চলমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের সঙ্গে বর্তমান সরকারের কোনো সম্পর্ক বা দায় নেই বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তিনি বলেন, বিগত স্বৈরাচারী সরকারের আমদানিনির্ভর ভুল জ্বালানীনীতির কারণে বর্তমান অবস্থা তৈরি হয়েছে।
বুধবার ‘অর্থনৈতিক পূর্বাভাস ও উদীয়মান চ্যালেঞ্জসমূহ: আগামী দিনের অগ্রাধিকার’ শীর্ষক এক সেমিনারে এ কথা বলেন রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। সেমিনারের আয়োজন করে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ)।
সহআয়োজক বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। রাজধানীর ইআরএফ মিলনায়তনে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। এতে বক্তব্য দেন জাতীয় অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ, সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ফাহমিদা খাতুন ও ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক মো. ফজলুল হক। সভাপতিত্ব করেন ইআরএফের সভাপতি দৌলত আকতার। সঞ্চালনা করেন ইআরএফের সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেম।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানিতে ভুল নীতির কারণে বিগত সরকার কী পরিমাণ ঋণের বোঝা চাপিয়ে গেছে, সেটা দেশের সব তরুণ-তরুণীর জানা উচিত। সে জন্য কস্ট অব ইন্যাকশন বা কস্ট অব রং ডুইং শীর্ষক গবেষণা করার আহ্বান জানান তিনি। দেশের বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ও পেশাজীবী সমিতিকে এ ব্যাপারে সমীক্ষা করার আহ্বান জানান উপদেষ্টা। এ সময় জ্বালানি সংকট সমাধানে যতটা প্রয়োজন ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল করা হবে আশ্বস্ত করেন উপদেষ্টা।
নতুন বেতনকাঠামোর অর্থায়ন কীভাবে আসবে-এমন প্রশ্নের জবাবে রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, ‘চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকের রাজস্ব আদায়ের হিসাব নিয়ে সাংবাদিকদের সামনে বসা হবে। আয়কর ও ভ্যাট বাড়াতে আমরা বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছি। একেক মাসে একেকটি খাতকে ধরা হচ্ছে। কর ফাঁকি রোধের বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছি আমরা।’
দেশের অর্থনীতি এখনো উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগে স্থবিরতা, জ্বালানি সংকট এবং সীমিত রাজস্ব সক্ষমতার মতো একাধিক চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে উল্লেখ করে ড. তিতুমীর বলেন, এসব সমস্যা মোকাবিলায় বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ নয়, সমন্বিত নীতিকাঠামো প্রয়োজন।
সভায় জাতীয় অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ বলেন, লুণ্ঠনের অর্থনীতি থেকে উন্নয়ন ও উৎপাদনের অর্থনীতিতে ফিরে আসতে হবে। তিনি বলেন, চাঁদাবাজির অর্থ এক ধরনের কর। কিন্তু এটি সরকার পায় না, পায় চাঁদাবাজরা। এখন প্রয়োজন এই অর্থ তাদের কাছ থেকে সরকারের কোষাগারে নিয়ে আসা। ব্যাংকের লুট হওয়া টাকা এখন মূল্যস্ফীতিতে ভূমিকা রাখছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ব্যাংক থেকে টাকা লুট করে হুন্ডির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রায় পাচার করা হয়েছে। আর দেশি মুদ্রায় লুটের টাকা দেশেই কারো না কারো কাছে রয়ে গেছে। এই টাকাই বাজারে ছাড়া হচ্ছে, যা মূল্যস্ফীতি বাড়াচ্ছে।
এর আগে দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেন সিপিডির ফাহমিদা খাতুন। তিনি বলেন, ছয় মাসে একতরফা উন্নতি বা অবনতি বলা যায় না। রিজার্ভ ও মূল্যস্ফীতির মতো কিছু অর্থনৈতিক সূচকে স্বস্তি আছে। আবার অস্বস্তি আছে উৎপাদন, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও জ্বালানির মতো কিছু সূচকে। বিদ্যমান বিভিন্ন সমস্যার সমাধানে গভীর সংস্কারের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেন এই অর্থনীতিবিদ।
ফাহমিদা খাতুন বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের খেলাপি ঋণ এখন বের হচ্ছে। ব্যাংকিং খাত এই উচ্চ খেলাপি ঋণের চাপে রয়েছে। কর-জিডিপির অনুপাত কম, রাজস্বের ৪৫ শতাংশ চলে যায় বেতন-ভাতা পরিশোধ করতে। সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রম চালাতে হলে রাজস্ব বাড়াতে হবে। তাই রাজস্ব বাড়ানোর চাপে রয়েছে সরকার।
সভায় এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক ফজলুল হক বলেন, জ্বালানিসংকটের মধ্যেও রপ্তানি প্রবৃদ্ধি নিঃসন্দেহে একটা সাফল্য। রপ্তানি ধরে রাখার জন্য উদ্যোক্তাদের বাড়তি ব্যয় করতে হয়েছে। ডিজেল, জেনারেটর ও ওভারটাইম করাতে হয়েছে। এখন সংকট সমাধানে জরুরিভিত্তিতে কয়লা ও তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চালু করা দরকার। এতে গ্যাসের ওপর কিছুটা চাপ কমবে, যা শিল্পে সরবরাহ করা যাবে। ফজলুল হক বলেন, দেশে পণ্যের মজুত আছে, আগামী রোজায় পণ্যের দাম বাড়ার সম্ভাবনা নেই। তবে বাজারে সরবরাহের দিকে নজর রাখতে হবে। তিনি বলেন, এ মুহূর্তে চালু কারখানাগুলোকে সচল রাখা সবচেয়ে বড় কাজ।
