২০২৭ শিক্ষাবর্ষে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্য বইয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসছে। নতুন বিষয় ও বই সংযোজনের পাশাপাশি বিদ্যমান কয়েকটি বইয়ে পরিমার্জন, নতুন প্রবন্ধ ও ঐতিহাসিক বিষয় যুক্ত করা হচ্ছে। একইসঙ্গে ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণির মূল্যায়ন কাঠামোও চূড়ান্ত করা হয়েছে। এসব পরিবর্তনকে ২০২৮ সাল থেকে শিক্ষাক্রমে ব্যাপক সংস্কার বাস্তবায়নের আগের অন্তর্বর্তীকালীন পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে হওয়া বৈঠকে এসব নতুন যুক্ত হওয়া বিষয়, পাঠ ও মূল্যায়ন পদ্ধতির অনুমোদন দেয়া হয়। শিক্ষা সংস্কারের পরিকল্পনা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা ও প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন। তিনি জানান, ২০২৮ শিক্ষাবর্ষ থেকে দেশের পুরো শিক্ষাক্রমে ব্যাপক ও বিস্তৃত সংস্কার আনার পরিকল্পনা রয়েছে। তার আগে ২০২৭ সালের পাঠ্য বইয়ে প্রয়োজনীয় পরিমার্জন, সংযোজন ও বিয়োজন করা হচ্ছে। আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে নতুন চারটি বই ও বিষয় যুক্ত হচ্ছে। চতুর্থ শ্রেণি থেকে খেলাধুলা ও শারীরিক শিক্ষাভিত্তিক সমন্বিত বই ‘স্পোর্টস অ্যান্ড কালচার’ চালু করা হবে। ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে জীবনমুখী শিক্ষা হিসেবে ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ এবং ব্যবহারিক দক্ষতা বৃদ্ধিতে ‘টেকনিক্যাল এডুকেশন’ বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা রয়েছে। একই ধারায় শিক্ষার্থীদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), রোবটিক্স, চতুর্থ শিল্পবিপ্লব ও আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত করার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।
মাধ্যমিক স্তরের ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণির পাঠ্য বইয়েও আসছে একাধিক পরিবর্তন। জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটি (এনসিসিসি) এসব পরিবর্তনের অনুমোদন দিয়েছে। সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত কমিটির বৈঠকে মূল্যায়ন কাঠামোর পাশাপাশি নতুন পাঠ্য যুক্ত করার বিষয়েও সিদ্ধান্ত হয়। ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণির চারটি শ্রেণির ‘তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি’ বই যুগোপযোগী করা হবে। এজন্য প্রয়োজনীয় পরিমার্জনের অনুমোদন দেয়া হয়েছে। ষষ্ঠ শ্রেণির বাংলা বইয়ে ‘তৃতীয় ভাষা’ শিরোনামে নতুন একটি প্রবন্ধ যুক্ত করা হচ্ছে। একই শ্রেণির ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ বইয়ে সাত বীরশ্রেষ্ঠের জীবন ও কর্ম অন্তর্ভুক্ত করা হবে। অষ্টম শ্রেণির বাংলা বইয়ে মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন ব্রিগেড ফোর্সের বিষয় যুক্ত করার অনুমোদন দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি অষ্টম ও নবম শ্রেণির পাঠ্য বইয়ে নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ভূমিকা নতুন করে যুক্ত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ ছাড়া ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণির বইয়ে ৭ই নভেম্বরের ‘সিপাহি-জনতার বিপ্লব’ অন্তর্ভুক্ত করা হবে। শুধু পাঠ্য বই নয়, ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণির মূল্যায়ন কাঠামোতেও পরিবর্তন আসছে। জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এ চার শ্রেণিতে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক মূল্যায়ন করা হবে। এই কাঠামো অনুসরণ করেই শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হবে। একই মূল্যায়ন পদ্ধতিতে দশম শ্রেণির শেষে নির্বাচনী পরীক্ষা ও পাবলিক পরীক্ষা বা এসএসসি গ্রহণ করা হবে বলে সিদ্ধান্ত হয়েছে। শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারের অংশ হিসেবে পরীক্ষার ফলাফলেও কৃত্রিমতা বন্ধ করার কথা জানিয়েছেন শিক্ষা উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন। সম্প্রতি প্রকাশিত এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলের প্রসঙ্গ টেনে তিনি অতীতে পাসের হার ও জিপিএ-৫ বাড়িয়ে পরিসংখ্যানে ভালো ফল দেখানোর চর্চার সমালোচনা করেন।
