জ্বালানি সংকট কাটাতে সরকারের পাঁচ পরিকল্পনা

জ্বালানি সংকট কাটাতে সরকারের পাঁচ পরিকল্পনা

ফন্ট সাইজ:

দেশের চলমান জ্বালানি সংকট কাটাতে সরকার ৫টি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে বলে জানিয়েছেন সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একইসঙ্গে আগামী ২০৩৪ সালে ট্রিলিয়ন-ডলার অর্থনীতির লক্ষ্য অর্জনে সরকারের কৌশলের কথা জানান সংসদ নেতা। গতকাল সংসদ অধিবেশনে লিখিত প্রশ্নোত্তর ও সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে সংসদ নেতা এসব তথ্য জানান। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে বিকাল সাড়ে ৩টায় সংসদের অধিবেশন শুরু হয়। অধিবেশনের শুরুতে ৪টি লিখিত প্রশ্ন এবং ৬টি সস্পূরক প্রশ্নের সরাসরি জবাব দেন প্রধানমন্ত্রী।

সংসদ সদস্য সেলিনা সুলতানার এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘদিনের অপর্যাপ্ত গ্যাস অনুসন্ধান ও আমদানি নির্ভরতার কারণে সৃষ্ট বর্তমান জ্বালানি সংকট থেকে দেশকে বের করে আনতে সরকার নিম্নবর্ণিত সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে-

দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধি: দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধির অংশ হিসেবে ১৫০টি কূপ খনন/ওয়ার্কওভার কর্মসূচির আওতায় ৩০টি কূপ খনন ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে এবং এর মাধ্যমে ১৪০ এমএমসিএফডি গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সংযুক্ত হয়েছে। বর্তমানে চলমান ৭টি কূপ খনন শেষ হলে আরও ৮৫ এমএমসিএফডি গ্যাস যুক্ত হবে। অবশিষ্ট কূপসমূহ খননের জন্য পর্যায়ক্রমে প্রকল্প গ্রহণ করা হচ্ছে।

সাইসমিক জরিপ: দেশীয় গ্যাসের উৎস অনুসন্ধানের লক্ষ্যে ৪ হাজার ৫০০ লাইন কিলোমিটার ২ডি সাইসমিক সার্ভে এবং ৪ হাজার ২০০ বর্গ কিলোমিটার ৩ডি সাইসমিক সার্ভে পরিচালনার কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।

বাপেক্স শক্তিশালীকরণ: বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিঃ (বাপেক্স)-কে শক্তিশালীকরণের লক্ষ্যে আরও ২টি নতুন রিগ ক্রয়ের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

পিএসসি (প্রোডাকশন শেয়ারিং কন্ট্যাক্ট) ও বিডিং: অফশোর মডেল পিএসসি ২০২৬ অনুমোদনের পর বিড রাউন্ড আহ্বান করা হয়েছে। এ ছাড়া, অনশোর মডেল পিএসসি অনুমোদন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। অফশোর এবং অনশোর গ্যাস অনুসন্ধানের মাধ্যমে গ্যাস পাওয়া গেলে তা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে।

এলএনজি অবকাঠামো সম্প্রসারণ: কক্সবাজার জেলার মহেশখালীর গভীর সমুদ্রে ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের লক্ষ্যে আগ্রহী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নেগোসিয়েশন চলমান রয়েছে। ডিসেম্বর ২০২৮ সালে উক্ত টার্মিনাল থেকে রিগ্যাসিফাইড এলএনজি (গ্যাস) সরবরাহ করা সম্ভব হবে মর্মে আশা করছি। ফলে আগামী ২ বছরের মধ্যে এলএনজি আমদানি আরও ৬০০ এমএমসিএফডি বৃদ্ধি পাবে। এ ছাড়া পায়রা বা মোংলা বন্দর এলাকা অথবা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সমুদ্র উপকূলে জরুরিভিত্তিতে নতুন ২/১টি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের জন্য সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। প্রস্তাবিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন হলে সামগ্রিকভাবে দেশে জ্বালানি নিরাপত্তা বৃদ্ধি পাবে।

এদিকে কুমিল্লা-১০ আসনের সংসদ সদস্য মোবাশ্বের আলম ভুঁইয়ার এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জ্বালানি খাত ও বিদ্যুৎ খাতের জন্য সরকার আগামী ১০ বছর কি কি করবে সেই পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে ইতিমধ্যে। কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। যতটুকু আমার ধারণা আছে, দ্রুতই এই সংসদের সামনে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রী উপস্থাপন করবেন। আগামী ১০ বছর কীভাবে আমরা বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে সাজানোর চেষ্টা করছি। যাতে করে আমরা ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করার টার্গেট করেছি সেটা আমরা অর্জন করতে সক্ষম হই।
সংসদ সদস্য সাবিকুন্নাহার মুন্নীর এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জ্বালানির সমস্যা আমরা সমাধান করতে চাইছি, আমাদের দেশে ফুলবাড়ীয়াতে যে কয়লার কথা উনি বলেছেন, সেই কয়লা পৃথিবীর যে সকল সবচেয়ে ভালো কয়লা আছে তার মধ্যে একটি। কাজেই আমরা এই কয়লাটিকে উত্তোলন করে যদি আমাদের জ্বালানি সংকট মেটাতে পারি, অবশ্যই সেটা দেশের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা যেরকম সাশ্রয় করবে একইভাবে দেশের জন্য সেটি ভালো হবে।

