দেশের চলমান সংকটকে পুঁজি করে কিছু রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তি বিভ্রান্তির মাধ্যমে অরাজকতা সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে বলে অভিযোগ করেছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি’র চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি বলেছেন কেউ যদি অরাজকতা সৃষ্টি করতে চায়, অবশ্যই দেশের আইনে বলে দেয়া আছে, কীভাবে অরাজকতাকে কনট্রোল করতে হয়। কাজেই সরকার হিসেবে এবং শুধু সরকার হিসেবে নয়, জনগণের দ্বারা একটি নির্বাচিত সরকার হিসেবে পরিষ্কারভাবে বলতে চাই, প্রত্যেকে প্রত্যেকের সীমার মধ্যে থাকা দরকার।
শনিবার রাজধানীর ফার্মগেটে বাংলাদেশ কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে বিএনপি’র ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে এক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন। সভায় শুরুতে বিএনপি’র প্রতিষ্ঠাতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও দলের চেয়ারম্যান বেগম খালেদা জিয়াসহ সকল শহীদদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। প্রথমে জাতীয় সংগীত এবং পরে দলীয় সংগীত পরিবেশনায় জাতীয়তাবাদী দলের ওপরে একটি প্রামাণ্য চিত্র প্রদর্শন করা হয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, গত কিছুদিন ধরে আমরা খেয়াল করছি, যে সকল সমস্যা আমরা ইনহেরিট করেছি, স্বৈরাচার আমলেই হোক অথবা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের রেখে যাওয়া সমস্যাই হোক না কেন, সে সকল সমস্যা আমরা সমাধানের চেষ্টা করছি। সমস্যা নেই আমরা কখনোই বলছি না, সমস্যা আছে। অবশ্যই বিভিন্ন ক্ষেত্রে সমস্যা আছে। কিন্তু এসব সমস্যাগুলোকে পুঁজি করে আমরা খেয়াল করছি যে, কিছু রাজনৈতিক দল, কিছু ব্যক্তি বিভিন্নভাবে বিভ্রান্তি সৃষ্টির চেষ্টা করছেন এবং বিভ্রান্তি তৈরির মাধ্যমে দেশে একটি অরাজকতা তৈরি করার চেষ্টা করছেন।
এ ব্যাপারে সরকারের অবস্থান তুলে ধরে তিনি বলেন, আমি পরিষ্কারভাবে বলতে চাই যে, অবশ্যই বাংলাদেশের জনগণ এই সরকারকে দায়িত্ব দিয়েছে দেশ পরিচালনা করার। অবশ্যই আমরা গণতন্ত্রের ধারাকে সমুন্নত রাখবো। গণতান্ত্রিক যেটি নীতি-নৈতিকতা আছে আমরা চেষ্টা করবো আমাদের সর্বোচ্চ দিয়ে সেগুলোকে আপহোল্ড করার জন্য। কিন্তু কেউ যদি অরাজকতা সৃষ্টি করতে চায়। অবশ্যই দেশের আইনে বলে দেয়া আছে, কীভাবে অরাজকতাকে কনট্রোল করতে হয়। কাজেই সরকার হিসেবে এবং শুধু সরকার হিসেবে নয়, জনগণের দ্বারা একটি নির্বাচিত সরকার হিসেবে পরিষ্কারভাবে বলতে চাই, প্রত্যেকে প্রত্যেকের সীমার মধ্যে থাকা দরকার।
সরকারপ্রধান বলেন, স্বৈরাচারের আমরা দেখেছি, একটি রাজনৈতিক দল গুপ্ত বেশ ধারণ করেছিল। তারা স্বৈরাচারের ভেতরে গুপ্তভাবে লুকিয়েছিল। পরবর্তীতে আমরা দেখছি তাদের নিজেদের লোকজনই বেরিয়ে এসে নিজেরাই স্বীকার করেছে, বলেছে। আমরা খেয়াল করছি বেশ কিছু রাজনৈতিক দল বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছে, যা মাত্র আপনাদের সামনে আমি তুলে ধরলাম। এই বিভ্রান্তির মাধ্যমে, যে স্বৈরাচারকে বাংলাদেশের মানুষ এদেশ থেকে বিতাড়িত করেছে- তারাও এই বিভ্রান্তের মধ্যে অরাজকতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে। এমনও তো হতে পারে যে, স্বৈরাচার সময় যে সকল গুপ্তরা স্বৈরাচারের আড়ালে লুকিয়ে ছিল, এখন কী সেই গুপ্তদের ভেতরে কি স্বৈরাচার লুকিয়ে থেকে এই অরাজকতাকে কি উস্কে দিতে চাইছে?