তার ভাষ্য, এবার কোনো ধরনের গ্রেস নম্বর না দিয়ে নিরপেক্ষ মূল্যায়নের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের প্রকৃত মেধার প্রতিফলন ঘটানো হয়েছে। একইসঙ্গে অকৃতকার্য বা শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ার ঝুঁকিতে থাকা তরুণদের কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (টিটিসি) ও স্বল্পমেয়াদি ভোকেশনাল কোর্সের আওতায় আনার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। নতুন শিক্ষাক্রমের অন্যতম লক্ষ্য হিসেবে শিক্ষার্থীদের কর্মমুখী করে তোলার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। শিক্ষা শেষ করার পর কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে বিভাগ ও জেলা পর্যায়ে ‘এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ’ বা কর্মসংস্থান বিনিময় কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
এসব কেন্দ্রে তরুণ-তরুণীরা তাদের অর্জিত দক্ষতার বিবরণ দিয়ে নিবন্ধন করবেন। এরপর বেসরকারি খাত ও শিল্প-কারখানার সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে চাকরিপ্রার্থী ও চাকরিদাতাদের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ তৈরি করা হবে। প্রথমে বিভাগীয় পর্যায়ে পরীক্ষামূলকভাবে এটি চালু করে পরে জেলাগুলোতে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
শিক্ষকদের প্রযুক্তিনির্ভর করে তুলতেও উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত শিক্ষকদের হাতে ডিজিটাল প্রযুক্তি তুলে দেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ কর্মসূচির আওতায় শিক্ষকদের ট্যাব দেয়ার পাশাপাশি আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তিতে প্রশিক্ষণ দেয়ার কথা জানানো হয়েছে। এর ফলে শ্রেণিকক্ষে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়বে এবং শিক্ষকরা আধুনিক শিক্ষাদান পদ্ধতির সঙ্গে আরও সহজে যুক্ত হতে পারবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
শুধু স্কুল-কলেজের পাঠ্যক্রম নয়, উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রেও সংস্কারের পরিকল্পনা রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিশ্বমানের গবেষণার পরিবেশ তৈরি ও আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিংয়ে উন্নতির জন্য সরকারি গবেষণায় বরাদ্দ বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।
শিক্ষায় শহর ও গ্রামের বৈষম্য কমাতেও বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের মেধাবী শিক্ষার্থীদের জাতীয় পর্যায়ে তুলে আনতে ‘প্রাইমারি স্কুল গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট’ এবং ‘ইনোভেশন অ্যান্ড স্টার্টআপ কমপিটিশন’-এর মতো প্রতিযোগিতা আয়োজনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে খেলাধুলা, উদ্ভাবন ও সৃজনশীলতার ক্ষেত্রে গ্রামের শিক্ষার্থীদেরও জাতীয় পর্যায়ে নিজেদের মেধা তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করা হচ্ছে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৭ সালের অন্তর্বর্তীকালীন পরিবর্তনের পর ২০২৮ শিক্ষাবর্ষ থেকে পুরো শিক্ষাক্রমে ব্যাপক ও বিস্তৃত সংস্কার বাস্তবায়নের লক্ষ্য রয়েছে। এর মাধ্যমে সনদনির্ভর শিক্ষার পরিবর্তে মেধা, দক্ষতা, নৈতিকতা, মানবিক মূল্যবোধ এবং কর্মক্ষেত্রের উপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
