‘আবার আসিব ফিরে’— জীবনানন্দ দাশের এই বিখ্যাত কবিতাটি অনেকেরই জানা কিংবা পড়া। কবিতাটি শুনলেই মনে হবে কবি ধানসিঁড়ি নদীর তীরে ফিরে আসার কথা বলেছেন। এটা আমাদের অনেকেরই মনে হতে পারে। কিন্তু কবিতাটি যদি একটু মনোযোগ দিয়ে পড়ি তাহলে আমরা দেখতে পাবো কবিতার পঙ্ক্তিতে কোনো নদী শব্দ নেই। ‘আবার আসিবো ফিরে এই ধানসিঁড়িটির তীরে’—কিন্তু আমরা অনেকেই কবিতাটি পড়ার সময় ধানসিঁড়ি নদীটির তীরে পড়ে ফেলি। হয়তো শঙ্খচিল, শালিকের বেশে। কবিতায় কাকের কথাও আছে। ধানসিঁড়ি নামে বাংলাদেশে একটা নদী রয়েছে— এটা সত্যি। ওপার বাংলা মানে কলকাতায় কি ধানসিঁড়ি নামে কোনো নদী আছে? কবি কি আসলেই নদীর কথা বলেছেন? কারণ আমরা কি নদীকে নদীটি বা নদীটা বলি? যেমন ধরুন বুড়িগঙ্গাটি বা মেঘনাটা বলি কখনো? তাহলে ধানসিঁড়িটির তীরে বলতে কি কবি এখানে নদী বুঝিয়েছেন? কীভাবে? তিনি এই কবিতায় কাককে সুদর্শন বলেছেন। কাক কি নদীতে থাকে কিংবা নদীর পাড়ে উড়ে বেড়ায়? আমার তো মনে হয় না। আসলে জীবনানন্দ দাশের দৃষ্টি ছিল ভিন্ন। তিনি বাংলাকে রূপসী হিসেবে দেখেছেন। বাংলার রূপ বৈচিত্র্যের বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি কবিতায় নানাভাবে উপস্থাপন করেছেন।
বাংলাদেশ ধানের দেশ, গানের দেশ— এটা আমরা সবাই জানি। আমরা যদি ধানক্ষেতের দিকে ভালো করে তাকাই তাহলে দেখবো বাতাসে কীভাবে ধানগাছ দোল খাচ্ছে। ঢেউয়ের পরে ঢেউ খেলে যাচ্ছে। এই ঢেউগুলোকে সিঁড়ির মতো মনে হবে। জীবনানন্দ দাশ হয়তো সেই ধানসিঁড়ির কথা বলেছেন। এই ধানক্ষেতে পাখি উড়ে বেড়ায়। কাকও ওড়ে। আজকের লেখাটা জীবনানন্দ দাশ নদী বলতে কোনটা বুঝিয়েছেন সেটা বিশ্লেষণ করা নয়। ধানসিঁড়ি নদী নিয়েই আজকের লেখাটা—
আসলেই এমন অনেক নামের ভেতর লুকিয়ে থাকে রহস্য। অনেক গল্প, অনেক কাব্যময়তা, ভালোবাসার শুদ্ধতা। ভোরের কাক হয়ে কবি ফিরে আসতে চেয়েছেন। এই আকুতি কি শুধু কবির একার? কবি আসলে তার কথার ভেতর দিয়ে আমাদের সকলের অন্তরাত্মার কথা বলেছেন। আমাদের এই সুজলা সুফলা রূপময় বাংলাদেশের কথা বলেছেন। বলেছেন প্রিয় জন্মভূমির কথা। যেখানে আমরা বারবার ফিরে আসতে চাই। আমাদের দেশ নদীমাতৃক দেশ। এর চারদিকে ছড়িয়ে আছে পদ্মা, মেঘনা, যমুনা ধলেশ্বরী, ব্রহ্মপুত্র, কপোতাক্ষ সহ হাজারো নদী। জীবনানন্দ যেভাবে দেশ মাতৃকাকে দেখেছেন তেমনি আরেক মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত তার প্রিয় কপোতাক্ষ নদীকে খুব মিস করেছেন। তাই তো তিনি লিখেছেন—সতত হে নদ পড়ো মোর মনে, সতত তোমার কথা ভাবি এ বিরলে।
