বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অনিয়ম-দুর্নীতি দেখভালের দায়িত্ব বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি)। অথচ সেই ইউজিসি’র আর্থিক হিসাবেই ধরা পড়েছে বড় ধরনের অনিয়ম। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিভিন্ন খাতে ইউজিসি’র বাজেট বরাদ্দ ছিল ৮৫ কোটি ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা। অথচ ব্যয় দেখানো হয়েছে ১১৩ কোটি ২৫ লাখ ৫৩ হাজার ৬৭১ টাকা। অর্থাৎ বরাদ্দের চেয়ে ২৮ কোটি ২৩ লাখ ৩ হাজার ৬৭১ টাকা বেশি ব্যয় দেখানো হয়েছে। সবমিলিয়ে ১৬৩ কোটি টাকার দুর্নীতি উঠে এসেছে শিক্ষা অডিট অধিদপ্তরের নিরীক্ষায়।
শুধু বরাদ্দের চেয়ে বেশি ব্যয় নয়। ইউজিসি’র ব্যাংক হিসাব পরিচালনা থেকে শুরু করে ঠিকাদারের বিল, বৃত্তির টাকা, অগ্রিম উত্তোলন, সম্মানী-ভাতা, ওভারটাইম, গাড়ি, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ বিল- বিভিন্ন খাতেই মিলেছে অনিয়মের চিত্র। কোথাও নিয়ম ভেঙে টাকা দেয়া হয়েছে। কোথাও কাজ শেষ না হলেও ঠিকাদারের বিল পরিশোধ করা হয়েছে। আবার যে টাকা খরচই হয়নি, সেটিও দেখানো হয়েছে ব্যয় হিসেবে।
অডিট প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ইউজিসি’র বিভিন্ন চলতি ও সঞ্চয়ী ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে আর্থিক কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে। অথচ অর্থ বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক কার্যক্রম ‘পিএল’ হিসাবের মাধ্যমে পরিচালনা এবং ‘আইবাস+’ ব্যবস্থায় অর্থ ছাড় করার কথা। এ নির্দেশনা অনুসরণ না করায় ৮৩ কোটি ৬৮ লাখ ১০ হাজার টাকা অনিয়মিতভাবে ব্যয় করা হয়েছে বলে অডিটে উল্লেখ করা হয়েছে।
২২টি খাতে ধরা পড়েছে দুর্নীতির চিত্র। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্পের কাজেও বড় ধরনের অনিয়মের তথ্য পেয়েছে অডিট। চুক্তি অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ে বিভিন্ন পূর্তকাজ শেষ হয়নি। কোনো কোনো প্যাকেজে কাজ বাস্তবায়নে ৪৮১ থেকে ১ হাজার ২৮ দিন পর্যন্ত বিলম্ব হয়েছে। তারপরও ঠিকাদারের কাছ থেকে বিলম্ব জরিমানা আদায় করা হয়নি। বরং বিল পরিশোধ করা হয়েছে। অডিট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চুক্তির শর্ত অনুযায়ী প্রতিদিন বিলম্বের জন্য জরিমানা আদায়ের কথা থাকলেও তা আদায় না করায় সরকারের ২৩ কোটি ৪১ লাখ ৮৬ হাজার ৫৪১ টাকা রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে।
সরকার বৃত্তি ও মেধাবৃত্তি খাতে ৯ কোটি টাকা ছাড় দিয়েছিল। ইউজিসি ওই টাকা বৈদেশিক পিএইচডি তহবিলের ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তর করে। কিন্তু আয়-ব্যয় বিবরণীতে সেটি শিক্ষকদের বৈদেশিক স্কলারশিপ খাতে ব্যয় হিসেবে দেখানো হয়। অডিটে বলা হয়েছে, প্রকৃতপক্ষে ওই টাকা ব্যয় হয়নি। অব্যবহৃত অর্থ সমাপনী স্থিতি হিসেবেও দেখানো হয়নি। ফলে ব্যয় না হওয়া সত্ত্বেও ৯ কোটি টাকা ব্যয় হিসেবে দেখানো হয়েছে।
