ভিসার ফাঁকফোকর ঠেকাতে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ডিপ্লোমা কোর্সে ভর্তি বন্ধ অস্ট্রেলিয়ায়

ভিসার ফাঁকফোকর ঠেকাতে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ডিপ্লোমা কোর্সে ভর্তি বন্ধ অস্ট্রেলিয়ায়

ফন্ট সাইজ:

অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থান ও ভিসার মেয়াদ ধরে রাখার ‘ফাঁকফোকর’ হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগে একটি গ্র্যাজুয়েট ডিপ্লোমা কোর্সে নতুন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ভর্তি বন্ধ করে দিয়েছে দেশটির ফেডারেল সরকার। সরকার অস্ট্রেলিয়ার আন্তর্জাতিক শিক্ষা খাতের সততা এবং গুণমানকে শক্তিশালী ও উন্নত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। অসাধু ও নীতিহীন প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ, প্রতিষ্ঠানগুলোর ত্রুটিপূর্ণ কার্যক্রমের সমাধান করা এবং প্রকৃত আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য সামগ্রিক অভিজ্ঞতা উন্নত করার কথা উল্লেখ করেছে কর্তৃপক্ষ।
আন্তর্জাতিক শিক্ষা ব্যবস্থার অখণ্ডতা রক্ষায় সরকারের নতুন কোর্স বাতিলের ক্ষমতার এটিই প্রথম প্রয়োগ।
গ্র্যাজুয়েট ডিপ্লোমা অব ম্যানেজমেন্ট (লার্নিং) নামের ভিইটি কোর্সটিতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের স্থানান্তর অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সরকারের আশঙ্কা, প্রকৃত পড়াশোনার বদলে অনেকে অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থান দীর্ঘায়িত করা এবং ভিসার বৈধতা ধরে রাখার মাধ্যম হিসেবে কোর্সটি ব্যবহার করছেন।

৫ বছরে শিক্ষার্থী স্থানান্তর প্রায় আট গুণ

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে মাত্র ৫১০ জন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী এ গ্র্যাজুয়েট ডিপ্লোমা কোর্সে স্থানান্তরিত হয়েছিলেন। ২০২৫ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৪ হাজারে। অর্থাৎ পাঁচ বছরে স্থানান্তরের সংখ্যা প্রায় আট গুণ হয়েছে।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, ২০২৫ সালে এ কোর্সে স্থানান্তরিত শিক্ষার্থীদের ৭৭ শতাংশই উচ্চশিক্ষার অন্য কোনো ক্ষেত্র থেকে এসেছেন। ফলে নতুন করে স্টুডেন্ট ভিসার আবেদন না করেই শিক্ষার্থীদের একটি ভিন্ন কোর্সে চলে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছিল। এ ছাড়া ২০২৫ সালে কোর্সটিতে ভর্তির অনুমোদন পাওয়া শিক্ষার্থীদের প্রায় অর্ধেকই শেষ পর্যন্ত কোর্স শুরু করেননি। কোর্সটির সমাপ্তির হারও অন্যান্য ভিইটি কোর্সের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। বর্তমানে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য এ কোর্সটি পরিচালনার অনুমোদন রয়েছে ৪৫২টি ভিইটি প্রতিষ্ঠানের। এসব প্রতিষ্ঠানে সক্রিয় ও নিশ্চিত ভর্তির সংখ্যা ৪১ হাজার ৩৩৩টি, যার মধ্যে বর্তমানে পড়াশোনা করছেন প্রায় ১৫ হাজার ৭৭২ জন শিক্ষার্থী। যেসব শিক্ষার্থী ইতোমধ্যে কোর্স শুরু করেছেন, তারা তাদের পড়াশোনা শেষ করতে পারবেন। তবে, ভিইটি (VET) প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান এবং শিক্ষা এজেন্টদের আরও আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ভর্তি করা থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে।

অভিবাসন কমাতে ভিসা ব্যবস্থায় কড়াকড়ি

আন্তর্জাতিক শিক্ষাক্ষেত্রে সরকারের এ সিদ্ধান্তকে অভিবাসন কমানোর বৃহত্তর নীতির অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। অস্ট্রেলিয়ার লেবার সরকার ভিসা প্রক্রিয়া কঠোর করা, নতুন শিক্ষার্থী আগমন নিয়ন্ত্রণ এবং নিম্নমানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার মাধ্যমে নিট বৈদেশিক অভিবাসন (এনওএম) কমানোর চেষ্টা করছে।
বর্তমানে বছরে প্রায় ৩ লাখ মানুষ অস্ট্রেলিয়ায় অভিবাসন করছেন। সরকার ২০২৮ সালের মধ্যে এ সংখ্যা পূর্বাভাস অনুযায়ী প্রায় ২ লাখ ২৫ হাজারে নামিয়ে আনতে চায়।
আন্তর্জাতিক শিক্ষা বিষয়ক সহকারী মন্ত্রী জুলিয়ান হিল এমপি বলেছেন, প্রকৃত আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য অস্ট্রেলিয়াকে একটি ‘বিশ্বস্ত বৈশ্বিক শিক্ষা গন্তব্য’ হিসেবে ধরে রাখতে এবং ভিসা ব্যবস্থার অপব্যবহার ঠেকাতেই সরকার এ পদক্ষেপ নিয়েছে।
তিনি বলেন, উন্নতমানের শিক্ষা নিতে আসা প্রকৃত আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের অস্ট্রেলিয়া স্বাগত জানানো অব্যাহত রাখবে। একই সঙ্গে শিক্ষার মান, খাতের সততা এবং শিক্ষার্থীদের জন্য একটি চমৎকার অভিজ্ঞতা নিশ্চিত করার ওপর কঠোর মনোযোগ থাকবে।
মন্ত্রী অভিযোগ, আগের জোট সরকার আন্তর্জাতিক শিক্ষা খাতের সবচেয়ে কম সুনামধন্য অংশগুলোতে অস্থিতিশীল ও অতিরিক্ত প্রবৃদ্ধির সুযোগ দিয়ে গেছে। এর ফলে খাতটিতে একটি ‘ভয়াবহ বিশৃঙ্খলা’ তৈরি হয়েছিল বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
আন্তর্জাতিক শিক্ষা খাতে অনিয়ম ও নিম্নমানের প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণে এর আগেও কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। চলতি বছরের শুরুতে বেসরকারি কলেজ ও প্রশিক্ষণ সংস্থাগুলোর আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন কোর্স চালুর আবেদনের ওপর ১২ মাসের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। এবং এ সময় কাজে লাগিয়ে জাতীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থা নিম্নমানের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয়ে ওঠা উদ্বেগ আরও গভীরভাবে তদন্তের সুযোগ পাবে জুলিয়ান হিল মন্তব্য করেন।
নতুন সিদ্ধান্তের মাধ্যমে অস্ট্রেলিয়া স্পষ্ট বার্তা দিল—শিক্ষার নামে ভিসা ধরে রাখার পথ হিসেবে কোনো কোর্সকে ব্যবহার করার সুযোগ আর সহজে দেওয়া হবে না।