যখন তিনি প্রবাসে ছিলেন তখন তিনি তার প্রিয় শৈশবকে খুঁজেছেন। দেশের কথা ভেবেছেন। দেশের অপার সৌন্দর্যের কথা ভেবেছেন। প্রিয় দেশমাতাকে তিনি এক মুহূর্তের জন্যও ভুলতে পারেননি। তাই তো সব ছেড়ে আবারো সেই শেকড়ের কাছেই ফিরে এসেছেন।
মাঝেমধ্যে আমাকেও বিভিন্ন কারণে দেশের বাইরে যেতে হয়। যতদিন বাইরে থাকি ততদিন মনের ভেতর এক ধরনের মায়া অনুভব করি দেশের জন্য। হয়তো অনেক উন্নত দেশে উন্নত পরিবেশে গিয়ে থাকি কিন্তু আমাদের এই ধানসিঁড়ির দেশকে, কপোতাক্ষকে খুব মিস করি। করোনাকালীন সময়ে আমাকে দীর্ঘদিন আমেরিকায় অবস্থান করতে হয়েছিল। সে সময়ে আমি আমার মা, বিখ্যাত কথাসাহিত্যিক রাবেয়া খাতুনকেও হারাই। কিন্তু বৈশ্বিক মহামারির কারণে দেশে আসা সম্ভব হয়নি। তবে আমার মনটা দেশেই পড়েছিল। এই বাংলাদেশকে খুব মিস করেছি। আমার তখন মনে হয়েছে আমিও হয়তো জীবনানন্দের মতো বারবার ফিরে আসি আমার প্রিয় বাংলাদেশে। মনে পড়ে শিশিরভেজা ঘাসকে। কোকিলের কুহু সুরকে। ভোরবেলা পাখির কিচিরমিচির ডাককে। বর্ষার ভরা নদীকে।
মাঝে মাঝে ফিরে যাই ছেলেবেলায়। কি আনন্দময় দিন ছিল আমাদের। এখনকার মতো প্রযুক্তি ছিল না। গ্রামীণ খেলাধুলায় অভ্যস্ত ছিলাম আমরা। ঝিমধরা লাটিমের গল্প এখনকার ছেলেমেয়েদের কাছে রূপকথার মতোই মনে হবে। গ্রামে যদিও এখনো মোটামুটি অনেক খেলা চালু রয়েছে। কিন্তু শহুরে আধুনিক ছেলেমেয়েরা সেসব খেলাধুলার কথা ভুলেই গিয়েছে। ডাংগুলি, চিবুড়ি, দাঁড়িয়াবান্ধা, গোল্লাছুট, কানামাছি সহ কতো ধরনের খেলা। এ প্রসঙ্গে কবি সুফিয়া কামালের সেই আজিকার শিশু কবিতাটির কথা মনে পড়ে—
আমাদের যুগে আমরা যখন খেলেছি পুতুল খেলা
তোমরা এ যুগে সেই বয়সেই লেখাপড়া করো মেলা
উত্তর মেরু দক্ষিণ মেরু সব তোমাদের জানা
আমরা শুনেছি সেখানে রয়েছে জ্বীন পরি দেও দানা।
আমাদের সময়ে আমরা যেসব খেলা খেলেছি এখন শিশুরা সেসব খেলার নামও শোনেনি। তবে তাদের ভেতরে কিন্তু দেশের প্রতি নির্মোহ টান রয়েছে। আমরা যে যেখানেই থাকি না কেন সবাই আসলে ধানসিঁড়ির কথাই বলি। ধানসিঁড়ি মানে বাংলার নদ, নদী, খাল, বিল, মানুষ আর প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যময় বাংলাদেশ। বুকের ভেতর এই মানচিত্রই আঁকা। বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রামই যেন ধানসিঁড়ির গ্রাম। তাই যতদূরেই যাই বারবার ফিরে আসি এই ধানসিঁড়িটির তীরে—কারণ ধানসিঁড়িই তো আমাদের বাংলাদেশ।