সংসদ সদস্য নিলোফার চৌধুরী মনির টেবিলে উপস্থাপিত এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে আগ্রহ বাড়াতে বর্তমান সরকার নানাবিধ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ইতিমধ্যে বাংলাদেশ সরকারের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ কর্তৃক ৮ই জুন সৌর বিদ্যুৎ স্থাপনের জন্য অপরিহার্য পণ্যসমূহ যেমন: সোলার প্যানেল, ইনভার্টার, ব্যাটারি ইত্যাদির ওপর আরোপনীয় সমুদয় কাস্টমস ডিউটি, রেগুলেটরি ডিউটি, সম্পূরক শুল্ক, আগাম কর এবং ২% (দুই শতাংশ) অতিরিক্ত অগ্রীম আয়কর হতে শর্তসাপেক্ষে অব্যাহতি প্রদান করা হয়েছে।
তিনি বলেন, আগামী ৬ মাসের মধ্যে যারা রুফটপ সোলার স্থাপন করবেন তাদের গ্রিডে সরবরাহ করা বিদ্যুৎ সরকার প্রতি ইউনিট ১০.১৫ টাকা করে ক্রয় করবে। অর্থাৎ বাল্ক রেট-এর অতিরিক্ত টাকা সরকার প্রণোদনা হিসেবে প্রদান করবে। ফলে গড়ে উৎপাদন মূল্য ৬-৭ টাকা প্রতি ইউনিট হিসেবে ৪৫ শতাংশ (৪০% মুনাফা ও ৫% প্রিমিয়াম) পর্যন্ত মুনাফার সুযোগ সৃষ্টি হবে। এই সুবিধা পরবর্তী তিন বছরের জন্য প্রযোজ্য হবে।

প্রবাসী কর্মী-তাদের পরিবারের সদস্যদের জন্য গৃহীত ১৬টি পদক্ষেপ: দেশে প্রবাসী কর্মী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের জন্য গৃহীত ১৬টি পদক্ষেপ সংসদে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সংসদ সদস্য মোসাম্মৎ শাম্মী আক্তারের এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে বিশ্বের ১৭৬টি দেশে ১.৫ কোটির অধিক বাংলাদেশি কর্মী কর্মরত রয়েছে। এ সকল বাংলাদেশিদের মর্যাদা, অধিকার ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে বর্তমান সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ। বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর তাদের কল্যাণে নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ এবং বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
দেশীয়ভাবে ড্রোন উৎপাদন সক্ষমতা অর্জনে পরিকল্পনা গ্রহণ: সরকার দেশীয়ভাবে ড্রোন উৎপাদন সক্ষমতা অর্জনের জন্য পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। সংসদ সদস্য শিরীন সুলতানার এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সশস্ত্রবাহিনীর সাইবার নিরাপত্তা নীতিমালা পর্যালোচনা করা হয়েছে। বর্তমান সরকার দেশীয়ভাবে ড্রোন উৎপাদন সক্ষমতা অর্জনের জন্য পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। সমুদ্রে নজরদারি ও পরিস্থিতিগত সচেতনতা জোরদারের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
কওমি মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থানে প্রশিক্ষণের উদ্যোগ গ্রহণ: কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের দেশ-বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য সরকার তাদের প্রশিক্ষণের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। কুমিল্লা-৬ আসনের সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরীর এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কওমি মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের জন্য দেশে এবং বিদেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে কারিগরি এবং বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণের পরিকল্পনা সরকার গ্রহণ করছে।

কুড়িগ্রাম-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো. মাহবুবুল আলমের এক সম্পূরক প্রশ্ন করলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মাননীয় সংসদ সদস্য আপনি যদি আমাকে একটু আলাদা নোটিশ দেন, আমি পুরা বিষয়টা সঠিকভাবে খোঁজখবর করে সংসদের সামনে উপস্থাপন করবো।
সংসদ সদস্য মো. আবুল কালামের এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশকে একটি “সবুজ বসতি” হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী আগামী পাঁচ বছরে দেশে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। এটি দেশের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ সবুজায়ন অভিযান হিসেবে বাস্তবায়িত হচ্ছে। বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির আওতায় দেশের প্রতিটি অঞ্চলে স্থানীয় ও দেশীয় প্রজাতির ফলদ, বনজ ও ঔষধি বৃক্ষ রোপণ করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলার পাশাপাশি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং একটি সবুজ বাংলাদেশ গড়ে তোলার কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।

সংসদ সদস্য এ এম মাহবুব উদ্দিনের এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণের ভোটে নির্বাচিত বর্তমান সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার হচ্ছে দেশের শিক্ষিত ও কর্মক্ষম যুবসমাজকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রধান শক্তিতে পরিণত করা এবং তাঁদের জন্য মর্যাদাপূর্ণ, উৎপাদনশীল ও টেকসই কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা। এ লক্ষ্যে দক্ষতা উন্নয়ন, শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে চাকরি প্রত্যাশীদের দক্ষতার সমন্বয়, স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণ এবং দেশীয় ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে যুবকদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধির জন্য সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করছে।