁর ইসিজির রিপোর্ট খারাপ আসায় দ্রুত উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের জ্যেষ্ঠ তত্ত্বাবধায়ক ইকবাল হোসেন গত ৩১ জুলাই সমকালকে বলেন, আমাদের এখানে নিয়মিত চিকিৎসক থাকেন না। মেডিকেল অফিসার ছাড়া কোনো কনসালট্যান্টও নেই। প্রাথমিক কিছু চিকিৎসা দেওয়া হয়। গুরুতর অসুস্থ বন্দিদের চিকিৎসা দেওয়ার সরঞ্জাম নেই।
কারা হাসপাতালটিতে ২০১৫ সালে আধুনিক সরঞ্জাম কেনার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনার বিষয়টি অনেক আগের, তাই আমার জানা নেই।
সব সরকারের আমলেই কারাগারে ও পুলিশ হেফাজতে মৃত্যু নিয়ে দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংগঠনগুলো উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। ২০২৪ সালে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন সংগঠনের কয়েকজন নেতাকর্মী, সাবেক এমপি-মন্ত্রী কারা হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনায় স্বজনদের পক্ষ থেকে চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ করা হয়।
বর্তমানে দেশে ৭৫টি কারাগার চালু রয়েছে। প্রতিটি কারাগারে হাসপাতাল থাকলেও প্রয়োজনীয় জনবল ও চিকিৎসা সরঞ্জামের ঘাটতি রয়েছে। মাত্র ২৩টিতে অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে। ৫৩টি কারাগারে অ্যাম্বুলেন্স নেই। তাই অসুস্থ বন্দিদের অনেক ক্ষেত্রেই বিকল্প ব্যবস্থায় হাসপাতালে নিতে হয়। এ সংকট নিরসনে নতুন করে ৪৪টি অ্যাম্বুলেন্স কেনার উদ্যোগ নিয়েছে কারা অধিদপ্তর। এ জন্য রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজকে চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে। আগামী বছরের জুনের মধ্যে অ্যাম্বুলেন্স সরবরাহ করা হতে পারে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
ইত্তেফাক
‘আবেগ দিয়ে অর্থনীতি চলে না, ব্যক্তির কারণে প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা যায় না’—এটি দৈনিক ইত্তেফাকের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, ইমোশনের (আবেগ) ওপর অর্থনীতি চলে না। আইনের ওপর অর্থনীতি চলতে হবে। ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের পরিচয় এক নয়। একটি কোম্পানি আইনগত ও করপোরেট সত্তা। কোনো ব্যক্তির কারণে একটি কোম্পানির কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া যায় না। কারণ, ঐ প্রতিষ্ঠানে কর্মীরা কাজ করেন, প্রতিষ্ঠানের ঋণ ও দায় রয়েছে এবং অর্থনীতিতে ঐ প্রতিষ্ঠানের অবদান রয়েছে। কোনো কোম্পানি বন্ধ করে দেওয়ার আগে দেশের অর্থনীতিতে তার কী প্রভাব পড়বে, সেটিও হিসাব করতে হবে। ঐ কোম্পানির এমপ্লয়মেন্টের ক্ষতি করে, বন্ধ করে দিয়ে কোনো দেশের অর্থনীতি চলতে পারে না।
গতকাল রবিবার সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে ঋণখেলাপির দায়ে অভিযুক্ত এস আলম গ্রুপকে নতুন করে ঋণ দেওয়া নিয়ে এনসিপির সংসদ সদস্য আবদুল হান্নান মাসউদের এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী এসব কথা বলেন। সম্পূরক প্রশ্নে হান্নান মাসউদ বলেন, বাংলাদেশ এখন বিশ্বের মধ্যে ঋণখেলাপির দিক থেকে চ্যাম্পিয়ন। অন্যতম শীর্ষ ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠান এস আলমের মালিকানাধীন এসএস পাওয়ারকে ৩১ লাখ ৯৭ হাজার ৫৬১ ডলারের এলসি খোলার অনুমতি দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এস আলম গ্রুপের মালিকানাধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে বর্তমানে ঋণের পরিমাণ ২ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি। তিনি জানতে চান—সরকার এসব ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানকে নিলামে তুলে কিংবা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে পরিণত না করে, বিশেষ ঋণ দেওয়ায় মূলত ঋণখেলাপিদের উত্সাহিত করছে কি না, এর মাধ্যমে বিদেশি ঋণদাতারা বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনুত্সাহিত হবে কি না?
