সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সামরিক জোটে বাংলাদেশের যুক্ত হওয়া নিয়ে নানা আলোচনা-পর্যালোচনা চলছে। এ নিয়ে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা-প্রতিষ্ঠানও হিসাবনিকাশে নেমেছে। এই জোটে যুক্ত হওয়ার সম্ভাব্য ঝুঁকি ও সুবিধার বিশ্লেষণ হচ্ছে নানা মাধ্যমে। একাধিক সরকারি সংস্থার মূল্যায়ন ও পরামর্শ এই চুক্তিতে যুক্ত হওয়ার বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো সিদ্ধান্ত না নিয়ে আপাতত সতর্ক পর্যবেক্ষণ করা। সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার এবং অন্যান্য পক্ষের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক বাড়ানোরও পরামর্শ দেয়া হয়েছে। জাতীয় স্বার্থ, সাংবিধানিক অবস্থান এবং আঞ্চলিক ভারসাম্যের সবিন্যস্ত মূল্যায়নের ভিত্তিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার পরামর্শ এসেছে মূল্যায়ন প্রতিবেদনে।
এই জোটে অংশ নিলে বাংলাদেশের ওপর সম্ভাব্য প্রভাবের বিষয়ে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের জন্য এই চুক্তির তাৎপর্য একাধিক মাত্রায় বিশ্লেষণযোগ্য। এতে যুক্ত হলে মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সামরিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে অন্যদিকে সরাসরি কোনো আঞ্চলিক বা বৃহত্তর সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও আছে। চুক্তিতে যুক্ত হলে যৌথ সামরিক প্রশিক্ষণ, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় ও সন্ত্রাসবাদ দমনে সহযোগিতার সুযোগ রয়েছে তবে এটি বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী জোটনিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। চুক্তিতে যুক্ত হলে জ্বালানি নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও প্রবাসী শ্রমবাজারের স্বার্থ সুরক্ষায় নতুন কূটনৈতিক সুযোগ তৈরি হতে পারে একইসঙ্গে ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে কূটনৈতিক জটিলতা ও আঞ্চলিক ভারসাম্য বিঘ্নিত হওয়ার শঙ্কাও আছে। সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক এবং ধর্মীয় সম্পর্ক আরও সুসংহত হতে পারে এই চুক্তিতে যুক্ত হলে। তবে আঞ্চলিক শক্তিসমূহের বিশেষ করে ভারত ও চীনের প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশকে একটি পক্ষ হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হওয়ারও শঙ্কা রয়েছে।
মূল্যায়ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, যেসব কারণে চুক্তিটি বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ তার মধ্যে আছে সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়। দেশটি বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মধ্যপ্রাচ্য অংশীদার। প্রবাসী কর্মসংস্থান, রেমিট্যান্স, জ্বালানি, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, ধর্মীয়, পর্যটন, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, কূটনৈতিক সম্পর্ক ইত্যাদির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ওপর সৌদি আরবের বেশ প্রভাব রয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সৌদি আরব থেকে বাংলাদেশ ৫.৮০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স আসে। পাঁচ বছরের হিসাবে সৌদি আরবই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক রেমিট্যান্স উৎস। তাই সৌদি আরবের নিরাপত্তা নীতিতে পরিবর্তন এলে এর প্রভাব পরোক্ষভাবে বাংলাদেশের ওপরও পড়তে পারে।
