বৃটেনকে পুতিনের হুমকি পশ্চিমের বিরুদ্ধে রাশিয়ার প্রচারণার অংশ

বিবিসির বিশ্লেষণ

বৃটেনকে পুতিনের হুমকি পশ্চিমের বিরুদ্ধে রাশিয়ার প্রচারণার অংশ

ফন্ট সাইজ:

বৃটেনের পক্ষ থেকে ইউক্রেনকে অস্ত্র সরবরাহের জবাবে মস্কো বৃটেনে সামরিক স্থাপনায় হামলা চালাতে পারে কি না। এক সংবাদ সম্মেলনে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে এই প্রশ্ন করা হয়েছিল। জবাবে তিনি একটি ছোট বাক্য বলেছিলেন-
‘এটা গোপন। সামরিক গোপনীয়তা।’
‘সামরিক গোপনীয়তা’ মানে ‘হ্যাঁ’ নয়। আবার ‘না’-ও নয়। এটি আমাদের অনিশ্চয়তার মধ্যে ঝুলিয়ে রাখে।
আর আমার ধারণা, সেটিই মূল উদ্দেশ্য।
ক্রেমলিনের পক্ষ থেকে ওই দুটি শব্দকে মানসিক চাপ প্রয়োগের কৌশল বলেই মনে হচ্ছে। মস্কোর উদ্দেশ্য নিয়ে বৃটেনকে অনুমান করতে ও উদ্বিগ্ন থাকতে বাধ্য করা, পাশাপাশি ইউক্রেনের প্রতি দৃঢ় সমর্থন অব্যাহত রাখার বিষয়ে বৃটেনকে যেন দ্বিতীয়বার ভাবতে উৎসাহিত করা।

কয়েক দিন আগে পড়া একটি সংবাদপত্রের নিবন্ধের কথা মনে পড়ছে। মস্কোভস্কি কমসোমোলেতস লিখেছিলেন, বৃটেনের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যামের রাশিয়াকে দেখা উচিত স্বপ্নে নয়, দুঃস্বপ্নে।
তার এই ভাষাটা ভীতিকর। কিন্তু সেই দুঃস্বপ্ন কেমন হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলা হয়নি।
আমরা অবশ্যই এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারি না যে, রুশ ক্ষেপণাস্ত্র শিগগিরই বৃটেনের কোনো লক্ষ্যবস্তুতে ব্যবহার হতে যাচ্ছে। তবে ইউরোপের অন্যত্র কী ঘটছে, তা দেখুন।

জার্মানি এখন বলছে, গত মাসে লিপজিগ বিমানবন্দরে যে ড্রোন হামলা হয়েছিল, তার জন্য রাশিয়া দায়ী। পুতিন জার্মানির বিরুদ্ধে প্রমাণ সাজানোর অভিযোগ করেছেন। তবে জার্মান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলেকজান্ডার ডোব্রিন্ট ইউরোপে ‘রাশিয়ার হাইব্রিড অভিযান পরিচালনার সুপ্রতিষ্ঠিত ধারা’ বলে উল্লেখ করেছেন। এ ধরনের অভিযান কি এখন বৃটেনেও আরও জোরদার হতে পারে?
তবে পুতিনের সংবাদ সম্মেলনে শুধু বৃটেনই পরোক্ষ হুমকির মুখে পড়েনি। পশ্চিমা বিশ্বও পেয়েছে একই ধরনের বার্তা। পুতিন পশ্চিমা দেশগুলোকে হাঙরের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি বলেন, কেউ যদি আমাদের খাদ্যশৃঙ্খলের নিচে নামিয়ে দিতে, আমাদের গিলে ফেলতে বা গ্রাস করতে চায়, তাহলে তারা দাঁতে ঘুসি খেতে পারে। এসব হাঙরের ক্ষুধা ও দাঁত দ্রুত বাড়লেও রাশিয়া তা করতে প্রস্তুত। ক্রমেই রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভূরাজনীতির সঙ্গে প্রাণিজগতের উপমা মিশিয়ে ফেলছেন। সম্প্রতি ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধকে ন্যায্যতা দেয়ার প্রসঙ্গে তিনি ‘কিলার হোয়েল’ বা শিকারি তিমির কথা বলেছিলেন- যারা ‘মেরু ভালুককে ছিন্নভিন্ন করে ফেলে’।