জবাবে অর্থমন্ত্রী আরো বলেন, অর্থনীতি ও আর্থিক খাত পরিচালনার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট নীতি রয়েছে। কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ থাকলে তার বিরুদ্ধে মামলা হতে পারে এবং আইন অনুযায়ী বিচার হবে। এস আলম গ্রুপ সম্পর্কে তিনি বলেন, যারা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত, তাদের কাউকে ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। তাদের বিরুদ্ধে মামলা চলছে এবং বিচার অব্যাহত থাকবে।
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক আইন ভঙ্গ করে কাউকে ঋণ দিচ্ছে না। যেখানে পুনঃতপশিলের সুযোগ রয়েছে, আইন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলো সে সুযোগ নিতে পারবে। তবে, ব্যক্তিগতভাবে যারা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত, তাদের বিচার চলবে।
রাষ্ট্রায়ত্ত ৬ ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ১ লাখ ৪৭ হাজার ৭৭৬ কোটি টাকা, শীর্ষে জনতা
বাগেরহাট-৪ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মো. আব্দুল আলীমের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী সংসদকে জানান, রাষ্ট্রায়ত্ত ছয়টি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪৭ হাজার ৭৭৬ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। গত ৩০ জুনের হিসাব অনুযায়ী, এসব ব্যাংকের মধ্যে সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণ রয়েছে জনতা ব্যাংকে। ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৭৫ হাজার ৩৯৬ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। অগ্রণী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ২৯ হাজার ২৯ কোটি ৬৭ লাখ টাকা, রূপালী ব্যাংকের ১৯ হাজার ২৮১ কোটি ৭৪ লাখ, সোনালী ব্যাংকের ১৫ হাজার ৪৮ কোটি ৩৯ লাখ, বেসিক ব্যাংকের ৮ হাজার ১৩১ কোটি ৯ লাখ এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৮৮৮ কোটি ৭৯ লাখ টাকা।
মাথাপিছু ঋণ ১ লাখ ২৯ হাজার টাকা
কুষ্টিয়া-১ আসনের এমপি রেজা আহাম্মেদের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, চলতি বছরের ৩১ মার্চ পর্যন্ত দেশের জনগণের মাথাপিছু ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ২৯ হাজার ২৩৯ টাকা। এ সম্পর্কিত হান্নান মাসউদের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, জনগণের মাথাপিছু ঋণের বোঝা কমানোর লক্ষ্যে সরকার রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, সরকারি অর্থের সুষ্ঠু ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং ঋণ ব্যবস্থাপনাকে আরো সুশৃঙ্খল করার ওপর গুরুত্বারোপ করছে। সরকারি নিজস্ব আয় বৃদ্ধির মাধ্যমে ঋণের প্রয়োজনীয়তা কমানোর উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে সরকারি ব্যয়কে অধিকতর সাশ্রয়ী ও ফলপ্রসূ করার এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সরকারের অর্থায়ন চাহিদা কমানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
০১০-২০২৪ পর্যন্ত বিদেশি ঋণ ৮১.৮৩ বিলিয়ন ডলার
কক্সবাজার-৩ আসনের লুত্ফর রহমানের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, ২০১০ থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত বিদেশ থেকে ৮১ দশমিক ৮৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ নেওয়া হয়েছে। একই সময়ে সরকারের বৈদেশিক ঋণের বিপরীতে ১৭ দশমিক ১১ বিলিয়ন ডলার আসল এবং ৬ দশমিক ০৪ বিলিয়ন ডলার সুদ পরিশোধ করা হয়েছে। তিনি জানান, ২০১০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দেশে বেসরকারিভাবে পরিচালিত ১৩টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
১৪ লাখের বেশি কৃষকের ঋণ মওকুফ
চুয়াডাঙ্গা-৪ আসনের এমপি মো. রুহুল আমিনের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু জানান, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ নেওয়া ১৪ লাখ ৩৪ হাজার ৪৮২ জন কৃষকের ঋণ সুদসহ মওকুফ করা হয়েছে। এ বাবদ ব্যাংকগুলোর পাওনা ১ হাজার ৩৫২ কোটি ৭৪ লাখ টাকা সরকার পরিশোধ করেছে। সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য মোসা. ফরিদা ইয়াসমিনের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, ২০১০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত চোরাচালানিদের কাছ থেকে ২ হাজার ৫১৮ কেজি ৬৬৮ গ্রাম স্বর্ণ এবং ৩৭৭ কেজি ৩৪৮ গ্রাম রৌপ্য বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে।
নয়া দিগন্ত