এ ছাড়া তুরস্ক বাংলাদেশের জন্য প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ, যৌথ উৎপাদন ও রক্ষণাবেক্ষণ সহযোগিতার একটি সম্ভাব্য অংশীদার হতে পারে। বাংলাদেশ এতে যোগ দিলে তুরস্কের কাছ থেকে যেসব ক্ষেত্রে সম্ভাব্য সামরিক সহযোগিতা পেতে পারে তারও ধারণা দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে আছে ড্রোন ও ইউএভি প্রযুক্তি, সামরিক প্রশিক্ষণ ও সক্ষমতা বৃদ্ধি, স্থলবাহিনীর আধুনিকীকরণ, নৌ ও সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এ ছাড়া পাকিস্তানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সম্পর্কের বিষয়ে বলা হয়, বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্কের নতুন পর্যায়ে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার সম্ভাবনাও রয়েছে। তবে এই সহযোগিতা স্বচ্ছ, সীমিত, বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থভিত্তিক এবং ভারতবিরোধী কোনো কাঠামোর বাইরে হওয়া প্রয়োজন।
এই চুক্তিতে যোগদানের যৌক্তিকতার বিষয়ে বলা হয়, বাংলাদেশ ইতিপূর্বে সৌদি নেতৃত্বাধীন বিভিন্ন বহুপক্ষীয় নিরাপত্তা উদ্যোগের (যেমন ইসলামিক মিলিটারি কাউন্টার টেররিজম কোয়ালিশন-আইএমসিটিসি) সঙ্গে যুক্ত থাকলেও, মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির মতো একটি গভীরতর সম্মিলিত প্রতিরক্ষা কাঠামোতে যোগদান একটি ভিন্ন মাত্রার সিদ্ধান্ত। কারণ এতে একটি রাষ্ট্র আক্রান্ত হলে অন্য সদস্যদেরও তাতে জড়িয়ে পড়ার একটি নীতিগত প্রতিশ্রুতি থাকে। এই সামরিক জোটে যোগদানের বিষয়টি মূলত নির্ভর করতে পারে সরকারের পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকার, সংবিধান ও জোটনিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে চুক্তির শর্তাবলির সামঞ্জস্য যাচাই, ভারতসহ প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব মূল্যায়ন, জাতীয় নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থের দীর্ঘমেয়াদি মূল্যায়নের ওপর।
বাংলাদেশের সম্ভাব্য সুবিধা ও ঝুঁকির বিষয়ে বলা হয়, তুরস্ক ও সৌদি আরবের সঙ্গে সহযোগিতার মাধ্যমে ইউএভি, রাডার, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার, সাইবার নিরাপত্তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও নৌ প্রযুক্তিতে সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে, নৌ-নিরাপত্তা বিশেষ করে রেড সি ও ভারত মহাসাগরে সামুদ্রিক নিরাপত্তা সহযোগিতায় যুক্ত হয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ ও সমুদ্রপথের নিরাপত্তা জোরদার করার সুযোগ তৈরি হবে। যৌথ প্রশিক্ষণ, শান্তিরক্ষা, দুর্যোগ মোকাবিলা, সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ ও সামরিক চিকিৎসাক্ষেত্রে সহযোগিতা বৃদ্ধি পাবে। দীর্ঘমেয়াদে তুরস্ক ও সৌদি আরবের সঙ্গে যৌথ উৎপাদন, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও রক্ষণাবেক্ষণ সুবিধা গড়ে তোলার সুযোগ আসবে। সৌদি আরব-তুরস্ক-পাকিস্তানের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক যোগাযোগকেও শক্তিশালী করতে পারে।
ঝুঁকির বিষয়ে বলা হয়, সরাসরি সামরিক জোটে যুক্ত হলে ভবিষ্যতে কোনো আঞ্চলিক সংঘাতে পক্ষ নেয়ার চাপ তৈরি হতে পারে যা ঐতিহ্যগত ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্যের কোনো সংঘাত সৌদি নেতৃত্বাধীন কাঠামো ও ইরানের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রূপ নিলে বাংলাদেশের জন্য ভারসাম্য বজায় রাখা কঠিন হতে পারে। পাকিস্তানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বৃদ্ধিকে ভারত নেতিবাচকভাবে দেখলে আঞ্চলিক কূটনীতিতে জটিলতা তৈরি হতে পারে। তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরবের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা কোন কোন ক্ষেত্রে বৃহৎ শক্তির প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটে ব্যাখ্যা করা হতে পারে। এ ছাড়া ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্টের ঝুঁকি এবং দক্ষিণ এশিয়ায় প্রক্সি ফোর্সের সংখ্যা বাড়তে পারে।