কিরগিজস্তানের বিশকেকে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনটি পুতিনের মানসিক অবস্থার দিকে তাকানোর জন্য একটি চমৎকার জানালা ছিল। ৪৫ মিনিট ধরে তিনি রুশ সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন। তাকে আক্রমণাত্মক, বিজয় সম্পর্কে আত্মবিশ্বাসী এবং বেশ উদ্দীপ্ত মনে হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে রাশিয়া ও পশ্চিমের ভূরাজনৈতিক সংঘাত এবং ইউক্রেনের যুদ্ধ নিয়ে কথা বলার সময়ই পুতিনকে সবচেয়ে বেশি প্রাণবন্ত দেখা যাচ্ছে। যদিও যুদ্ধ তার পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোয়নি। যুদ্ধক্ষেত্রে রাশিয়া বিপুল ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছে এবং দেশটির অর্থনীতিও যথেষ্ট চাপের মধ্যে রয়েছে।

‘শত্রু ভেঙে পড়বে- এ বিষয়ে আমার কোনো সন্দেহ নেই,’ তিনি ঘোষণা করেন। অথচ যুদ্ধ সাড়ে চার বছরেরও বেশি সময় ধরে চলছে এবং ইউক্রেন এখনও লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। আনুষ্ঠানিকভাবে ক্রেমলিন এখনও এটিকে ‘বিশেষ সামরিক অভিযান’ বলে অভিহিত করে। কিন্তু পুতিনও এখন ‘যুদ্ধ’ শব্দটি ব্যবহার করছেন। সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘যুদ্ধ একটি নিষ্ঠুর ও অনিশ্চিত বিষয়।’
সংঘাতের অবসান ঘটাতে আলোচনার ব্যাপারে তিনি এখনও আগ্রহী বলে দাবি করেছেন। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনের কার সঙ্গে আলোচনায় বসতে তিনি বেশি আগ্রহী, সে বিষয়েও কোনো সন্দেহ রাখেননি- ডনাল্ড ট্রাম্পের দূতদের সঙ্গে। পুতিন বলেন, আমরা যাদের ভালোভাবে চিনি এবং সাধারণভাবে বিশ্বাস করি, তাদের সঙ্গে কাজ করতে আমরা পুরোপুরি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। (জ্যারেড) কুশনার এবং (স্টিভ) উইটকফ সবসময়ই স্বাগত অতিথি। তাদের সঙ্গে কাজ করতে আমাদের ভালো লাগে।

তবে গত সপ্তাহে আকস্মিকভাবে মস্কো সফর করা সিআইএর পরিচালকের ক্ষেত্রে পুতিন এমন কোনো নাম উল্লেখ করেননি। ক্রেমলিনের দাবি, ওই সফরের সময় রুশ প্রেসিডেন্ট জন র‌্যাটক্লিফের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেননি। পুতিন কি শিগগিরই উইটকফ ও কুশনারের সঙ্গে দেখা করবেন? এ মুহূর্তে তার কর্মসূচিতে এমন কোনো বৈঠক নেই। অন্তত এখন পর্যন্ত। তবে তারা যদি মস্কো সফরে যান, তাহলে ডনাল্ড ট্রাম্পের দূতদের এমন এক ক্রেমলিন নেতার মুখোমুখি হতে হবে, যিনি এখনও দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন- ইউক্রেনে যে কোনো শান্তি চুক্তি হতে হবে রাশিয়ার শর্তেই।