ইউজিসি’র বিভিন্ন কর্মকর্তা-কর্মচারী সিলিং সীমার অতিরিক্ত অগ্রিম নিয়েছেন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এমন অগ্রিমের পরিমাণ ৬৪ লাখ ২ হাজার ১৫৫ টাকা। এককালীন অগ্রিম উত্তোলনের ক্ষেত্রে বিষয়টি অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগে পাঠানোর কথা থাকলেও তা করা হয়নি বলে অডিটে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন সভা, প্রশিক্ষণ, দাপ্তরিক কাজ, জ্বালানি ও অন্যান্য খাতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অগ্রিম দেয়া হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এসব অগ্রিম সমন্বয় করা হয়নি। এতে ৪০ লাখ ৯২ হাজার ৫৭৯ টাকার আর্থিক অনিয়ম হয়েছে।
ইউজিসি’র অর্গানোগ্রাম-বহির্ভূত প্রফেসরদের ১২ মাসের সম্মানী হিসেবে দেয়া হয়েছে ৪৩ লাখ ৯ হাজার ১৭৬ টাকা। অডিটে বলা হয়েছে, তারা ইউজিসি’র কর্মরত জনবল নন। তাদের সম্মানী দেয়ার ক্ষেত্রে অর্থ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনাও অনুসরণ করা হয়নি। শুধু তাই নয়, প্রাপ্যতা না থাকা সত্ত্বেও শিডিউল প্রস্তুত কমিটির সদস্যদের সম্মানী দেয়া হয়েছে ৩ লাখ ৮৬ হাজার ৭০০ টাকা। তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের ওভারটাইম বাবদ দেয়া হয়েছে ৩৬ লাখ ৯৫ হাজার ৫৬১ টাকা। পঞ্চম গ্রেডের কর্মকর্তাদের মোবাইল ফোন বিল হিসেবে দেয়া হয়েছে ২ লাখ ৮০ হাজার টাকা।
গাড়ি মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণেও নিয়ম মানা হয়নি। বার্ষিক সিলিংয়ের অতিরিক্ত মেরামতে ব্যয় হয়েছে ৬ লাখ টাকা। প্রাপ্যতার অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যবহারে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ৫ লাখ ৮৫ হাজার ৮০২ টাকা। আবাসিক কোয়ার্টারের বিদ্যুৎ ও পানির বিল পরিশোধেও নির্দেশনা মানা হয়নি। এতে সরকারের ১০ লাখ ২৯ হাজার ৬৩৫ টাকা আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ও সংশ্লিষ্ট সেবা সরবরাহ ও প্রতিস্থাপনের কাজে ব্যয় হয়েছে ৯৪ লাখ ৭৬ হাজার ২৩০ টাকা। অডিটে বলা হয়েছে, এসব কাজে রাজউকের অনুমোদন প্রয়োজন হলেও তা নেয়া হয়নি।
ক্রয় নীতিমালা অনুসরণ না করার অভিযোগও রয়েছে। বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তির নামে অনিয়মিত ব্যয়ে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ৭ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। ক্রয় পরিকল্পনা না করেই ব্যয় করা হয়েছে ১৬ লাখ ৭২ হাজার টাকা। অডিটে আরও বলা হয়েছে, ক্রয় পরিকল্পনা-সংক্রান্ত নিয়ম অনুসরণ না করেই ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৬ কোটি ৭২ লাখ ১০ হাজার টাকা ব্যয় করেছে ইউজিসি। এসব ব্যয়ের বিপরীতে বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনার চাহিদাও নিরীক্ষায় উপস্থাপন করা হয়নি।
এদিকে, ইউজিসি’র বাজেট বরাদ্দ ও প্রকৃত ব্যয়ের হিসাবেও বড় ধরনের ব্যবধান পাওয়া গেছে। বিভিন্ন খাতে ৮৫ কোটি ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দের বিপরীতে ব্যয় দেখানো হয়েছে ১১৩ কোটি ২৫ লাখ ৫৩ হাজার ৬৭১ টাকা। বরাদ্দের চেয়ে অতিরিক্ত এই ২৮ কোটি ২৩ লাখ ৩ হাজার ৬৭১ টাকা ব্যয়ের কারণ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে অডিট।
আর্থিক এসব অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে ইউজিসি’র অডিট বিভাগের পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) নাহিদ সুলতানা শিক্ষা অডিট অধিদপ্তরের আপত্তির লিখিত জবাব দেয়া হয়েছে বলে জানান।