দৈনিক নয়া দিগন্তের প্রধান শিরোনাম ‘সরকার-বিরোধী দল উত্তেজনা বাড়ছে’। খবরে বলা হয়, দেশের রাজনীতিতে ফের দৃশ্যমান হচ্ছে সরকার ও বিরোধী পক্ষের মুখোমুখি অবস্থান। এক দিকে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলছেন, উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক সঙ্কট মোকাবেলার সুযোগ নিয়ে কিছু রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তি বিভ্রান্তি ছড়িয়ে অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করছে। অন্য দিকে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের অভিযোগ-সরকার জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে, গণভোটের রায় ও জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে গড়িমসি করছে এবং অর্থনীতি, জ্বালানি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামলাতে পারছে না।
৫ সেপ্টেম্বর বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, স্বৈরাচারী আমল ও অন্তর্বর্তী সরকারের রেখে যাওয়া বিভিন্ন সমস্যা সরকার সমাধানের চেষ্টা করছে। একই সাথে তিনি সতর্ক করেন, এসব সমস্যাকে পুঁজি করে কেউ অরাজকতা সৃষ্টি করলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে। তিনি জনগণের কথা বলার অধিকার ও গণতান্ত্রিক নীতি সমুন্নত রাখার কথাও বলেন।
কিন্তু বিরোধী জোটের অবস্থান একেবারেই ভিন্ন। তাদের ভাষ্য, রাজনৈতিক কর্মসূচিকে ‘অস্থিতিশীলতা’ হিসেবে চিহ্নিত না করে সরকারকে জনগণের বাস্তব সমস্যার সমাধান দিতে হবে। আগস্টে ১১ দলীয় জোট সরকারের প্রথম ১৮০ দিনের কর্মকাণ্ডের মূল্যায়ন করে গ্যাস-বিদ্যুৎ সঙ্কট, জননিরাপত্তা ও দ্রব্যমূল্যের মতো বিষয় সামনে আনে। জোটের নেতারা সরকারের ‘সাফল্যের’ দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলেন, জনজীবনের সঙ্কট বিবেচনায় সরকারকে সফল বলার সুযোগ নেই।
উত্তেজনার কেন্দ্রে ৩টি প্রশ্ন
বর্তমান সঙ্ঘাতকে শুধু সরকারবিরোধী আন্দোলন বনাম সরকারি প্রতিরোধ হিসেবে দেখলে রাজনৈতিক বাস্তবতার বড় অংশ বাদ পড়ে যায়। মূলত তিনটি প্রশ্ন এখন বিরোধের কেন্দ্রে।
প্রথমত, জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়ন। ১১ দলীয় জোটের অন্যতম প্রধান দাবি এটি। জোটের নেতারা বলছেন, গণভোটে সংবিধান-সংক্রান্ত সংস্কারের পক্ষে যে রায় এসেছে, সেটির রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। এ নিয়ে সংসদের ভেতরেও বিরোধী দলের সাথে সরকারের মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, অর্থনীতি ও জনজীবনের সঙ্কট। জামায়াত ইতোমধ্যে সরকারের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার গ্যাস-বিদ্যুৎ-জ্বালানির ব্যয় বৃদ্ধি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং বৈশ্বিক ও ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তাকে বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। একই সাথে বিরোধী দল বাজেটের ঘাটতি ও ঋণনির্ভরতার সমালোচনা করেছে।
তৃতীয়ত, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনের নিরপেক্ষতা। ১১ দলীয় জোটের নেতারা অভিযোগ করছেন, গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পদে দলীয় আনুগত্যকে অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে এবং সরকার প্রশাসনকে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত করছে। আগস্টে জামায়াত সরাসরি প্রশাসনে দলীয়করণ, আইনশৃঙ্খলার অবনতি এবং দ্রব্যমূল্য ও জ্বালানি সঙ্কট মোকাবেলায় ব্যর্থতার অভিযোগ তোলে।
সংসদের ভেতর ও রাজপথে দ্বৈত চাপ
বর্তমান পরিস্থিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো- বিরোধী রাজনীতি কেবল সংসদের ভেতরে সীমাবদ্ধ নেই। জামায়াত সংসদে প্রধান বিরোধী দলের অবস্থান ব্যবহার করার পাশাপাশি রাজপথেও চাপ বাড়াচ্ছে। তাদের কৌশলের মধ্যে রয়েছে সংসদীয় সমালোচনা, রাজনৈতিক কর্মসূচি, স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সংগঠন বিস্তার এবং প্রয়োজন হলে আইনি লড়াই।
এটি সরকারের জন্য একটি জটিল রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি করছে। সংসদ কার্যকর থাকলে রাজপথে বড় আন্দোলনের প্রয়োজন নেই- সরকার পক্ষের এমন যুক্তি থাকলেও বিরোধীদের বক্তব্য হলো, সংসদীয় প্রক্রিয়ার পাশাপাশি জনগণের কাছে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরাও গণতান্ত্রিক অধিকারের অংশ।
এ দ্বন্দ্বের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হচ্ছে, বিরোধী দলের রাজনৈতিক কর্মসূচি এবং সরকারের বিরুদ্ধে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির অভিযোগ- দু’টিকে এক করে ফেলা। বিরোধী দলের আন্দোলন যদি শান্তিপূর্ণ ও সাংবিধানিক সীমার মধ্যে থাকে, তাহলে সেটিকে অরাজকতা হিসেবে চিহ্নিত করা রাজনৈতিক পরিসর সঙ্কুুচিত করতে পারে। আবার রাজনৈতিক কর্মসূচির আড়ালে সহিংসতা, ভাঙচুর বা রাষ্ট্রীয় স্থাপনায় হামলা হলে সরকার আইন প্রয়োগ করবে- এটি রাষ্ট্রের স্বাভাবিক দায়িত্ব।