চুক্তিভুক্ত দেশগুলোর কৌশলগত সক্ষমতার বিষয়ে মূল্যায়নে বলা হয়, তিন সদস্য রাষ্ট্রের সামরিক ও কৌশলগত সক্ষমতা ভিন্ন হলেও পরস্পর পরিপূরক। এ বিষয়টি তাদের সমন্বয়কে একটি বহুমুখী প্রতিরোধ ব্যবস্থা হিসেবে কার্যকর করে তুলতে পারে।
ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সম্ভাব্য প্রভাব: প্রতিবেদনে এ বিষয়ে বলা হয়, চুক্তিটির সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব হলো পশ্চিম এশিয়া ও ভারত মহাসাগরীয় নিরাপত্তার মধ্যে সংযোগ বৃদ্ধি। এটি একটি সম্ভাব্য নিরাপত্তা অক্ষ যা পূর্ব ভূমধ্যসাগর থেকে লোহিত সাগর, বাব এল-মান্দেব, আরব সাগর হয়ে ভারত মহাসাগর ও দক্ষিণ এশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের বড় অংশ সমুদ্রপথনির্ভর হওয়ায় এই অক্ষের স্থিতিশীলতা দেশের জন্য সরাসরি গুরুত্বপূর্ণ। বাব এল-মান্দেব বা লোহিত সাগরের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে জাহাজ চলাচলের সময়, ফ্রেইট খরচ, বীমা প্রিমিয়াম, আমদানি ব্যয় ও রপ্তানি পণ্যের ডেলিভারি সময় বৃদ্ধি পেতে পারে। পাশাপাশি জ্বালানি আমদানির ওপরও অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে।
ভারত ও চীনের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়ার বিষয়ে বলা হয়, ভারত এই চুক্তি এবং এতে পাকিস্তানের সম্পৃক্ততাকে নিজস্ব কৌশলগত নিরাপত্তার জন্য একটি সংবেদনশীল বিষয় হিসেবে দেখছে। ভারত-পাকিস্তান সম্ভাব্য সংঘাতকে এখন আর নিশ্চিতভাবে দ্বিপক্ষীয় বিষয় হিসেবে ধরে নেয়া যাবে না; কারণ সৌদি আরব ও তুরস্ক এই চুক্তি অনুযায়ী পাকিস্তানের ওপর আক্রমণকে নিজেদের জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে, সৌদি আরব স্বয়ংক্রিয়ভাবে যেকোনো মুহূর্তে ভারত-পাকিস্তান সংঘাতে জড়িয়ে পড়বে।
পাকিস্তানের সঙ্গে চীনের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত মিত্রতা এবং সৌদি আরব ও তুরস্কের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে চীন সম্ভবত এই চুক্তিকে সরাসরি বিরোধিতা না করে সতর্কভাবে পর্যবেক্ষণ করবে। পাশাপাশি একে মধ্যপ্রাচ্যে পশ্চিমা/মার্কিন প্রভাব হ্রাসের একটি বিকল্প কাঠামো হিসেবে ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করতে পারে।
মক্কা জোটে থাকলেই যুদ্ধের বাধ্যবাধকতা নিয়ে আলোচনা ও সমালোচনার বিষয়ে বলা হয়, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে একই ধরনের একটা প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। কিন্তু এরপর সৌদি আরব ইরানের হামলার মুখে পড়লেও পাকিস্তানকে সৌদি আরবের পক্ষে যুদ্ধ করতে দেখা যায়নি। বাংলাদেশ ২০২৬ সালের জুলাইয়ে সৌদি আরবের উদ্যোগে একটি সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোটে যুক্ত হয়। যার উদ্দেশ্য হচ্ছে যে, বাব আল-মান্দেব প্রণালি, লোহিত সাগর এবং এডেন উপসাগরে নৌ-চলাচলের স্বাধীনতা রক্ষা করা। কিন্তু বাব আল-মান্দেবে হুতিদের আক্রমণ হলেও বাংলাদেশকে সেখানে যুদ্ধ করতে হয়নি এবং সৈন্যও পাঠাতে হয়নি। এটি আসলে কোনো আক্রমণাত্মক জোট নয়, বরং প্রতিরক্ষামূলক। এই জোটের কোনো নির্দিষ্ট শত্রু দেশ নেই। এর প্রাথমিক উদ্দেশ্য হচ্ছে, জোটের দেশগুলো নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ করবে না এবং তারা নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াবে। একটি বৃহত্তর জোট হলে এবং সেই জোটের সদস্য দেশগুলোর মধ্যে প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা সহযোগিতা থাকলে তা অন্য কোনো দেশের হামলাকে এমনিতেই নিরুৎসাহিত করবে।
বাংলাদেশ এ জোটে যোগদান করলে ভারতের সম্ভাব্য অবস্থান ও প্রতিক্রিয়ার বিষয়ে বলা হয়, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল সম্প্রতি আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছেন যে, কোনো দেশের এই চুক্তিতে যোগ দেয়া তাদের নিজস্ব বিষয় হলেও, ভারত এর ওপর সার্বক্ষণিক নজর রাখছে। ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার ওপর প্রভাব ফেলে এমন যেকোনো বিষয়ে দিল্লি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে বলে কড়া বার্তা দেয়া হয়েছে, যা একটি বড় ধরনের পরোক্ষ মনস্তাত্ত্বিক ও কূটনৈতিক চাপ।
