হুমকির মুখে ঘাটাইলের শালবন

হুমকির মুখে ঘাটাইলের শালবন

ফন্ট সাইজ:

নির্বিচারে গাছ কাটা এবং অব্যাহত বনভূমি দখলের কারণে দ্রুত সংকুচিত হয়ে আসছে টাঙ্গাইলে ঘাটাইলের শালবন। হুমকির মুখে পড়েছে এই প্রাকৃতিক সম্পদ, বিলুপ্তির পথে এখানকার উদ্ভিদ ও প্রাণীজগৎ। বন কর্মকর্তা ও স্থানীয় বাসিন্দারা যখন দেশের অন্যতম এই বন ধ্বংসের জন্য একে অপরকে দায়ী করে যাচ্ছেন, ততক্ষণে উজাড় হয়ে গেছে বনের দুই-তৃতীয়াংশ ভূমির প্রাকৃতিক বন। আর এই তথ্য খোদ বনবিভাগের। টাঙ্গাইলের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোহাম্মদ নাজমুল আলম মানবজমিনকে জানান, একসময় বাঘ, ময়ূর ও ল্যাঙ্গুরসহ বিভিন্ন প্রজাতির বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল এই শালবনে বিস্তৃত ছিল। গোটা জেলার মধ্যে মধুপুর উপজেলায় ৪৫ হাজার ৫৬৫ একর, সখীপুরে ৪৭ হাজার ২২০ একর, ঘাটাইলে ২১ হাজার ৮৫৫ একর, মির্জাপুরে সাত হাজার ৫৭৬ একর এবং কালিহাতীতে ৬৬৯ একর জুড়ে ছিল এই বন। এর মধ্যে ৫৮ হাজার ২০৬ একর সংরক্ষিত বনাঞ্চল হিসেবে ঘোষিত।

বর্তমানে প্রায় ৪০ হাজার একরে প্রাকৃতিক বন রয়েছে। বেদখলে আছে প্রায় ৩৮ হাজার একর। সামাজিক বনায়ন করা হয়েছে প্রায় ২৮ হাজার একরে। এ ছাড়াও, রাবার বাগান করা হয়েছে ১০ হাজার একরে। বাকি পাঁচ হাজার একরে ঘাটাইলে শহীদ সালাহউদ্দিন সেনানিবাস, বিমান বাহিনীর ফায়ারিং রেঞ্জ এবং বন গবেষণা ইনস্টিটিউট সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, স্থানীয় ও প্রভাবশালী বহিরাগতদের নির্বিচারে গাছ কাটা এবং বনভূমি দখলের কারণে এই বনাঞ্চলের আয়তন দিন দিন কমে যাচ্ছে। তারা বনের জমি দখল করে সেখানে পাকা ঘর-বাড়িসহ বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করেছেন। ঘাটাইলের পাহাড়ি অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, প্রাকৃতিক বন ধ্বংস করে দখলদাররা এখানে আনারস, কলা, কুল, পেয়ারা, আম, লেবু, পেঁপে, কচু, হলুদসহ বিভিন্ন ফল ও সবজি বাগান করেছেন। এসব বাগানে ব্যবহৃত মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক ও কীটনাশক পরিবেশের ভারসাম্য ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করছে। শাল-গজারির বন ধ্বংস করে চাষ করা হচ্ছে কলার বাগান।

আর এ ক্ষেত্রে রক্ষক অর্থাৎ বনবিভাগ ভূমিকা পালন করছে দর্শকের। নিষিদ্ধ গজারি গাছ কাটায় কোনো মামলা হয়নি। দখলদারদের বিরুদ্ধে এখনো নেয়া হয়নি কোনো ব্যবস্থা। স্থানীয়দের অভিযোগ, বনবিভাগের লোকজনের সহযোগিতায় এমন ঘটনা দিনের বেলায়ও চলে। বনবিভাগের লোকেরা মোটা অঙ্কের টাকা খেয়ে চোখ বন্ধ করে সরকারি এই সম্পদ লুণ্ঠনে সহযোগিতা করে। সম্প্রতি টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার কাজলা এলাকায় দুই বছর আগে ২৪ বিঘা জমি থেকে প্রায় আড়াই হাজার গজারি গাছ কেটে বিশাল কলারবাগান তৈরি করার অভিযোগ উঠেছে। সরকারিভাবে শাল-গজারি গাছ কাটা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। নিষিদ্ধের মাত্রা এমন যে, ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিতে এ গাছ বেড়ে উঠলেও তা কাটা যাবে না। অথচ সরকারি বনবিভাগের জমি থেকে রাতে নয় সূর্যের আলোতেই ২৪ বিঘা জমি থেকে প্রায় আড়াই হাজার গজারি গাছ কাটা হয়েছে। গাছ কাটা এবং গাছের গুঁড়ি উপড়ে ফেলার যজ্ঞ চলে প্রায় মাসখানেক ধরে। চললেও বনবিভাগের দৃষ্টিগোচর হয়নি। স্থানীয়দের অভিযোগ, গাছগুলো রক্ষায় কোনো ভূমিকাই নিতে দেখা যায়নি বন কর্মকর্তাদের। সরজমিন দেখা যায়, বিশাল কলাবাগানের এক কোণায় সিনা টান করে মাথা উঁচু করে এখনো ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে একটি গজারি গাছ।