অর্থাৎ, মূল পরীক্ষা হবে কোথায় বৈধ রাজনৈতিক প্রতিবাদ শেষ হচ্ছে এবং কোথায় থেকে সহিংস বা আইনবিরোধী কর্মকাণ্ড শুরু হচ্ছে।
বণিক বার্তা
‘প্রধান শিক্ষকের ৬৬% ও সহকারী প্রধান শিক্ষকের ৭৫% পদ ফাঁকা’—এটি দৈনিক বণিক বার্তার প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, মাউশির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক, সহকারী প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকের পদের বড় অংশ শূন্য। প্রধান শিক্ষক না থাকায় বিদ্যালয়ে শিক্ষাদান ও সামগ্রিক ব্যবস্থাপনায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিক্ষক সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়ছে শিক্ষার মানে, এসএসসির ফলাফলেও তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে
দেশে শতবর্ষ পুরনো স্কুলের একটি রাজবাড়ী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়। শিক্ষার মানের উৎকর্ষে জেলাজুড়ে প্রতিষ্ঠানটির সুনাম রয়েছে। তবে ঐতিহ্যবাহী এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এখন চলছে কোনো নেতৃত্ব ছাড়া। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও দুই সহকারী প্রধান শিক্ষকের তিনটি পদই শূন্য। সব মিলিয়ে বিদ্যালয়ে শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে ১৪টি। এ চিত্র শুধু রাজবাড়ী উচ্চ বিদ্যালয়ের নয়। দেশের অনেক সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় এমন শিক্ষক সংকটের মধ্য দিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে শিক্ষার মানে এবং এসএসসির ফলাফলেও তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।
রাজবাড়ী উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক সালাউদ্দিন বলেন, ‘পদ শূন্য থাকায় এক বিষয়ের শিক্ষককে অন্য বিষয়ের ক্লাস নিতে হচ্ছে। এভাবে প্রক্সি ক্লাস নিতে গিয়ে শিক্ষকরা নিজেদের বিষয়ের যথাযথ প্রস্তুতি নেয়ার সময় পাচ্ছেন না। ফলে শিক্ষার মান খারাপ হচ্ছে।’
মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক, সহকারী প্রধান শিক্ষক ও বিষয়ভিত্তিক সহকারী শিক্ষকের পদের বড় অংশ শূন্য। আর মাঠপর্যায়ে মাধ্যমিক শিক্ষা মনিটরিংয়ে যেসব পদের কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করেন সেখানেও শূন্য রয়েছে অনেক পদ।
দেশে বর্তমানে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৭০২। এর মধ্যে যেসব বিদ্যালয় নতুন জাতীয়করণ হয়েছে সেগুলোর অধিকাংশে প্রয়োজনীয় শিক্ষক পদই সৃজন হয়নি। এর জেরে বিদ্যালয় সংখ্যা ৭০২ হলেও প্রধান শিক্ষকের পদ আছে ৫৭২টি। এই ৫৭২ পদের ৩৭৯টি শূন্য, যা মোট পদের ৬৬ শতাংশ। একই চিত্র সহকারী প্রধান শিক্ষক ও বিষয়ভিত্তিক সহকারী শিক্ষক পদের ক্ষেত্রেও। বিদ্যালয়গুলোয় সাধারণত এক বা একাধিক সহকারী প্রধান শিক্ষকের পদ থাকে। বর্তমানে ৭০৩ সহকারী প্রধান শিক্ষক পদের বিপরীতে কর্মরত ১৭৫ জন আর শূন্য পদের সংখ্যা ৫২৮, যা মোট পদের ৭৫ শতাংশ। এছাড়া বিষয়ভিত্তিক ১৬ হাজার ১৪১ পদের বিপরীতে কর্মরত ১০ হাজার ৯৩ জন, শূন্য পদের সংখ্যা ৬ হাজার ৪৮, যা মোট পদের প্রায় ৩৭ শতাংশ।
শিক্ষকরা বলছেন, ভারপ্রাপ্ত প্রধান বা সহকারী প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বে যারা আছেন তারা বড় প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না। বাড়তি দায়িত্ব পালন করতে হয় বলে তারা শ্রেণীকক্ষে যথেষ্ট সময় দিতে পারেন না। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে পাঠদানে।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, ‘যেসব প্রতিষ্ঠানে প্রধান শিক্ষক তৎপর, সেখানে শিক্ষার মান, পঠন-পাঠন এবং শিক্ষার্থীদের মনন বিকাশে ইতিবাচক পরিবর্তন আসে। তাই অনেক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ ফাঁকা থাকা শিক্ষার মানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। অনেক বিদ্যালয়ে ইংরেজি ও গণিতের মতো আবশ্যিক বিষয়েরও শিক্ষক নেই। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অন্য বিষয়ের শিক্ষক দিয়ে গণিতের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ক্লাস নেয়া হচ্ছে।’
আজকের পত্রিকা
দৈনিক আজকের পত্রিকার প্রধান শিরোনাম ‘উপকূলে বাড়ছে ডেঙ্গুর প্রকোপ’। প্রতিবেদনে বলা হয়, দুই মাস ধরে দেশে ডেঙ্গুর সংক্রমণ ঊর্ধ্বমুখী। রাজধানী ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরীর বাইরে এবার বিভিন্ন জেলাতেও ডেঙ্গু আক্রান্তের হার অনেক বেশি। এর মধ্যে খুলনা, পিরোজপুর, বরিশাল, বাগেরহাট, ঝালকাঠি, গাজীপুর, ময়মনসিংহ, কক্সবাজার ও নারায়ণগঞ্জ— এই ৯ জেলায় প্রায় ১৫ হাজার রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে, যা মোট রোগীর এক-তৃতীয়াংশের বেশি।