বিশ্লেষকদের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ-পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্তি থাকা কোনো সামরিক বা প্রতিরক্ষা জোটে যোগ দিলে ভারতের সঙ্গে দীর্ঘদিনের দ্বিপক্ষীয় নিরাপত্তা, গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান এবং সীমান্ত সহযোগিতার সমীকরণ জটিল হতে পারে। ভারত আকারে-ইঙ্গিতে এটি স্পষ্ট করছে যে, এই জোটে যোগদান ভারতের সঙ্গে সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশের যোগদানের আলোচনার সমসাময়িক সময়েই ভারত বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটিকে ঢাকার ওপর একটি পরোক্ষ কৌশলগত চাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে যাতে সরকার যেকোনো স্পর্শকাতর আন্তর্জাতিক জোটে যোগ দেয়ার আগে অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা রক্ষা ও ভারতের উদ্বেগকে প্রাধান্য দেয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশ যোগদান করলে ভারত নিজেকে অনিরাপদ ভাবতে পারে এবং এ প্রেক্ষিতে দেশটি ইসরাইলের শরণাপন্ন হতে পারে। এই ইস্যুতে ইসরাইল তখন ভারতকে সহযোগিতায় আগ্রহী হতে পারে। ফলশ্রুতিতে, দক্ষিণ এশিয়ায় সামরিক উত্তেজনা তৈরি হতে পারে।
কৌশল অবলম্বনের পরামর্শ: স্বয়ংক্রিয় সামরিক জোটের বাধ্যবাধকতায় বাংলাদেশ যুক্ত হবে না এমন প্রস্তাব দিয়ে কিছু পদক্ষেপ নেয়ার কথা বলা হয়েছে প্রতিবেদনে। এর মধ্যে আছে সৌদি আরবের সঙ্গে সামুদ্রিক নিরাপত্তা, সামরিক প্রশিক্ষণ, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, শান্তিরক্ষা, সামরিক চিকিৎসা, লজিস্টিকস ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি নিয়ে সংলাপ আয়োজন। তুরস্কের সঙ্গে প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি সহযোগিতা বিশেষত ইউএভি, এআই, রাডার, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার, নৌ-প্রযুক্তি, সাইবার নিরাপত্তা ও শিপবিল্ডিংয়ের ক্ষেত্রে গুরুত্ব প্রদান।
পাকিস্তানের সঙ্গে সীমিত প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বজায় রাখার পরামর্শ দিয়ে বলা হয়, প্রাথমিকভাবে শান্তিরক্ষা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, সামরিক শিক্ষা, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবাদ দমন ও মানবিক কার্যক্রমে সীমাবদ্ধ রাখা। বাংলাদেশের বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক নিরাপত্তা প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ বাড়ানো, সৌদি-তুরস্ক-পাকিস্তান সহযোগিতা যে ভারতবিরোধী কোনো সামরিক কাঠামো নয়, তা কূটনৈতিকভাবে স্পষ্ট করা এবং নতুন প্রতিরক্ষা সহযোগিতা যেন কোনো বৃহৎ শক্তির বিরুদ্ধে অবস্থান হিসেবে প্রতীয়মান না হয়, তা নিশ্চিত করারও পরামর্শ দেয়া হয়েছে প্রতিবেদনে। এ ছাড়া পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, সশস্ত্র বাহিনী, নৌবাহিনী, নৌ-পরিবহন, বাণিজ্য ও জ্বালানি সংশ্লিষ্ট সংস্থার সমন্বয়ে একটি স্থায়ী বিশ্লেষণ কাঠামো তৈরি করারও তাগিদ দেয়া হয়।