তিনি আরও বলেন, তাই যদি হয় তাহলে তো বলতে হবে, যারা গুপ্ত তারা সেই স্বৈরাচারকেই আবার সামনে নিয়ে আসার কাজ করছে। কারণ কয়েকদিন আগে তো আমরা দেখলাম যে, গুপ্তদের একজন নেতা বলেছে যে, তারা আসলে আমাদের কোনো আপত্তি নেই। তাহলে তো দেখা যাচ্ছে একজন আরেকজনকে বিভিন্নভাবে গুপ্ত রাখার চেষ্টা করছে।
বিএনপি’র চেয়ারম্যান বলেন, আমার জাতীয়তাবাদী শক্তির সকল নেতাকর্মীকে আহ্বান করবো, আসুন আমরা জনগণকে আরও সচেতন করি। কে কাকে মুক্ত করার দায়িত্ব নিচ্ছে, সেটি জনগণের সামনে আমরা উন্মুক্ত করে দেই। কারণ এই যে গুপ্ত বাহিনী, এরা একাত্তর সাল থেকে আমরা দেখেছি- বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ বিভিন্ন সময়-অসময়ে একজন আরেকজনকে আড়াল করেছে, একজন আরেকজনকে আশ্রয় দিয়েছে। সেটি ’৭১ সাল হোক, সেটি ’৮৬ সাল হোক, সেটি ’৯৬ সাল হোক- সেটি গত এক যুগ হোক, সেটি বর্তমানে হোক না কেন, বিভিন্ন সময় তারা একজন আরেকজনকে আড়াল করে দিয়ে চলছে। আজ তাদের এই রাজনীতি জনগণের সামনে তুলে ধরতে হবে, জনগণকে পরিষ্কার করে দিতে।
সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচারিত এক আলোচনার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, বিএনপি কিভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সঙ্গে জড়িত, বিএনপি’র প্রতিষ্ঠাতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এই দেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছে, সো ইট ইজ ডান। এটাকে কোনোভাবে যে যতই চেষ্টা করুক, আইন, আদালত যা দিয়ে চেষ্টা করুক, কোনোভাবেই (বিএনপি) এটাকে মুছে ফেলা যাবে না। যিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন, যেটার জন্য লাখ লাখ মানুষ অকাতরে জীবন দান করেছিল, ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের পরে আমরা দেখেছি মানুষ স্বাধীনতা লাভ করলেও গণতন্ত্রের স্বাদ মানুষ পায়নি; বরং মানুষ দেখেছে কীভাবে একদলীয় বাকশাল কায়েম করা হয়েছিল। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান যখন দেশের দায়িত্ব পান, উনি একটি কাজ করলেন। উনি বহুদলীয় গণতন্ত্র দেশে চালু করলেন আবার। এটিকে কোনোভাবেই আর কেউ পাল্টে দিতে পারবে না।
প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের বহুদলীয় গণতন্ত্র, মুক্তবাজার অর্থনীতি, বিদেশে শ্রমবাজার সৃষ্টি এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সংসদীয় গণতন্ত্র, টেকসই গণতন্ত্র, নারী শিক্ষার উন্নয়ন, বিকাশমান অর্থনীতি, নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার পালাবদল ব্যবস্থা প্রভৃতি কার্যক্রম তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
তারেক রহমান বলেন, সরকার গঠন করার সঙ্গে সঙ্গে আমরা দেখেছি, শুধু ভঙ্গুর অর্থনীতি নয়- ভঙ্গুর স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, ভঙ্গুর শিক্ষাব্যবস্থা, ভঙ্গুর যোগাযোগ ব্যবস্থাসহ এইরকম বহুবিধ সমস্যা আমরা ইনহেরিট করেছি। এই মুহূর্তে যদি বলতে হয়, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় কী সমস্যা? এই মুহূর্তে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বড় সমস্যা আনফরচুনেটলি, যেটা আমরা ইনহেরিট