প্রকোপ দ্রুত বাড়তে থাকা জেলাগুলোর একটি বড় অংশ উপকূলীয় এলাকায়। ডেঙ্গুর এই ভৌগোলিক বিস্তার নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
উপকূলীয় এলাকায় ডেঙ্গুর ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণের সম্ভাব্য কয়েকটি কারণের কথা বলেছেন রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন। তিনি আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘উপকূলীয় লবণাক্ত এলাকায় মানুষ অনেক সময় বৃষ্টির পানি বড় পাত্রে জমিয়ে মাসের পর মাস ব্যবহার করে।
ওই জমিয়ে রাখা পানিতে এডিস মশা বংশবিস্তার করতে পারে। গত বছর বরগুনায় যেসব কারণে সংক্রমণ বেশি হয়েছিল, এবার সেই একই কারণে পিরোজপুর, ঝালকাঠি, বাগেরহাট ও খুলনায় বাড়ছে কি না, তা মাঠপর্যায়ে তদন্ত করা দরকার।’
সরকারের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকে গতকাল রোববার পর্যন্ত ৪২ হাজার ৫৯০ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে; মৃত্যু হয়েছে ১১৭ জনের। প্রথম পাঁচ মাসে সংক্রমণ তুলনামূলক কম থাকলেও জুন থেকে তা দ্রুত বাড়তে থাকে। জুনে ২ হাজার ৯০৭, জুলাইয়ে ৯ হাজার ২০৬ এবং আগস্টে ২০ হাজার ৫৩৬ জন রোগী ভর্তি হয়। সেপ্টেম্বরের প্রথম ছয় দিনেই ভর্তি হয়েছে আরও ৬ হাজার ৭৪৪ জন। মৃত্যুও জুন থেকে বাড়তে থাকে—জুনে ১৩, জুলাইয়ে ৩৬, আগস্টে ৪৩ এবং সেপ্টেম্বরের প্রথম ছয় দিনে ২০ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ওই ৯ জেলার মধ্যে খুলনায় ৩ হাজার ৭৬২, ময়মনসিংহে ১ হাজার ৭১২, পিরোজপুরে ১ হাজার ৭০০, গাজীপুরে ১ হাজার ৪৮৫, ঝালকাঠিতে ১ হাজার ৪৫৩, বাগেরহাটে ১ হাজার ১৮৬, বরিশালে ১ হাজার ১৯৯, কক্সবাজারে ১ হাজার ৬৯ এবং নারায়ণগঞ্জে ১ হাজার ১৫ জন রোগী ভর্তি হয়েছে। এসব জেলার মধ্যে খুলনায় ১৮, ময়মনসিংহে ১১, বরিশালে ৮, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, বাগেরহাটে ও গাজীপুর ১ জন করে ৪ জন মারা গেছে। চলতি বছরে ৪৯ জেলায় ডেঙ্গুতে মৃত্যুর কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় গত শনিবার রাতে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক দেশের সব বিভাগীয় পরিচালক, হাসপাতালের পরিচালক-তত্ত্বাবধায়ক ও সিভিল সার্জনদের সঙ্গে বিশেষ সভা করেছেন। সভায় ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসায় নিয়োজিত চিকিৎসক ও সহায়ক কর্মীদের নির্দেশনা দেওয়া হয়। জেলা হাসপাতালসহ সব হাসপাতালে ডেঙ্গু পরীক্ষার কিট ও প্রয়োজনীয় ফ্লুইড মজুত এবং প্রয়োজনে ডেঙ্গু কর্নারে শয্যা বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
দেশ রূপান্তর
‘ওয়ান ইলেভেন কুশীলবদের দিকে পুলিশের চোখ’—এটি দৈনিক দেশ রূপান্তরের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘ওয়ান-ইলেভেন’ নামেই পরিচিত। তৎকালীন সামরিক বাহিনীর প্রত্যক্ষ সহায়তায় ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে গঠিত হয়েছিল অরাজনৈতিক তত্ত্বাবধায়ক সরকার। সেই সরকারের অধীনে ‘মাইনাস টু ফর্মুলা’ বাস্তবায়ন চেষ্টা করা হয়। তখন রাজনৈতিক নেতা, শীর্ষ শিল্পপতি-ব্যবসায়ীদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন এবং তাদের কাছে থেকে অবৈধভাবে বিপুল পরিমাণ অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। ওয়ান-ইলেভেনের নেপথ্যে থাকা কুশীলব ও তাদের সহযোগীদের আইনের আওতায় আনতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাজ করছে।
ইতিমধ্যে মাস্টারমাইন্ড ও প্রভাবশালী ব্যক্তি অবসরপ্রাপ্ত লে. জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করে কয়েক দফা রিমান্ডে নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছে তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি অনেক রাঘববোয়ালের নামও বলে দিয়েছেন। তথ্য পেয়ে তাদের প্রোফাইল তৈরির কাজ গুছিয়ে এনেছে গোয়েন্দারা। যারা দেশে আছে তাদের নজরদারিতে রাখা হয়েছে। আর যারা বিদেশে আছে তাদের অবস্থান নিশ্চিত হতে ইন্টারপোলের দ্বারস্থ হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ। সরকারের হাইকমান্ডের গ্রিন সিগন্যাল পেলেই চিঠি পাঠাবে ইন্টারপোলে।
সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানায়, ২০০৬ সালের শেষের দিকে রাজনৈতিক অস্থিরতা, তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন এবং নির্বাচন বর্জনের মুখে সেনা হস্তক্ষেপের পরিবেশ তৈরি হয়। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি দেশে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়। এর মাধ্যমে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আত্মপ্রকাশ ঘটে। পরবর্তী দুই বছরের শাসনের মূল কারিগর বা কুশীলব হিসেবে একাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম উঠে আসে। ওয়ান-ইলেভেন সরকারের সবচেয়ে বিতর্কিত অধ্যায় ছিল ‘দুর্নীতিবিরোধী অভিযান’র নামে দেশের শীর্ষ রাজনীতিবিদ ও বিশিষ্ট ব্যবসায়ীদের ওপর নির্যাতন ও আর্থিক ব্ল্যাকমেইলিং। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা এবং বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে রাজনীতি থেকে মাইনাস করার লক্ষ্যে কারারুদ্ধ করা হয়। শুধু দুই নেত্রীই নন, দুই দলের কেন্দ্রীয় থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যায়ের কয়েক হাজার নেতাকর্মীকে যৌথ বাহিনী গ্রেপ্তার করে। তাদের ডিজিএফআই কার্যালয় ও টিএফআই সেলে নির্যাতন করা হয়। এমনকি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও বাদ যাননি নির্যাতন থেকে।
