কুমিল্লার সদর দক্ষিণ উপজেলার বড় ধর্মপুর কলেজপাড়া এলাকায় পারিবারিক বিরোধকে কেন্দ্র করে সাবেক যুবলীগ নেতা শাহ ইমরান মজুমদারের বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা, হয়রানি, জমি নিয়ে বিরোধ এবং চেক জালিয়াতিসহ নানা অভিযোগ উঠেছে। তাঁর আপন ছোট ভাই শাহজাহান মজুমদারের দাবি, বড় ভাইয়ের দায়ের করা একের পর এক মামলায় তিনি ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা দীর্ঘদিন ধরে হয়রানির শিকার হচ্ছেন।
এ বিষয়ে ৫ সেপ্টেম্বর (শনিবার) বিকেলে বড় ধর্মপুর কলেজপাড়ায় শাহজাহান মজুমদারের বাড়িতে সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সংবাদ সম্মেলনে শাহজাহান মজুমদার ও তাঁর পরিবারের সদস্য এবং এলাকাবাসী এসব অভিযোগ তুলে ধরেন।
অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন বড় ধর্মপুর কলেজপাড়া এলাকার মৃত আবদুস ছোবহানের ছেলে শাহ ইমরান মজুমদার (৫৩)। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি স্বৈরাচার আমলে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন এবং সদর দক্ষিণ উপজেলা যুবলীগের সদস্য ছিলেন। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তিনি এলাকায় নিয়মিত থাকেন না। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে অতীতে তিনি এলাকায় প্রভাব বিস্তার করতেন এবং বিভিন্ন বিরোধে মামলা-মোকদ্দমার আশ্রয় নিতেন।
এবার তাঁর বিরুদ্ধে নিজ পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধেও একের পর এক মামলা দিয়ে হয়রানি করার অভিযোগ উঠেছে।
শাহজাহান মজুমদারের অভিযোগ, তাঁর বড় ভাই শাহ ইমরান মজুমদার তাঁর ও পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে একের পর এক প্রায় নয়টি মামলা করেছেন। পাশাপাশি বিভিন্ন বিষয়ে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে তাঁদের চাপের মধ্যে রাখার চেষ্টা করছেন। জমি নিয়ে বিরোধ, চেকসংক্রান্ত মামলা এবং পারিবারিক সম্পত্তির হিসাব-নিকাশকে কেন্দ্র করেই এসব ঘটনার সূত্রপাত বলে দাবি তাঁর।
শাহজাহান মজুমদার বলেন, “আমার বড় ভাই একসময় পরিবারের প্রধানের মতো ছিলেন। যৌথভাবে অর্জিত সম্পত্তি ও পরিবারের উপার্জনের হিসাবও তাঁর কাছেই থাকত। কিন্তু সময়ের সঙ্গে তিনি আমাদের পরিবারের সম্পদ নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেন। এসব অন্যায়ের প্রতিবাদ করায় আমি ও আমার পরিবার তাঁর রোষানলে পড়েছি।”
শাহজাহান মজুমদার আরও অভিযোগ করেন, ১৯৯১ সালে লালমাই বাজারসংলগ্ন আইটি পার্ক সড়কের পশ্চিম পাশে তিন ভাইয়ের অর্থে সমান অংশে ৩০ শতক জমি কেনা হয়। তিনি তখন প্রবাসে থাকায় তাঁর ১০ শতক জমি মায়ের নামে রেজিস্ট্রি করা হয়েছিল। পরবর্তীতে তাঁর দাবি অনুযায়ী, মাকে চাপ প্রয়োগ করে ওই জমি নিজের নিয়ন্ত্রণে নেন শাহ ইমরান মজুমদার।
শাহজাহানের ভাষ্য, পরবর্তীতে তিনি প্রবাসে থাকা অবস্থায় বড় ভাইয়ের কাছ থেকে আরও ৮ শতক জমি কেনেন। দেশে ফিরে জমি পরিমাপ করার পর তাঁর ক্রয়কৃত জমির একটি অংশ কম পাওয়া যায় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগটি ওঠে চেকসংক্রান্ত মামলা নিয়ে।
