বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ সংস্থা ফিফা এবং ইউরোপিয়ান ফুটবলের প্রধান সংস্থা উয়েফার মধ্যকার দীর্ঘদিনের স্নায়ুযুদ্ধ এখন প্রকাশ্য সংঘাতে রূপ নিচ্ছে। ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর একটি বিতর্কিত পরিকল্পনাকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র এবং সুইজারল্যান্ডের আদালতে শুরু হয়েছে আইনি লড়াই। বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক স্বত্ব বিক্রির একটি পরিকল্পনা ভেস্তে যাওয়ার পর এবার দুই সংস্থার মধ্যে চলছে পাল্টাপাল্টি আইনি পদক্ষেপ ও কাদা ছোড়াছুড়ি। সমপ্রতি ফিফার বিরুদ্ধে মার্কিন আদালতে গুরুতর অভিযোগ তুলেছে উয়েফা। তাদের দাবি, ফিফা প্রেসিডেন্ট ইনফান্তিনো ‘ফিফা ফরওয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ’ (এফএফই) নামক একটি স্থগিত হয়ে যাওয়া পরিকল্পনার মাধ্যমে ক্ষমতার অপব্যবহার ও ‘অপরাধমূলক অব্যবস্থাপনা’ করেছেন। উয়েফার অভিযোগ, ইনফান্তিনো নিজের ব্যক্তিগত সুবিধার জন্য বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক অংশ একটি ‘ফন্দিফিকিরের’ মাধ্যমে কম মূল্যে বিক্রির পাঁয়তারা করছিলেন। এই অভিযোগের ভিত্তিতে সুইজারল্যান্ডে সম্ভাব্য ফৌজদারি মামলার জন্য ফিফার কাছে বিভিন্ন গোপন নথিপত্রের তথ্য চেয়েছে ইউরোপিয়ান সংস্থাটি।
উয়েফার এই পদক্ষেপে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ফিফা। মার্কিন আদালতে জমা দেয়া নথিপত্রে ফিফা পাল্টা অভিযোগ করে জানিয়েছে, তাদের ও তাদের নেতৃত্বকে হেয় করার জন্য উয়েফা একটি ‘পরিকল্পিত কুৎসা রটনা’ চালাচ্ছে। ফিফা সাফ জানিয়ে দিয়েছে, উয়েফার এই আইনি পদক্ষেপের কোনো শক্ত ভিত্তি নেই।
ফিফার আইনি দল আদালতকে বলে, ‘উয়েফা এমন একটি বিদেশি ফৌজদারি কার্যক্রমে আইনি সহায়তা চাইছে যার কোনো বাস্তব অস্তিত্ব নেই এবং যা শুরু করার কোনো এখতিয়ারও উয়েফার নেই। অথচ এর ওপর ভিত্তি করেই তারা ফিফার বিরুদ্ধে ব্যাপক নথিপত্র তলব করছে।”
ফিফা আরও দাবি করেছে, এফএফই প্রকল্পটি কেবল একটি প্রাথমিক প্রস্তাব ছিল এবং সদস্য দেশগুলোর গণতান্ত্রিক সমর্থন ও ফিফা কাউন্সিলের অনুমোদন সাপেক্ষে কেবল এটি বাস্তবায়িত হতে পারত। তবে সেই গঠনতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশ না নিয়ে উয়েফা শুরুতেই সংবাদ সম্মেলন ও প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে অপপ্রচারে নেমে পড়ে।
ফিফার মতে, এই বিরোধের পেছনে রয়েছে উয়েফার গভীর অর্থনৈতিক স্বার্থ। ছোট ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর আর্থিক সক্ষমতা বেড়ে গেলে বিশ্ব ফুটবলে ইউরোপিয়ান দলগুলোর একক আধিপত্য ও বাজারদর হুমকির মুখে পড়বে-এই আশঙ্কায় উয়েফা মরিয়া হয়ে উঠেছে। ফিফার যুক্তি, এফএফই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ফুটবল আরও শক্তিশালী হতো, যা ইউরোপিয়ান সংস্থাটির একাধিপত্য কমাতে ভূমিকা রাখত। এই পুরো বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে মার্কিন ধনকুবের জশুয়া কুশনারের নাম। উয়েফার অভিযোগ, কুশনারের ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফার্ম ‘থ্রাইভ ইটারনাল’-এর সঙ্গে মিলে ইনফান্তিনো ফিফার নতুন একটি বাণিজ্যিক সাবসিডিয়ারির ২০ শতাংশ অংশ ৪.২ বিলিয়ন ডলারে বিক্রির গোপন আলোচনা চালান। গত জুলাইয়ে এই পরিকল্পনা ফাঁস হওয়ার পরই বিশ্বজুড়ে তীব্র প্রতিবাদের মুখে তা বাতিল করা হয়।
বিতর্ক জোরালো হওয়ার পর সমপ্রতি জশুয়া কুশনার নিজেই এই ঘটনায় অনুশোচনা প্রকাশ করেছেন। তিনি এক বিবৃতিতে বলেন, ‘আমরা এফএফই-র সদিচ্ছাকে সমর্থন করলেও বিশ্ব ফুটবলের জটিল রাজনৈতিক সমীকরণ এবং এর পরিণতি বুঝতে ব্যর্থ হয়েছিলাম। আগে যদি জানতাম পরিস্থিতি এতটা অবনতি ঘটবে, তবে আমরা কখনোই এতে জড়াতাম না।’
উয়েফা অবশ্য দমে যায়নি। তারা কুশনার ছাড়াও মার্কিন বিনিয়োগকারী গ্রেগ মাফির কাছ থেকেও সমস্ত প্রাসঙ্গিক নথি প্রকাশের দাবি জানিয়েছে। উয়েফার অভিযোগ, ফিফার যথাযথ স্তরের কাউকেই না জানিয়ে ইনফান্তিনো একতরফাভাবে এই বিশাল আর্থিক পরিকল্পনা এগিয়ে নেন এবং বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক মূল্যকে ইচ্ছাকৃতভাবে অবমূল্যায়ন করে প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলারে নামিয়ে আনেন।