ইন্টারপোলের দ্বারস্থ হচ্ছে পুলিশ: পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, যারা বিরাজনীতিকরণ নীতি ও ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলাকে তাত্ত্বিক ভিত্তি দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, তাদের নিয়ে আমরা করছি। পরবর্তী সময়ে সরকার পরিবর্তনের পর এবং আইনগত পদক্ষেপের আতঙ্কে এদের বড় একটি অংশ দেশত্যাগ করে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডাসহ বিভিন্ন দেশে অবস্থান করছেন। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অপব্যবহারের দায়ে ওয়ান-ইলেভেনের কুশীলবদের বিচারের মুখোমুখি করার প্রক্রিয়া হিসেবে ইন্টারপোলের সহযোগিতা চাওয়া হবে। ইতিমধ্যে কুশীলবদের একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছে। সরকারের সিগন্যালের অপেক্ষায় আছি আমরা। ইতিমধ্যে আমরা ইন্টারপোলের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ওই সময়ে হঠাৎ ক্ষমতাধর হয়ে ওঠা কয়েকজন উচ্চাকাক্সক্ষী সামরিক কর্মকর্তা এবং তাদের বেসামরিক সহযোগীর নিয়ন্ত্রণে দেশ পরিচালিত হয়েছে। সেই সময়ে শুদ্ধি অভিযানের নামে শীর্ষ রাজনৈতিক নেতা এবং ব্যবসায়ীদের গ্রেপ্তারের নামে হয়রানি করা হয়। অবৈধভাবে অর্থ আদায়সহ কতিপয় কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নানা গুরুতর অভিযোগ আছে।
তলব করেও ফেরানো যায়নি ফজলুল বারীকে: আলোচিত প্রভাবশালী সেনা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে ২৪ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ ও মানব পাচারের অভিযোগে পল্টন মডেল থানায় দায়ের হওয়া একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখায় পুলিশ। পুলিশের গোপন একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই সময়ের সরকার প্রধান উপদেষ্টা ড. ফখরুদ্দীন আহমদ স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন আমেরিকায়। তৎকালীন সেনাপ্রধান মইন ইউ আহমেদও আছেন ওই দেশে। সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও আলোচিত কুশীলব বিগ্রেডিয়ার জেনারেল জে. (অব.) চৌধুরী ফজলুল বারী আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর দেশে আর ফেরেননি। তিনি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডয়ায় অবস্থান করছেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শেষ সময়ে তিনি ওয়াশিংটন ডিসিতে বাংলাদেশ দূতাবাসে সামরিক অ্যাটাশের চাকরি নিয়ে দেশত্যাগ করেছিলেন। পরে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এলে তাকে দেশে ফেরার নির্দেশ দিলেও তিনি আর আসেননি।
শিক্ষক পরিচয়ে পলায়ন ডিজিএফআইয়ের সাবেক ডিজির : আরেক আলোচিত ও বিতর্কিত সামরিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা এটিএম আমিন বর্তমানে আছেন দুবাইয়ে। একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন। এক-এগারোর সময়ে ডিজিএফআইয়ের পরিচালক ছিলেন। পরে তাকে মেজর জেনারেল পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছিল। নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার পরও তিনি একই পদে কর্মরত ছিলেন। অবসরের আগে আনসারের ডিজির দায়িত্ব দেওয়া হয় তাকে। ২০০৯ সালের ১৭ মে সব আর্থিক সুবিধাসহ সেনাবাহিনী থেকে অবসরে যান তিনি। পরে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক পরিচয়ে দেশত্যাগ করেন। এরপর আমিন আর দেশে ফেরেননি। ওই সময়ে ডিজিএফআইয়ের আরেক ক্ষমতাধর কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব.) সাঈদ জোয়ার্দার দুবাই-কানাডা যাওয়া-আসার মধ্যে আছেন।