শাহজাহান মজুমদারের স্ত্রী রোকেয়া মজুমদারের দাবি, ২০১৪ সালে ব্যাংক ঋণের জন্য গ্যারান্টার হওয়ার কথা বলে শাহ ইমরান মজুমদার তাঁর কাছ থেকে একটি সাদা চেক নেন। দীর্ঘদিন পর সেই চেক ব্যবহার করে ২০২৪ সালে ৪০ লাখ টাকার মামলা করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
রোকেয়া মজুমদার বলেন, “ব্যাংক ঋণের কথা বলে আমার কাছ থেকে সাদা চেক নেওয়া হয়েছিল। পরে সেই চেকে ৪০ লাখ টাকা বসিয়ে মামলা করা হয়। বিষয়টি জানার পর আমি আদালতের আশ্রয় নিয়েছি।”
রোকেয়ার দাবি, ২০২৪ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর তিনি কুমিল্লার আদালতে শাহ ইমরান মজুমদারের বিরুদ্ধে প্রতারণার মামলা করেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ওই মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে আদালত শাহ ইমরান মজুমদারকে ১৮ মাসের কারাদণ্ড ও ১০ হাজার টাকা জরিমানা করেন।
এদিকে লাকি আক্তার নামে এক নারী অভিযোগ করেন, চেকসংক্রান্ত মামলায় তিনি সাক্ষী হওয়ায় তাঁকেও বিভিন্ন মামলায় জড়ানো হয়েছে। তাঁর দাবি, শুধু তাঁকেই নয়, তাঁর বাবা-মা ও স্বামীকেও মামলায় আসামি করা হয়েছে।
এসব মামলা হয়রানি ও চাপ সৃষ্টি করার উদ্দেশ্যে করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
শাহজাহান মজুমদার আরও অভিযোগ করেন, তাঁদের মায়ের মৃত্যুর পরও পারিবারিক বিরোধের অবসান হয়নি। তাঁর দাবি, বড় ভাই শাহ ইমরান মজুমদার মায়ের জানাজায়ও উপস্থিত হননি। তবে এ অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
এ সময় উপস্থিত স্থানীয় ইউপি সদস্য আব্দুর রহিম বলেন, শাহ ইমরান মজুমদার বর্তমানে এলাকায় নিয়মিত থাকেন না। তিনি কুমিল্লা শহরে বসবাস করেন। তাঁর ভাষ্য, শাহজাহানের বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা করা হচ্ছে এবং এসব মামলা নিয়ে এলাকায় নানা ধরনের আলোচনা রয়েছে।
কেউ শাহ ইমরান মজুমদারের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিলেও তাঁকে মামলায় জড়ানোর অভিযোগ রয়েছে বলেও জানান তিনি।
উপস্থিত স্থানীয় কয়েকজন নারী বলেন, “পারিবারিক বিরোধ যদি আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব হয়, তাহলে একের পর এক মামলা ও পাল্টা অভিযোগের মাধ্যমে বিরোধকে আরও জটিল করে তোলা হচ্ছে কেন?” তাঁদের মতে, বিষয়টি এখন শুধু পারিবারিক বিরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; ধারাবাহিক মামলা ও অভিযোগের কারণে স্থানীয় পর্যায়েও এর প্রভাব পড়ছে।
এ বিষয়ে শাহ ইমরান মজুমদারের বক্তব্য জানতে তাঁর মুঠোফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলে সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে মিটিং আছে বলে কেটে দেন। ফলে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর বিষয়ে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সংবাদ সম্মেলনে এ সময় উপস্থিত ছিলেন বারপাড়া ইউনিয়ন বিএনপির সেক্রেটারি সেলিম মিয়া, ওয়ার্ড মেম্বার আব্দুর রহিম, গ্রামের সর্দার নবীর হোসেন, যুবদল নেতা মিজানুর রহমান, লেকল্যান্ডের ডাইরেক্টর শামছুল হক, শ্রমিক নেতা বিল্লাল হোসেন ও প্রবীণ মহিলা মুরব্বি ফজরেন নেসা।
