১১ দলের লংমার্চ

গাড়িবহর ছোট হচ্ছে

ফন্ট সাইজ:

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সংগঠক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেছেন, আগামী ৫ই সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখে লংমার্চের কর্মসূচিতে অংশ নিতে পাঁচ-ছয় হাজার গাড়ি থেকে কমিয়ে প্রায় এক হাজার গাড়িতে নিয়ে আসা হয়েছে। তিনি বলেন, সরকার তেল-গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে, এটা থেকে কীভাবে আমরা পরিত্রাণ পেতে পারি, সেজন্যই এই কর্মসূচি। গতকাল রাজধানীর বাংলামোটরে এনসিপি’র অস্থায়ী কার্যালয়ে ১১ দলীয় ঐক্যের লংমার্চ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।

নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, আমাদের কিছু দায়িত্ববোধ রয়েছে। মানুষের আহ্বানে সাড়া দেয়া। সে জায়গা থেকে আমরা আমাদের লংমার্চ কর্মসূচি করতে যাচ্ছি। আগামী ৫ই সেপ্টেম্বর লংমার্চ অনুষ্ঠিত হবে। সকাল ৭টায় শাপলা চত্বর থেকে আমরা যাত্রা শুরু করবো। আমরা একটি লাইন ধরে যাবো। দুইটা লাইনে আমাদের কোনো গাড়ি থাকবে না, একটা লাইনে থাকবো।

সংবাদ সম্মেলনে এনসিপি’র সদস্যসচিব ও সংসদ সদস্য আখতার হোসেন বলেন, বাংলাদেশের বর্তমান যে প্রেক্ষাপট আমরা দেখছি, তাতে জনভোগান্তি নিরসন করা এবং গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করাই আমাদের লক্ষ্য। সেই লক্ষ্যেই আমরা এই লংমার্চে উপস্থিত হচ্ছি।
তিনি বলেন, সরকার গঠনের ছয় মাস অতিক্রান্ত হলেও এই সময়ের মধ্যে সরকার গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করতে পারেনি। একই সঙ্গে জনগণের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং বিদ্যুৎ, তেল, গ্যাস ও সারের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতেও সরকার ব্যর্থ হয়েছে।

এনসিপি’র এই নেতা বলেন, অতীতে বাংলাদেশের মানুষের ওপর যে জুলুম-নিপীড়ন হয়েছে, সেগুলোর বিচারের ধারাবাহিকতাকেও সরকার ফলপ্রসূ পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারেনি। সামগ্রিকভাবে সরকার জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন একটি অবস্থায় পৌঁছে গেছে।
তিনি আরও বলেন, জনগণের যে দাবি-দাওয়াগুলো আছে, সেগুলো নিয়ে আমরা সংসদে কথা বলছি। কিন্তু এখনো পর্যন্ত সরকারের তরফ থেকে এই দাবি-দাওয়াগুলোকে গ্রাহ্য করার মতো মানসিকতা প্রদর্শন করা হয়নি।
জ্বালানি সংকটের প্রসঙ্গ তুলে এনসিপি’র সদস্যসচিব বলেন, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর কয়েক দফা জ্বালানির দাম এবং বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। এরপরও দেশের বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘ সময় ধরে লোডশেডিং হচ্ছে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের কোথাও কোথাও দিনে ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে।

কৃষকদের সার না পাওয়ার বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করে আখতার হোসেন বলেন, বর্তমানে এমন একটি মৌসুম চলছে, যখন কৃষক সার না পেলে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হবে। এর ফলে ভবিষ্যতে খাদ্যসংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
গ্যাস সংকটের কারণে শিল্প-কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন আখতার হোসেন। একই সঙ্গে গ্যাসের ওপর রান্নাবান্নার জন্য নির্ভরশীল পরিবারগুলোও ব্যাপক ভোগান্তিতে পড়েছে বলেও জানান তিনি।