তলবের কথা শুনেই দেশত্যাগ ফখরুদ্দীনের: পুলিশের ওই গোপন প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর ফখরুদ্দীন আহমদ কিছুদিন দেশেই ছিলেন। তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন দেশেই থাকবেন। প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব ছাড়ার পর তার নিরাপত্তাও দিয়েছিল সরকার। বসবাস করতেন সরকারের দেওয়া গুলশানের একটি বাড়িতে। কিন্তু ওই বছরের মে মাসে খবর রটে ফখরুদ্দীনকে সংসদীয় কমিটিতে তলব করা হচ্ছে। তার বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগ তদন্ত হবে। এরপরই তিনি পরিবার নিয়ে পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে। দেশটির নাগরিক হওয়ার সুবাধে বাড়ি কেনেন মেরিল্যান্ড স্টেটের পটোম্যাকে। সেখানে তার দুটি বাড়ির একটিতে তিনি পরিবার নিয়ে থাকেন। আর অন্য বাড়িতে থাকে তার মেয়ের পরিবার। দীর্ঘদিন থেকে তিনি সেখানে অবস্থান করলেও বাংলাদেশি কমিউনিটিকে তিনি এড়িয়ে চলছেন। মাঝেমধ্যে তাকে দেখা যায় নিউ ইয়র্কে।
যুক্তরাষ্ট্রে বিতর্কিত সেনাপ্রধান: সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল মইন ইউ আহমেদ অবসর নেন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯ সালের মাঝামাঝিতে। বিডিআর বিদ্রোহের সময় তিনি দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ওই সময় তার বিতর্কিত ভূমিকার কারণে বিডিআর বিদ্রোহে ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তা প্রাণ হারান বলে কমিশনের তদন্তে উঠে এসেছে। ওই বছরের ১৪ জুন তিনি যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান। প্রথমে ফ্লোরিডায় ছোট ভাই ও ছেলের কাছে থাকতেন। পরে তার ‘মালটিপল মাইলোনা’ ক্যানসার ধরা পড়ে। চিকিৎসার জন্য আগে ঘনঘন নিউ ইয়র্কে যাতায়াত করলেও এখন তিনি সেখানে যাচ্ছেন না। বর্তমানে ফ্লোরিডার পামবিচে বসবাস করছেন।
বাংলাদেশ প্রতিদিন
দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিনের প্রধান শিরোনাম ‘সংকটের মধ্যেই সার পাচার মিয়ানমারে’। প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশব্যাপী চলমান সারসংকটের মধ্যেই প্রতিবেশী মিয়ানমারে পাচার হচ্ছে ইউরিয়া ও টিএসপি সার। ডিলারদের বড় একটি অংশ বস্তাপ্রতি ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা লাভের আশায় করছে পাচার। দেশেও তৈরি হয়েছে কৃত্রিমসংকট। সুযোগ নিয়ে এক শ্রেণির মুনাফালোভী বিক্রি করছে চড়া দামে। রোপা আমন চাষের অপেক্ষায় থাকা কৃষক ঘুরছে দোকানে দোকানে। অভিযান চালিয়েও সার সিন্ডিকেটের মূল হোতাদের নাগাল পাচ্ছে না আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তবে সরকারের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে পর্যাপ্ত সার মজুতের। আগামী সপ্তাহের মধ্যে সরবরাহব্যবস্থা পুরো নিয়ন্ত্রণে আসবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরবরাহব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ হলেই কেটে যাবে সংকট। জানা গেছে, সীমান্তবর্তী কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফের পাশাপাশি চট্টগ্রাম ও ভোলার উপকূলীয় এলাকা ব্যবহার করে সংঘবদ্ধ চক্র এসব সার পাচার করছে বলে সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক অভিযানে তথ্য মিলেছে। সর্বশেষ গত শনিবার ভোলার তজুমদ্দিনের মেঘনা নদীতে অভিযানকালে মিয়ানমারে পাচারের উদ্দেশ্যে বহন করা ৮ হাজার কেজি ইউরিয়া সার জব্দ করেছে কোস্টগার্ড। কৃষি সচিব মো. সেলিম খান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘ষড়যন্ত্রকারীরা সার নিয়ে চক্রান্ত করেছিল। মনিটরিংয়ের ফলে চক্রান্ত সফল হয়নি। বর্তমানে সার মজুত পরিস্থিতি সন্তোষজনক। আমরা নানা পদক্ষেপ নিয়েছি। মাঠেও ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে পুরো নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে। নতুন ডিলার নিয়োগ দিচ্ছি। শনিবার আরও দুটি জাহাজ ভিড়েছে চট্টগ্রামে। ফলে সার নিয়ে কোনো উদ্বেগের কারণ নেই।’
গত ১ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে মিয়ানমারে পাচারের উদ্দেশ্যে নেওয়া ১৪ লাখ টাকা মূল্যের ৪১০ বস্তা ইউরিয়া সার জব্দ করে কোস্ট গার্ড। পরদিন হালিশহরের দবিরখাল এলাকায় ট্রাক থেকে ফিশিং বোটে জব্দ হয় ২২০ বস্তা বা ১১ হাজার কেজি সার। ৬ সেপ্টেম্বর কক্সাবাজারের রামুতে প্রায় ৩০ টন বা এক ট্রাক সার আটক হয়। এর আগে ৩০ জুন উখিয়ায় পাচারের উদ্দেশ্যে নেওয়া ১০০ বস্তা ইউরিয়া সার জব্দ করে বিজিবি। ওই দুই মাসে আটটি চালানে ৩ হাজার ৩১০ বস্তা সার জব্দ করা হয়।
এ বিষয়ে রামু বিজিবি সেক্টর কমান্ডার কর্নেল আনোয়ার বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘সার চোরাচালান রোধে কক্সবাজার বিজিবির পক্ষ থেকে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। এ বিষয়ে বিজিবি সবসময় সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
কোস্টগার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, কোস্ট গার্ডের অভিযানে একের পর এক চালান জব্দ হলেও এ পাচার পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে সংগ্রহ করা সার ছোট-বড় নৌযানে তুলে উপকূলীয় পথ ধরে মিয়ানমারের দিকে নেওয়া হচ্ছে।