করেছি- সেটা হচ্ছে জ্বালানির সমস্যা বাংলাদেশে। বাংলাদেশের মানুষ, এই মুহূর্তে বহু মানুষ বিদ্যুতের কষ্ট পাচ্ছে, জ্বালানির ক্ষেত্রে কষ্ট পাচ্ছে। আমরা সেটা অস্বীকার করছি না। যেহেতু বিএনপি জনগণ দ্বারা নির্বাচিত একটি সরকার, সেজন্য বিএনপি একটি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। হ্যাঁ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে একটি সময়ের প্রয়োজন, বাস্তবায়ন করার আরও কিছু সময় প্রয়োজন। কিন্তু বিএনপি সেভাবেই তার কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করছে যে, ভবিষ্যতে আবারো বিশ্বে বিভিন্ন সমস্যা তৈরি হতে পারে এবং সমস্যা তৈরি হলে যেন দেশের মানুষকে এই জ্বালানি সংকটে পড়তে না হয়, দেশের মানুষকে সেভাবেই বিএনপি তার কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করছে। আজকে যেহেতু বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল এই মুহূর্তে দেশ পরিচালনার দায়িত্বে আছে। আজকে বহু মানুষ বহু শিল্প কলকারখানার মালিকসহ সাধারণ বহু মানুষ যে বিদ্যুতের কষ্টে বা জ্বালানি কষ্টে আছেন, তাদের সকলের কাছে আমি দলের পক্ষ থেকে দুঃখ প্রকাশ করছি।
বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর সভাপতিত্বে এবং প্রচার সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দিন টুকুর সঞ্চালনায় সভায় অর্থনীতিবিদ মাহবুবউল্লাহ, বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আবদুল মঈন খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, বেগম সেলিমা রহমান, এজেডএম জাহিদ হোসেন, আমানউল্লাহ আমান, ফরহাদ হালিম, ইসমাইল জবিউল্লাহসহ দলের অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা বেষ্টনীতে প্রবেশের চেষ্টা, পুলিশের হেফাজতে বাইকার: বিএনপি’র ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (কেআইবি) মিলনায়তনে সভায় যোগ দেয়ার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জন্য নির্ধারিত নিরাপত্তা বেষ্টনীতে প্রবেশের চেষ্টা করার অভিযোগে এক বাইকচালককে হেফাজতে নিয়েছে পুলিশ। বিকাল ৪টার দিকে প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানস্থলে প্রবেশের পরেই এ ঘটনা ঘটে বলে জানান তেজগাঁও থানার ওসি মো. মনিরুজ্জামান। ওসি বলেন, খামারবাড়ি মোড়ে পুলিশ মোতায়েন ছিল। প্রধানমন্ত্রীর অনুষ্ঠানস্থলে আসা এবং জনসমাগমের কারণে খামারবাড়ি মোড় থেকে ফার্মগেটের দিকে যেতে সড়কের বাম পাশের লেনটি বন্ধ করে দেয়া হয়। তবে ডান পাশের লেন হয়ে ফার্মগেটের দিকে যাওয়ার লেনটিতে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখা হয়।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের গাড়িবহর তার কার্যালয় থেকে বিজয় সরণি ও উড়োজাহাজ ক্রসিং হয়ে অনুষ্ঠানস্থলে যান। প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহর প্রবেশের পরেই মোড় থেকে বাম দিকের লেনে ওই বাইকার প্রবেশের চেষ্টা করেন। এ সময় সেখানে দায়িত্বরত সার্জেন্ট তাকে থামিয়ে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে। পরে বাইকসহ ওই যুবককে হেফাজতে নেয় তেজগাঁও থানা পুলিশ। তবে তাৎক্ষণিকভাবে তার নাম-পরিচয় জানাতে পারেননি ওসি মনিরুজ্জামান।