সময়ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনার বিষয়ে প্রতিবেদনে তিন মাসের মধ্যে মক্কা চুক্তির বিস্তারিত নিরাপত্তা মূল্যায়ন সম্পন্ন করা, একই সময়ে সৌদি আরবের সঙ্গে কৌশলগত নিরাপত্তা সংলাপ শুরু করা, ৬ মাসের মধ্যে তুরস্কের সঙ্গে প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি সংলাপ শুরু করা। এই সময়ে পাকিস্তানের সঙ্গে সামরিক-টু-সামরিক সংলাপ শুরু করা। তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে মেরিটাইম সিকিউরিটি পার্টনার সম্ভাবনা যাচাই করা। ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যে যৌথ সামুদ্রিক নিরাপত্তা মহড়ায় অংশগ্রহণ এবং শিপিং ঝুঁকি মূল্যায়ন পরিচালনা করা এবং এক থেকে দুই বছরের মধ্যে মেরিটাইম ডোমেইন অ্যাওয়ারনেস সক্ষমতা বাড়ানোর পরামর্শ দেয়া হয়েছে। একই সময়ে তুরস্ক/সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম যৌথ উৎপাদনের সম্ভাব্যতা পরীক্ষা করার কথাও বলা হয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য প্রস্তাবিত সীমারেখার বিষয়ে বলা হয়, চুক্তি সম্পর্কিত যেকোনো ধরনের সহযোগিতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কিছু সীমারেখা নির্ধারণ করা উচিত। এর মধ্যে স্বয়ংক্রিয় সম্মিলিত— যুদ্ধ প্রতিশ্রুতি গ্রহণ না করা, তৃতীয় কোনো দেশের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক সামরিক অভিযানে অংশ না নেয়া, বাংলাদেশের ভূখণ্ডে বিদেশি সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের অনুমতি না দেয়া, ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র বা ইরানের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়— এমন কোনো বাধ্যবাধকতা গ্রহণ না করা। আন্তর্জাতিক আইন ও বাংলাদেশের সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা সীমাবদ্ধ রাখা। প্রতিরক্ষামূলক ও সক্ষমতামূলক সহযোগিতাকে অগ্রাধিকার দেয়া। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামুদ্রিক স্বার্থকে মূল বিবেচ্য বিষয় রাখা।
সামগ্রিক মূল্যায়ন ও পর্যালোচনায় বলা হয়, বাংলাদেশের বর্তমান গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশের এই মুহূর্তে তাৎক্ষণিক সদস্যপদ গ্রহণের চেয়ে ‘অধিকতর কৌশলগত অংশীদারিত্ব’ অধিক যুক্তিসঙ্গত বলে পর্যবেক্ষক ও অভিজ্ঞ মহল মনে করেন।
প্রতিবেদনের চূড়ান্ত সুপারিশে সৌদি আরবের সঙ্গে গভীর কৌশলগত সম্পর্ক গড়ে তোলা, তুরস্কের সঙ্গে প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি সহযোগিতা সম্প্রসারণ করা, পাকিস্তানের সঙ্গে সীমিত ও ভারসাম্যপূর্ণ সামরিক সহযোগিতা বজায় রাখার কথা বলা হয়। ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সঙ্গে কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষা, স্বয়ংক্রিয় সামরিক প্রতিশ্রুতি গ্রহণ না করা, চুক্তির পূর্ণাঙ্গ শর্তাবলি ও আনুষ্ঠানিক দলিল প্রকাশিত না হওয়া পর্যন্ত একটি নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষকের ভূমিকা বজায় রাখার কথাও বলা হয়। যেকোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জাতীয় স্বার্থ, সাংবিধানিক অবস্থান এবং আঞ্চলিক ভারসাম্যের সুবিন্যস্ত মূল্যায়নের ভিত্তিতে নেয়ারও পরামর্শ দেয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি হলো সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত একটি ঐতিহাসিক ত্রিদেশীয় সামরিক ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি। গত ৭ই আগস্ট মক্কার আল-সাফা রাজপ্রাসাদে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
ন্যাটোর অনুচ্ছেদ-৫ এর আদলে এই চুক্তিতে বলা হয়েছে যে, সদস্য দেশগুলোর যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র আক্রমণ হলে তা তিন দেশের ওপরই আক্রমণ বলে গণ্য হবে। সদস্যদের মধ্যে সৌদি আরব আর্থিক সহায়তা ও তহবিল জোগান দেবে, তুরস্ক উন্নত সামরিক প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম সরবরাহ করবে এবং পাকিস্তান সম্মুখ সমরে জনবল ও সামরিক সামর্থ্য জোগান দেবে। এই জোট নির্দিষ্ট কোনো দেশের বিরুদ্ধে নয় এবং ভাতৃপ্রতীম যেকোনো মুসলিম দেশ এর সদস্য হতে পারবে। চুক্তির প্রধান উদ্দেশ্য হলো— সম্মিলিত প্রতিরোধ সক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা সম্প্রসারণ, প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক কৌশলগত স্বনির্ভরতা।