জ্বালানি প্রসঙ্গে এনসিপি’র সদস্যসচিব বলেন, সামগ্রিকভাবে জ্বালানি সেক্টরে সরকার চূড়ান্ত একটা ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। তারা সবসময়ই এই ব্যর্থতাকে আড়াল করার চেষ্টা করছে।
সরকারের পক্ষ থেকে লোডশেডিং নিয়ে দেয়া বক্তব্যের সমালোচনা করে তিনি বলেন, বিদ্যুতের সংকট নেই এবং লোডশেডিং হয় না—এ ধরনের বক্তব্য জনগণের প্রকৃত ভোগান্তিকে আড়াল করার চেষ্টা। এক পোল থেকে আরেক পোলে বিদ্যুৎ যেতে যে সময় লাগে, সেটাকেই লোডশেডিং হিসেবে ব্যাখ্যা করার যে বক্তব্য দেয়া হয়েছে, তা জনগণের সত্যিকারের সংকটকে আমলে না নেয়ার মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করে এনসিপি’র এই নেতা বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও রাহাজানির মতো ঘটনা ঘটছে। এমনকি সংসদ ভবনের সামনে একজন শিক্ষিকাকে ছিনতাইয়ের শিকার হতে হয়েছে। চিকিৎসার জন্য ঢাকায় আসা ওই শিক্ষিকা সংসদ ভবনের সামনে ছিনতাইয়ের শিকার হয়ে রাস্তায় পড়ে আহত হন এবং পরে মারা যান।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের মানুষ সংসদ ভবনের আশপাশের এলাকা থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত কোথাও এখন আর নিরাপদভাবে বসবাস করতে পারছেন না।
চাঁদাবাজির ব্যাপকতার উদাহরণ দিতে গিয়ে আখতার হোসেন বলেন, এমনকি মহিষ চরানোর জন্য যে চারণভূমিতে মহিষ ঘাস খায়, সেখানেও চাঁদা দিতে হচ্ছে—এমন পরিবেশ-পরিস্থিতি বাংলাদেশে তৈরি হয়েছে।
দেশের বিভিন্ন স্থানে খুন-খারাপির ঘটনাও ঘটছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আলোচিত দু’-একটি ঘটনার ক্ষেত্রে সরকার কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার কথা বললেও যেসব ঘটনা সংবাদমাধ্যমে তেমনভাবে আসেনি এবং যেসব ঘটনায় মানুষ ভুক্তভোগী হয়েছেন, সেসব বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হয়নি।

২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ তুলে এনসিপি’র এই সংসদ সদস্য বলেন, বাংলাদেশের মানুষ ওই সময় গণহত্যার মতো একটি পরিস্থিতির মধ্যদিয়ে গেছে এবং তাদের ওপর মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। ওই ঘটনায় অভিযুক্তদের আদালতে হাজির করার সময় তাদের হাস্যোজ্জ্বল চেহারায় দেখা যাচ্ছে। মানবতাবিরোধী অপরাধী যারা আছেন, তাদের সাজা কমিয়ে দেয়া হচ্ছে—এই সংকটগুলো আমাদের সামনে ধরা দিচ্ছে।
এসময় এনসিপি’র উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম বলেন, আমরা আপনাদের আহ্বান জানাবো—এমনকি সরকার ও প্রশাসনের পক্ষ থেকেও এটি নিশ্চিত করতে হবে যে, শাপলা চত্বর থেকে লালদিঘি ময়দান পর্যন্ত পুরো রাস্তায় যেন প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়। রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মী, সাধারণ মানুষ কিংবা ক্ষমতাসীন দলের কেউ যেন কোথাও অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি নিজেরা তৈরি করে সেটির দায় আমাদের ওপর চাপিয়ে দিতে না পারে, সে বিষয়ে সবাইকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে।

সংবাদ সম্মেলনে এনসিপি’র জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব, যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার, জাতীয় নারী শক্তির আহ্বায়ক মনিরা শারমিন, যুবশক্তির আহ্বায়ক তারিকুল ইসলামসহ নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।