লাভের আশায় পাচার: বাংলাদেশে যে ইউরিয়া সার প্রতি বস্তা প্রায় ১ হাজার ২৫০ টাকায় বিক্রি হয়, মিয়ানমারে তা বাংলাদেশি টাকায় ৬ হাজার টাকা বিক্রি করা যায়। এ মূল্য ব্যবধানই পাচারকারীদের বড় ধরনের মুনাফার সুযোগ তৈরি করছে। তবে সরকারি রেটে অনেক সময় সার না পাওয়ায় প্রতি বস্তা ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার টাকায় বাংলাদেশে ক্রয় করে পাচারকারীরা মিয়ানমারে ৬ হাজার টাকায় বিক্রি করে। জানতে চাইলে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান রবিবার টেলিফোনে বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘সার পাচারের কোনো তথ্য আমার জানা নেই’।
বিক্রি হচ্ছে কালো বাজারে: রাজশাহীর পবার আলীমগঞ্জ ব্লকের বিসিআইসি সারের ডিলার মেসার্স মুন লাইট কৃষিবিতান। প্রকৃত কৃষকরা যখন সারের জন্য ছোটাছুটি করছেন, তখন এই ডিলার গোপনে একাধিক ব্যক্তির কাছে ৩০ বস্তা করে সার বিক্রি করেছেন। এই সার বিক্রি করলেও কোনো ভাউচার দেখাতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। পবা উপজেলার হরিপুর ব্লকের আরেক সারের ডিলার মেসার্স ভাই ভাই ট্রেডার্স। একাধিক ব্যক্তির কাছে গোপনে ১৩ বস্তা করে সার বিক্রি করেছেন।
সাতক্ষীরায় আমন মৌসুমে সারের পর্যাপ্ত সরকারি বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও বিপণন ব্যবস্থার অনিয়ম ও অসাধু চক্রের কারসাজিতে কৃষকদের মধ্যে চরম উদ্বেগ দেখা দিয়েছিল। মৌসুমের শুরুতে অসাধু চক্র ‘প্যানিক বায়িং’ তৈরি করে বস্তাপ্রতি ৫০ থেকে ১০০ টাকা বেশি আদায় করেছিল বলে যে অভিযোগ উঠেছিল, বর্তমানে তা নিয়ন্ত্রণে এসেছে। গতকাল লালমনিরহাটে সারের তীব্রসংকট ও ডিলারদের কারসাজির অভিযোগে লালমনিরহাটে রংপুর-বুড়িমারী মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন স্থানীয় কৃষকরা। কালোবাজারে সার পাচারের সময় ৩৯৫ বস্তা সারসহ মিঠু নামের ট্রাক ড্রাইভারকে গ্রেপ্তার করেছে টাঙ্গাইলের মধুপুর থানা পুলিশ। সিলেটে খুচরা বিক্রেতারা সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি করছেন। ডিলারদের দাবি, কমিশন কম হওয়ায় তারা সরকার নির্ধারিত দামেই খুচরা বিক্রেতাদের কাছে বিক্রি করছেন। একই অবস্থা কুষ্টিয়া ও রাজবাড়ীতেও। সবচেয়ে বেশি সংকট ইউরিয়া ও টিএসপি সারের। বর্তমানে পরিবেশকের দোকানে বস্তাপ্রতি ইউরিয়া সার বিক্রির কথা ১ হাজার ৩৫০ টাকায়, কিন্তু বাইরের দোকানে সেই সার বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকায়।
দোকানে দোকানে ঘুরছেন কৃষক: রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার আমনচাষি আসাদুজ্জামান আসাদ গত বৃহস্পতিবার থেকে ডিলারের কাছে ঘুরে ঘুরেও সার পাননি। অভিযোগ রয়েছে দিনাজপুরে ৫০ কেজির এক বস্তা সার ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। কুড়িগ্রামে সারের কৃত্রিমসংকটে কৃষকরা রয়েছেন দুশ্চিন্তায়। সার কিনতে গিয়ে নানা সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে জেলার কৃষকদের।
গোডাউনে বা ডিলারদের কাছে পর্যাপ্ত সার থাকা সত্ত্বেও খুলনায় কৃত্রিমসংকট দেখিয়ে কালোবাজারে চড়া দামে সার বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। একইভাবে খুলনা বিভাগে যশোর, মেহেরপুর ও কুষ্টিয়ায় সরকারি নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে সার কিনতে হচ্ছে চাষিদের। সারের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে কোনো কোনো স্থানে। যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার নারাঙ্গালী গ্রামের কৃষক আবদুল আলিম জানান, সারের সংকট থাকায় খোলাবাজার থেকে দ্বিগুণ দামে তিনি ২০ কেজি টিএসপি কিনেছেন। সদর উপজেলার শেখহাটি গ্রামের কৃষক কবীর হোসেন কয়েকদিন দোকানে দোকানে ঘুরে জামরুলতলা বাজারের দোকান থেকে ২৫ কেজি টিএসপি জোগাড় করতে পারলেও দাম দিতে হয়েছে প্রায় দ্বিগুণ। জামালপুরে নির্ধারিত দামের চেয়ে বস্তাপ্রতি ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা বেশি দামে কিনতে হচ্ছে।
আগামী সপ্তাহের মধ্যে পুরো নিয়ন্ত্রণে আসবে: কৃষি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশে চার ধরনের সার তথা ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপির মজুত পর্যাপ্ত রয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল পর্যন্ত দেশে ইউরিয়া নন-ইউরিয়া মিলে ১২ লাখ ২৯ হাজার হাজার ৪০০ টন সার মজুত আছে। এর মধ্যে ইউরিয়া মজুত আছে ৪ লাখ ২৭ হাজার টন, টিএসপি ৩ লাখ ৫২ হাজার ৮০০ টন, ডিএপি ৩ লাখ ৩২ হাজার ৪০০ টন এবং এমওপি ১ লাখ ১৭ হাজার ২০০ টন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের একই সময়ে মজুত ছিল ইউরিয়া ৩ লাখ ৮৪ হাজার ৮০০ টন, টিএসপি ১ লাখ ৮৭ হাজার ১০০ টন, ডিএপি ২ লাখ ৮৯ হাজার ১০০ টন এবং এমওপি ২ লাখ ৯৮ হাজার টন।