কলাবাগান করায় গাছের গুঁড়ি আগেই গুঁড়িয়ে ফেলা হয়েছে। তবে কলাগাছ ছাপিয়ে আকাশপানে উঁকি দেয়া গজারি গাছটি প্রমাণ করে একদা এখানে ছিল সমৃদ্ধ এক গজারি বন। স্থানীয়রা জানান, গজারি গাছগুলো কেটেছেন ইকবাল তালুকদার ও আল আমিন। ওই সময় বনবিভাগকে জানিয়েও কোনো লাভ হয়নি। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ইকবাল তালুকদার উপজেলা বিএনপি’র সহ-সভাপতি এবং আল আমিন লক্ষিন্দর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য। তবে গাছ কাটার বিষয়ে মুঠোফোনে জানতে চাইলে দু’জনই তা অস্বীকার করেন। বর্তমানে বনের ওই জমি এখন দখলে রেখেছেন- আহম্মদ আলী, মোহাম্মদ আলী ও সাহেব আলী নামে তিন ভাই। দেখভাল করেন তাদের সন্তানরা। কথা হয় আহম্মদ আলীর ছেলে খসরু মিয়ার সঙ্গে। তিনি বলেন, ওইখানে গজারির বন ছিল। গাছ বিক্রি করে ফেলার পর কলাবাগান করার জন্য সাইফুল ইসলামের কাছে বিঘাপ্রতি বছরে ৪০ হাজার টাকায় ইজারা দেয়া হয়েছে। জানা যায়, ওই জায়গা থেকে ১৪ শতাংশ জমি ফজলুল হক নামে এক ব্যক্তির কাছে হস্তান্তর দলিল মূলে পাঁচ লাখ টাকায় বিক্রি করেছেন দখলদার আহমদ আলীর ছেলে খসরু মিয়া।

জমি বিক্রির কথা স্বীকারও করেন তিনি। কলাবাগান করেছেন সাইফুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তি। মুঠোফোনে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। খুদেবার্তা পাঠিয়েও কোনো সাড়া মেলেনি। প্রতিদিন এভাবে বনের জমি দখল করায় ঘাটাইলে শালবনের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়লেও বনবিভাগের কর্তা ব্যক্তিদের যেন কোনো মাথাব্যথা নেই। যখন যে দল ক্ষমতায় আসে, তাদের সঙ্গে লিয়াজোঁ করে সামান্য কিছু টাকার আশায় সরকারি এ সম্পদ লুণ্ঠন করতে তারা সহযোগিতা করে। এ যেন রক্ষক হয়ে ভক্ষকের ভূমিকা পালন করছেন তারা- এমন অভিযোগ স্থানীয়দের। বিপুল পরিমাণ গজারি গাছ কাটায় বনবিভাগের পক্ষ থেকে কেন আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি?- এমন প্রশ্নের জবাবে বনবিভাগের ঘাটাইল ধলাপাড়া রেঞ্জ কর্মকর্তা সাব্বির হোসাইন বলেন, গাছ কাটা হয়েছে আমি এখানে যোগদান করার আগে। তবে ওইখানে যে গজারি বন ছিল তার আলামত আমি দেখেছি। তিনি আরও বলেন, ওই জায়গার মালিক বনবিভাগ। জমির পরিমাণ ১৫ বিঘা।

কলাবাগন করার সময় আপনি অবগত হয়েছিলেন কিনা?- তার জবাব, রাতারাতি কলাবাগান করা হয়েছে। কলাগাছ তো অনেক বড় হয়ে গেছে, দীর্ঘদিন পার হলেও কেন ব্যবস্থা নেননি? উত্তরে তিনি বলেন, বাগান মালিক শহিদুলকে অফিসে এসে দেখা করতে বলেছিল, তিনি আসেননি। গজারি গাছ কেটে কলাবাগান করা যায় কিনা? তার সোজা উত্তর- কোনোভাবেই এ কাজ কেউ করতে পারেন না। দ্রুত এ বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করে বনায়ন করা হবে বলেও তিনি জানান।